- জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে নেয়া হয় ১ হাজার কোটি টাকা
- ৫ ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেয়া হয় ১০ হাজার কোটি
- পাওনা ফেরত না পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ ইসলামী ব্যাংক
- ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে দায় পরিশোধে জনতা ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ
দেশের ব্যাংক খাতে আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। তদন্ত ও ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু সরাসরি ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমেই নয়, এক ব্যাংকের অর্থ অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তর করে জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। ব্যাংকারদের ভাষায়, এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন আর্থিক সঙ্কট, এলসি দায় কিংবা খেলাপি ঋণের চাপ সামাল দিতে ‘লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো ইসলামী ব্যাংকের তহবিল। এভাবে জনতা ব্যাংকের এস আলমের এক হাজার কোটি টাকার বিদেশী ঋণের দায় পরিশোধ করা হয় ইসলামী ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে। আবার এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন ৫ ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ধার করে বিভিন্ন বেনামী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা বের করে নেয়া হয়। এসব অর্থ ফেরত পেতে ইসলামী ব্যাংক এখন আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে ব্যাংকটি।
ইসলামী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে নেয়া এক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক দায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এস আলম গ্রুপ ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি ঋণপত্র স্থাপন (এলসি খোলা) করেছিল। ভোগ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিদেশী ব্যাংক ছয় মাসের বকেয়া এলসির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করে। জনতা ব্যাংক আমদানি দায় পরিশোধের শর্তে বিদেশী ব্যাংক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করে। শর্ত ছিল এস আলম গ্রুপ আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য বিক্রি করে জনতা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করবে। জনতা ব্যাংক সুদে আসলে তা বিদেশী ব্যাংককে পরিশোধ করবে। সূত্র জানিয়েছে, এস আলম আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য বিক্রি করে জনতা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করেনি। পরবর্তীতে জনতা ব্যাংকের বৈদেশিক দায় পরিশোধের জন্য পুনঃঅর্থায়নের আওতায় ইসলামী ব্যাংক থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার ধার নেয়া হয়। ইসলামী ব্যাংক থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার ধার নিয়ে জনতা ব্যাংক বিদেশী ব্যাংকের দায় পরিশোধ করে। ৫ আগস্টের পর এস আলম দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর জনতা ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পাওনা আর পরিশোধ করছে না। ১০ বারেও বেশি সময় চিঠি দেয়ার পরেও জনতা ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করছে না। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে জনতা ব্যাংককে ১৫ কার্যদিবস বেঁধে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের অর্থ পরিশোধের জন্য জনতা ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জনতা ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এস আলমের নির্দেশে জনতা ব্যাংক ৩৮টি এলসির দায় ইসলামী ব্যাংক থেকে ধার করে পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু চতুর এস আলম পণ্য দেশে এনে তা বিক্রি করে জনতা ব্যাংকের দায় পরিশোধ করেনি। ফলে এ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের ১৭টি এলসির দায় নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাবি এক কোটি ডলারের সমপরিমাণ এলসির দায় এখনো নিষ্পত্তি করা যায়নি। যা এখন সুদে আসলে এক হাজার ২৫০ কোটিতে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করে জানিয়েছে, তাদের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে আমানতকারীদের আস্থা সঙ্কট, উচ্চ ব্যয়ে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় পুরনো এসব দায় এখন ব্যাংকটির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে শুধু জনতা ব্যাংকের মাধ্যমেই নয়, এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা আরো কয়েকটি ব্যাংকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করে পরে তা বিভিন্ন কোম্পানি ও ঋণ হিসাবের মাধ্যমে ব্যবহার করেছে। এতে ইসলামী ব্যাংকের তহবিল কার্যত অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে ‘রাউটিং’ করা হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা নেয়া হয়। একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে নেয়া হয় প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এবং সাবেক রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, বর্তমানে অভিভা ফাইন্যান্স নামধারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ইসলামী ব্যাংক থেকে নেয়া হয়। সবমিলিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব লেনদেনের বেশির ভাগই ছিল অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও আন্তঃব্যাংক বিনিয়োগ বা শরিয়াভিত্তিক বিনিয়োগের আড়ালে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন গ্রুপ কোম্পানি বা ব্যক্তি হিসাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।
একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকেই ব্যাংকটির করপোরেট গভর্ন্যান্স ভেঙে পড়ে। স্বাভাবিক ব্যাংকিং নীতিমালা অনুসরণ না করে গ্রুপভিত্তিক ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। ফলে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অর্থের উৎসে পরিণত হয়। এখন সেই অর্থ আদায় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে নেয়া অর্থ ফেরত না পাওয়ার কারণে পুরো ব্যাংকিং খাতে তারল্য ও আস্থার সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে। কারণ ইসলামী ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি। গ্রাহকের আমানতের বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিতে হয়েছে। একই সাথে আন্তঃব্যাংক বাজার থেকেও উচ্চ সুদে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ঋণ ও আর্থিক লেনদেন তদন্তে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে বিশেষ নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বড় ঋণ হিসাব পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, যেসব ঋণ নিয়মবহির্ভূতভাবে অনুমোদন হয়েছে বা যথাযথ নথি ছাড়া অর্থ ছাড় করা হয়েছে, সেগুলোর দায় নির্ধারণে কাজ চলছে। একই সাথে অর্থ পাচার বা বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, হাজার হাজার কোটি টাকার এসব অর্থ দ্রুত উদ্ধার করা সহজ হবে না। কারণ অনেক ঋণ ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। কিছু ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই। আবার কিছু অর্থ বিভিন্ন স্তরে স্থানান্তর হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। ফলে আইনি জটিলতা ছাড়াও আর্থিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকারদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা সময় বাড়িয়ে এ সঙ্কট সমাধান হবে না। দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ সদস্য এবং সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তারা বলছেন, ব্যাংক খাতের দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষার সংস্কৃতির কারণেই এ ধরনের কেলেঙ্কারি সম্ভব হয়েছে। অন্য দিকে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা তৈরি হয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার বলছে, কোনো ব্যাংকের আমানত ঝুঁকিতে নেই এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এস আলম গ্রুপের আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য। ইসলামী ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেয়া ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের যে জাল তৈরি করা হয়েছিল, তা দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পদক্ষেপে এসব অর্থ কতটা উদ্ধার সম্ভব হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যায়।



