শিল্পবর্জ্যে নদীদূষণ

অবিলম্বে ব্যবস্থা নিন

নদী দূষণরোধে যে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি ভূমিকা থাকা উচিত ছিল সেটি হলো জতীয় নদীরক্ষা কমিশন; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা অবহেলিত। নরসিংদীসহ সারা দেশের নদী দখল ও দূষণরোধে নদীরক্ষা কমিশনকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর একটি সংস্থায় পরিণত করতে হবে। নদীরক্ষা কমিশনকে ক্ষমতায়িত করার মাধ্যমে দেশের নদ-নদী দখল ও দূষণরোধের কাজ অনেকটা ত্বরান্বিত হতে পারে। সেই সাথে নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলা রোধে স্থানীয় জনগণকে জেগে উঠতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

শিল্প-কারখানার বর্জ্যে নরসিংদীর নদীগুলো মারাত্মক দূষণের শিকার। আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধায়া, পাহাড়িয়া ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে নানারকম শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের অপরিকল্পিত বর্জ্য নিঃসরণে দিন দিন দূষিত হচ্ছে নদীগুলো। আর দখলের কারণে সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরসিংদীর নদীগুলোতে পানি-স্বল্পতার কারণে বর্তমানে বছরের বেশির ভাগ সময় নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিছু শাখা নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্য রক্ষায় বিগত সময়ে প্রায় ২৩২ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন করা হয়েছিল। তবে দূষণ বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সরাসরি নদীতে রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য ফেলায় তা পানিতে দ্রবীভূত হচ্ছে। এতে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে মাছসহ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নদীবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, দেশের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর তালিকায় হাঁড়িধায়ার অবস্থান দ্বিতীয়। এ নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা দশমিক শূন্য ৬ মিলিগ্রাম/লিটার এবং ক্ষারতার মাত্রা ৪ দশমিক ১, যা জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

গত বছর নরসিংদীর শীতলক্ষ্যা নদীতে কারখানার বর্জ্য ফেলা রোধে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছিল উচ্চ আদালত; কিন্তু তাতে শিল্পবর্জ্য ফেলা থামেনি। নদী বহু মানুষের জীবন-জীবিকার মাধ্যম হলেও কারখানার বর্জ্যে তা যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। হাঁড়িধোয়া নদীর পানিদূষণের মাত্রা এতটা বেশি যে, গবাদিপশুর জন্যও তা আর ব্যবহার করা যায় না। পানিতে নামলে দেখা দিচ্ছে খোসপাঁচড়া, চর্মরোগসহ নানা রোগ।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিলেও নদী দখল-দূষণ রোধে তেমন কোনো কার্যক্রম এখনো দৃশ্যমান নয়। অথচ নদ-নদী-জলাধার রক্ষায় নরসিংদীসহ সারা দেশে শিল্প-কারখানায় বর্জ্যশোধন বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে গার্মেন্ট, ডাইং, ট্যানারি প্রভৃতি শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।

কারখানাগুলোর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন যথাযথভাবে মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানা ও প্রয়োজনে অনুমোদন বাতিল করতে হবে।

নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে যাতে নতুন করে আর কোনো কারখানা স্থাপিত না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর পানির মান পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেসব নদী ইতোমধ্যে মরে গেছে সেগুলো নতুন করে খননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

নদী দূষণরোধে যে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি ভূমিকা থাকা উচিত ছিল সেটি হলো জতীয় নদীরক্ষা কমিশন; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা অবহেলিত। নরসিংদীসহ সারা দেশের নদী দখল ও দূষণরোধে নদীরক্ষা কমিশনকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর একটি সংস্থায় পরিণত করতে হবে। নদীরক্ষা কমিশনকে ক্ষমতায়িত করার মাধ্যমে দেশের নদ-নদী দখল ও দূষণরোধের কাজ অনেকটা ত্বরান্বিত হতে পারে। সেই সাথে নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলা রোধে স্থানীয় জনগণকে জেগে উঠতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।