ম্যান্ডেট ট্রফি নয়, দায়িত্ব

বাংলাদেশ অসাধারণ কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেঁচে উঠেছে। এটি বারবার এবং যথেষ্ট প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেচে গেছে যা অবাক করে। এই দেশের মানুষের ত্যাগ সম্পর্কে বক্তৃতা শোনার দরকার নেই- তারা বেশির ভাগের চেয়ে বেশি ত্যাগ দিয়ে পরিশোধ করেছে। তাদের যা দরকার, তারা যা পাওয়ার যোগ্য এবং দাবি করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখে তা হলো এমন একটি সরকার যা তাদের চাওয়াগুলোকে মিটিয়ে দেবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই দেশ শাসন করবে না। সৎ, সাহসী ও সত্যিকারের নেতৃত্ব দেশ শাসন করবে। আর যত তাড়াতাড়ি সরকার বুঝবে যে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ম্যান্ডেট প্রদর্শন করার ট্রফি নয় বরং পালন করার দায়িত্ব, তত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ সেই দেশ হওয়ার কাজ শুরু করতে পারবে যা তার শহীদরা কল্পনা করেছিল

যে জাতি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দহন থেকে সবে বেরিয়ে এসেছে, সে এমন একটি মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে বিশাল সম্ভাবনা এবং বিশাল দায়িত্ব একসাথে হাজির। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করে সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। ম্যান্ডেটটি তার মাত্রায় ঐতিহাসিক, মানুষের প্রত্যাশাও তার গভীরতায় অপরিসীম। আর দেশটির সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো- অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত, কূটনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক- তা মোকাবেলা করা যেকোনো চ্যালেঞ্জের মতোই গুরুতর ও জরুরি।

তবুও প্রথম সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রম দেখে এমন একটি অনুভূতি হচ্ছে যা কিছুটা দুঃখ ও হতাশা ছাড়া প্রকাশ করা কঠিন। এটি ছিল এক বিরল, অমূল্য ও অনন্য সুযোগ-যা নষ্ট হলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ে ক্লান্ত ও ক্ষতবিক্ষত মানুষের প্রতিনিধিদের জন্য এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন জাতির সর্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাদের কথা ও কাজে প্রমাণ করার কথা ছিল যে তারা সময়ের গুরুত্ব, দায়িত্বের গভীরতা এবং জাতির প্রত্যাশা সত্যিই অনুধাবন করেন। পরিবর্তে জাতি যা দেখল তা হলো পয়েন্ট-স্কোরিং, ঐতিহাসিক অভিযোগ, পারস্পরিক দোষারোপ এবং এমন ধরনের রাজনৈতিক থিয়েটারে আধিপত্য করা একটি সংসদ অধিবেশন যা দলীয় অনুগতদের বিনোদন দেয় কিন্তু রাজশাহীর সেই কৃষকের জন্য কিছুই করে না যে ন্যায্যমূল্যে তার ফসল বেচতে পারছে না, ঢাকার সেই পোশাক শ্রমিকের জন্য কিছুই করে না যার মজুরি মূল্যস্ফীতির সাথে তাল মেলাচ্ছে না, সিলেটের সেই মায়ের জন্য কিছুই করে না যার সন্তান একটি কার্যকর সরকারি হাসপাতালে যেতে পারছে না বা সারা দেশের সেই তরুণ স্নাতকের জন্য কিছুই করে না যে যোগ্যতা থাকলেও অর্থবহ কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছে না।

বিরোধী দলগুলো গভীরভাবে বিতর্কিত নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে যে পরিপক্বতা ও সংযম প্রদর্শন করেছে তার জন্য তারা সত্যিকারের কৃতিত্বের দাবিদার। নির্বাচনী প্রক্রিয়া সমালোচনার উপরে ছিল না- যেমনটা সুশীলসমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ, স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক ভাষ্যকাররা সুপারিশ করেছেন- তা স্বীকার করে অস্থিতিশীল সঙ্ঘাতের পরিবর্তে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার পথ বেছে নেয়া রাজনৈতিক জ্ঞানের একটি কাজ যা জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রতি আন্তরিকতার প্রতিফলন করে। বিরোধী দলের ঘোষণা যে তারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে না বরং দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এগিয়ে যাবে- এটি দুর্বলতা নয়, এটি এমন ধরনের রাষ্ট্রনায়কত্ব যা বাংলাদেশের রাজনীতি সবসময় আশীর্বাদ হিসেবে পায়নি এবং এটি সরকারি বেঞ্চ থেকে সমান উদারতা ও উদ্দেশ্যের গুরুত্বের সাথে মেটানোর যোগ্য।

এটি যা দিয়ে মেটানো উচিত নয় তা হলো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্রমাগত উচ্চারণ, প্রতিফলনবিহীন আহ্বান যেন সংসদীয় ম্যান্ডেটের আকার নিজেই শাসনের বিকল্প। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি হাতিয়ার- এটি নিজেই কোনো অর্জন নয়। অর্জন নিহিত রয়েছে এটি দিয়ে কী করা হয় তার মধ্যে। যতবার একজন সরকারি এমপি সংসদে উঠে কোনো জাতীয় সমস্যার সারবস্তু নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে বিরোধী ও গ্যালারিকে নির্বাচনী অঙ্কের কথা মনে করিয়ে দেন, ততবার সেই এমপি এমন একটি মুহূর্ত নষ্ট করেন যা দলের নয়, যে জনগণ তাকে সেখানে পাঠিয়েছে তাদের।

অতীতের নিয়ে অন্ধ আবেগ- আগের সরকারগুলোর অপরাধ, ব্যর্থতা ও বাড়াবাড়ির প্রতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক হিসাব যা দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি গ্রাস করেছে- ইচ্ছাকৃত ও সিদ্ধান্তমূলকভাবে সরিয়ে রাখতে হবে। এর মানে এই নয় যে, প্রকৃত অন্যায়ের জবাবদিহিতা ছেড়ে দেয়া উচিত বা ইতিহাস নতুনভাবে লেখা উচিত। ন্যায়বিচার অবশ্যই যথাযথ আইনি পথে অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু সংসদ কোনো আদালত নয়, আর শাসন প্রতিশোধ নয়। সংসদের মেঝে হতে হবে সমস্যা সমাধানের জায়গা, অতীত পুনরায় বিচার করার জায়গা নয়। কোন প্রকৃত সমস্যাগুলো সরকারের জরুরি ও অবিভক্ত মনোযোগ দাবি করে? সেগুলো অনেক, গুরুতর এবং এমনভাবে পরস্পর সংযুক্ত যা খণ্ডিত পদ্ধতিকে অপর্যাপ্ত করে তোলে।

অর্থনীতি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গল্প উল্লেখযোগ্য অর্জনের-দশকের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, পোশাক খাতের অসাধারণ সাফল্য, দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু সেই গল্প এখন গুরুতর প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতি সাধারণ বাংলাদেশীদের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে পড়েছে। ব্যাংকিং খাত, দীর্ঘকাল খেলাপি ঋণ ও শাসন ব্যর্থতায় জর্জরিত, কাঠামোগত দুর্বলতার উৎস হয়ে আছে। যুব বেকারত্ব একটি টিক টিক করতে থাকা জনসংখ্যাগত টাইম বোমা যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ যোগ্যতা নিয়ে কিন্তু সুযোগ ছাড়া শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। সরকারকে অবশ্যই তার প্রথম এক শ’ দিনের মধ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য, বিস্তারিত ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য অর্থনৈতিক রোডম্যাপ উপস্থাপন করতে হবে- আকাক্সক্ষার দলিল নয়, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, স্বচ্ছ সময়সীমা ও প্রকৃত জবাবদিহিতা প্রক্রিয়াসহ কর্মপরিকল্পনা।

জাতীয় নিরাপত্তা যে গুরুত্বের সাথে জাতীয় কথোপকথনের কেন্দ্রে রাখা দরকার তা সবসময় পায়নি। বাংলাদেশের সীমানা- হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে ভারতের সাথে এবং এশিয়ার সবচেয়ে অস্থির সীমান্তে পরিণত হওয়া মিয়ানমারের সাথে-প্রকৃত হুমকির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ, সম্পদ বিনিয়োগ ও কৌশলগত চিন্তার দাবি রাখে। ভারত সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যার বিএসএফের রেকর্ড একটি খোলা ক্ষত, যা দৃঢ়, ধারাবাহিক ও সরকারিভাবে ঘোষিত কূটনৈতিক প্রতিকার দাবি করে। রোহিঙ্গা সঙ্কট, কক্সবাজারে দশ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিয়ে যাদের উপস্থিতি জটিল নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ তৈরি করছে, একটি ব্যাপক জাতীয় কৌশল দাবি করে, যা মানবিক ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে টেকসই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মাত্রাগুলো মোকাবেলা করে।

পররাষ্ট্রনীতিকে এমন একটি অবস্থানের দিকে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে, যা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, সত্যিকার অর্থে নীতিনিষ্ঠ এবং সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে। ভারতের সাথে সম্পর্কের জন্য সৎ সম্পৃক্ততা দরকার- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা ও গুরুত্ব স্বীকার করে, একই সাথে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও বাণিজ্য ন্যায্যতাসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে একেবারে দৃঢ় থেকে। চীনের সাথে সম্পর্ক কৌশলগতভাবে পরিচালনা করতে হবে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে আপস করে এমন নির্ভরতা তৈরি না করে চীনা অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাকে কাজে লাগিয়ে। উপসাগরীয় রাষ্ট্র, আসিয়ান, তুরস্ক ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ততা সামঞ্জস্যপূর্ণ পেশাদার কূটনীতির সাথে অনুসরণ করতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সেই ভিত্তি যার ওপর বাকি সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে। একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ, একটি সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসিত নির্বাচন কমিশন, একটি পেশাদার ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিস, একটি মুক্ত ও আর্থিকভাবে টেকসই মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে। এগুলোই যেকোনো অগ্রাধিকার কার্যকরভাবে পরিচালনার পূর্বশর্ত। প্রশ্ন হলো এমন প্রতিষ্ঠান গড়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না, যা ভবিষ্যৎ সরকারের ক্ষমতাকে যতটা সীমিত করবে নিজের ক্ষমতাকেও ততটা সীমিত করবে। কারণ প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য এটাই প্রয়োজন।

জাতীয় ঐক্য কোনো স্লোগান নয়। এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশ- রাজনৈতিক লাইনে, ধর্মীয় লাইনে, আঞ্চলিক লাইনে বিভক্ত। এটি এমন একটি বাংলাদেশ, যা বাইরের চাপ ও ভেতরের ফাটলের কাছে দুর্বল, যা তার শত্রুরা, দেশের ভেতরে ও বাইরে, নির্মম দক্ষতার সাথে কাজে লাগাবে। সরকারের এমনভাবে শাসন করতে হবে, যা সব বাংলাদেশীকে- তারা যাকেই ভোট দিক না কেন, তাদের ধর্ম যাই হোক না কেন, তাদের অঞ্চল যাই হোক না কেন অনুভব করায় যে রাষ্ট্র তাদের এবং তাদের জন্য কাজ করে।

বাংলাদেশ অসাধারণ কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেঁচে উঠেছে। এটি বারবার এবং যথেষ্ট প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেঁচে গেছে, যা অবাক করে। এই দেশের মানুষের ত্যাগ সম্পর্কে বক্তৃতা শোনার দরকার নেই- তারা বেশির ভাগের চেয়ে বেশি ত্যাগ দিয়ে পরিশোধ করেছে। তাদের যা দরকার, তারা যা পাওয়ার যোগ্য এবং দাবি করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখে তা হলো এমন একটি সরকার, যা তাদের চাওয়াগুলোকে মিটিয়ে দেবে।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই দেশ শাসন করবে না। সৎ, সাহসী ও সত্যিকারের নেতৃত্ব দেশ শাসন করবে। আর যত তাড়াতাড়ি সরকার বুঝবে যে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ম্যান্ডেট প্রদর্শন করার ট্রফি নয় বরং পালন করার দায়িত্ব, তত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ সেই দেশ হওয়ার কাজ শুরু করতে পারবে যা তার শহীদরা কল্পনা করেছিল।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]