নিজেরে হারায়ে খুঁজি

স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায় কে? আবার সুযোগ পেলে অন্যকে নিজের অধীনে রাখতে চায় না কে? বেশি দামে কেনা স্বাধীনতা কম দামে বিক্রির নজির যে নেই তা তো নয়। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামের মাধ্যমে ইতিহাসের বহু পটপরিবর্তনে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগতিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জন করে তাদের আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জন প্রত্যাশিত মনোভঙ্গির পরিবর্তন ব্যতিরেকে পূরণ এবং যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বৈষম্যবিহীন দেশ, সমাজ ও অর্থনীতির জন্য আত্মত্যাগের যৌক্তিকতা ভিন্ন অর্থেই পর্যবসিত হতে পারে

পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন উপলক্ষে, যেখানে আমার নাড়ি পোঁতা সেই গ্রামে, যেখানে আমার পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, ভাইবোন বা আপনজনরা অন্ধকার কবরে শায়িত আছেন, সেখানে সস্ত্রীক সময় কাটাতে এসেছি। আমাদের তিন সন্তান। তারা তাদের সন্তান-সন্ততি নিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে বসবাস করছে। বহু বছর হলো এই গ্রামে তো বটেই ঢাকাতেও ঈদ উদযাপনে আসার অবকাশ তাদের মেলে না। এ প্রেক্ষপটে বিশেষ ধরনের একটা সহমর্মিতা প্রকাশ করার জন্য জন্মভূমির ভিটায় আমাদের এবারের এই সফর।

ঈদুল আজহার আগের দু’দিন এবং পরের দু’দিন গ্রামে এবার আমাদের অবস্থানকালে নিজেরে হারিয়ে খোঁজার এক মোক্ষম মওকা মিলল। বলা যেতে পারে, সাড়ে ছয় দশক আগে, যা আমার স্মৃতিভাণ্ডারে সংরক্ষিত আছে, আমাদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল এবং কিভাবে আমি বা আমরা বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছি, কিভাবে এখানে সেখানে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বিবর্তন ঘটেছে তার একটা মনোজাগতিক অবস্থান অবলোকনের অবকাশ পেলাম যেন।

আমার শৈশবকাল কেটেছে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় পরিত্যক্ত এক জনপদে। বিগত শতকের ষাটের দশকে ওয়াপদা ভেড়ি পোল্ডার প্রকল্পের বদৌলতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং ঘোলা পানির জলস্রোতে ভাসমান অঞ্চল ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক জনপদে পরিণত হয়। নিষ্ফলা কৃষি জোতজমির মালিক আমার পিতা অগত্যা ব্যবসাবাণিজ্যে নিয়োজিত থাকতেন। সেখানেও বড় উত্থান-পতন ঘটত। পাঁচ বোন তিন ভাইকে সমান যত্নে পড়াতে পারেননি। আমি মূলত সরকারি বৃত্তি এবং শিক্ষকমণ্ডলীর স্নেহ বদান্যতায় উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিভিল সার্ভিসের চাকরিতে যোগ দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠালাভের সুযোগ পাই। নিজের দিকে যখন তাকাই তখন জীবনের পরতে পরতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহিমা উপলব্ধি করি, সবসময় তারই রহমতে সবরের স্বীকৃতি পাই। গাঁওগ্রামে অগণিত মানুষের দোয়া ও শুভ কামনায় দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার সুযোগ পাই। সে কাজে ‘আমরাই আমাদের শত্রু সেজে’ নিজেদের পায়ে নিজে কুড়াল মারার অযৌক্তিক অপবাদের শিকার হই, যাতে পরশ্রীকাতর ঘরভেদি বিভীষণরা, ঘসেটি বেগমেরা তৃপ্তি পায় এটা নতুন কিছু নয়। আমার জন্য চার দিকে খোদার রহমত, রহামানুর রাহিমের অশেষ নেয়ামত ভোগ বা প্রত্যক্ষ করি।

গ্রামে বসে জানতে পারলাম আমাদের অডিট সার্ভিসের সজীব সতেজ সক্রিয় সাহসী মেধাবী সহকর্মী জনাব আবু নোমান মোহাম্মদ হোসেন ঈদের দিনে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমাদের মাঝ থেকে তিনি তার এই অকস্মাৎ প্রস্থান অগ্রজ হিসেবে আমাদেরকে এবং অসংখ্য অনুজকে নিজেদের হারিয়ে খোঁজার সবক যেন দিয়ে গেলেন। আমরা কতকিছু করার কল্পনা-পরিকল্পনা করি; কিন্তু আশপাশের অন্যদের অকস্মাত প্রস্থানেও আমরা নিজ নিজ অন্যায় অনিয়ম দুরভিসন্ধি দুর্নীতি দুরাচার থেকে সরে আসার শিক্ষা নিই না।

এর থেকে এ উপলব্ধিতেও আনত হই যে, বাংলাদেশের ৫৬ বছর বয়সে আর্থ-সামাজিক খাত ও ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি বা তাতে সমাজ ও সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেছে অভিনিবেশ সহকারে তা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা সাফল্য যতখানি তার চাইতে ব্যর্থতার পাল্লা ভারী মনে হয়।

বিগত ৫৬ বছরে কারিগরি শিক্ষা খাতে সরকার যে অর্থ ব্যয় করেছে তার উপযুক্ত রিটার্ন খুব নগণ্য। লাখ লাখ কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্তরা সার্টিফিকেটধারী গেল কোথায়? এ যেন ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরি হয়ার, নর এনি ড্রপ টু ড্রিংক’। ফলে বিদেশে যে শ্রমিক পাঠানো গেছে তা স্কিলড বা প্রশিক্ষিত নয়, গ্রামে এখন ইলেকট্রিশিয়ান, ছোটখাটো সেবামূলক কাজ কিংবা অনেকগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার বা প্রয়োগ কৌশল জানে এমনদের সহজে পাওয়া যায় না। টেকসই উন্নয়নে লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা লাভ করেনি। দেশ প্রচুর শিক্ষিত বেকারে ভরপুর অথচ বিদেশের স্মার্ট শিক্ষিতরা আমাদের মতো রেমিট্যান্স নির্ভরশীল দেশ থেকে চাকরি করে রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে। সফল শিল্পোদ্যোক্তারা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথচ তাদের শিক্ষিত সন্তানরা শিল্পোদ্যোগের বা উদ্যোক্তার জোয়াল কাঁধে নিতে চায় না। আয়বৈষম্যে সামাজিক ও পারিবারিক ঐক্য ভেঙে গিয়ে দেশের ভাবি উদ্যোক্তা মেধাবী সন্তানরা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে তারা দেশে ফিরছে না। সমাজে মন্দ মানুষেরা ভালো মানুষদের রান আউট করে সাজঘরে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এখন এত মানুষের ভিড়ে মিতালী মুখার্জির সেই মানুষ নাই। এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব শিক্ষককে পুরো বেতনভাতা ট্যাক্স-এর টাকায় পরিশোধ করা হলেও তাদের দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য বাজেটের টাকা স্বাস্থ্যসেবা খাতের উৎকর্ষতা সাধনে কাজে লাগছে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পাবলিক মানি ব্যয়ের দ্বারা ন্যায্য ফল পাওয়া যচ্ছে না। কী হলো বা কী হচ্ছে? হতাশা বাড়ছে। ধৈর্য হারা হচ্ছে পরিবার সমাজ ও দেশ। এবার গ্রামে এসে দেখলাম স্কুলের শিক্ষকরাও মাদক আসক্তদের সাথে বা দ্বারা পারস্পরিকভাবে প্রতারিত হচ্ছে। প্রতারণা নানা আঙ্গিক প্রকার ও উপায়ে সমাজে সর্বত্র গেড়ে বসেছে। বেশি দামে বা খরচে আমদানিকৃত বা উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহে লাইনে ত্রুটি বা অব্যবস্থাপনার কারণে বিতরিত হচ্ছে না। বিদ্যুৎনির্ভর শিক্ষার্থী, মাঠের কৃষক, পচনশীল সামগ্রী সংরক্ষণে বিপুলভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

সামনে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আসছে। রেষারেষি দলাদলি চরম আকার ধারণ করতে পারে। ভালো মানুষরা পালাবার পথ খুঁজছে। অতীতে দুষ্কর্মকারীরা আপাত পালিয়ে থাকলেও তারা নাশকতার ছক আঁকড়ে তাদের অর্জিত বিপুল কালো টাকা সমাজের সাদা চরিত্রকে কলুষিত করতে ব্যয় করছে। কে কিভাবে বাঁচাবে শিক্ষার্থীদেরকে মাদকের পথ থেকে সরাতে, বৈষম্যের বিবরে রেখে যাওয়া সমাজ দেশ ও অর্থনীতি কে জবাবদিহির আওতায় আনবে?

২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর ২০২৪-এর বর্ষসেরা দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অনন্য মর্যাদা লাভ করে। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ সাময়িকী সে সংখ্যায় উপশিরোনামে বলেছিল ‘বাংলাদেশ বিগিনস এগেইন’। এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী আমজনতার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও সাধ, আত্মমর্যাদা বিকাশের অধিকার লাভের উদ্দেশ্যে নিয়োজিত সুদীর্ঘ সংগ্রামের নবতর বিজয়ের লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অনন্য ঐক্য গঠনের মাধ্যমে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবার, স্বাধীন আশায় পথ চলার এবং আপন বুদ্ধিমতে চলবার প্রেরণা ও ক্ষমতা লাভ করে ।

বৈষম্যবিহীন সমাজে স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার; কিন্তু এই অধিকার কেউ কাউকে এমনিতে দেয় না, কিংবা ছেলের হাতের মোয়ার মতো নয় তা সহজপ্রাপ্যও, তাকে অর্জন করতে হয়, ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে তা আদায় করে নিতে হয়। তবে বরাবরের মতো সেই অর্জনকে সুসংহত করার শক্তি ও মূল্যবোধ বিকাশ ব্যতীত এই অর্জনকে টেকসই করাও কঠিন। কেননা স্বাধীনতার শত্র“র অভাব নেই। স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায় কে? আবার সুযোগ পেলে অন্যকে নিজের অধীনে রাখতে চায় না কে? বেশি দামে কেনা স্বাধীনতা কম দামে বিক্রির নজির যে নেই তা তো নয়। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জনগণ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামের মাধ্যমে ইতিহাসের বহু পটপরিবর্তনে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক ত্যাগতিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জন করে তাদের আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিজয় অর্জন প্রত্যাশিত মনোভঙ্গির পরিবর্তন ব্যতিরেকে পূরণ এবং যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বৈষম্যবিহীন দেশ সমাজ ও অর্থনীতির জন্য আত্মত্যাগের যৌক্তিকতা ভিন্ন অর্থেই পর্যবসিত হতে পারে ।

ব্যবসাবাণিজ্য ব্যাপদেশে এ দেশে আগমন ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড় থেকে আসা ইংরেজদের। তাদের আগে মগ ও পর্তুগিজরাও অবশ্য এসেছিল এ দেশে। প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনায় এরা পরস্পরের শত্র“ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। অত্যাচারী মগ ও পর্তুগিজদের দমনে ব্যর্থ প্রায় সমকালীন শাসকবর্গের সাহায্যে এগিয়ে আসে নৌযুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ইংরাজ বণিক। ক্রমে তারা অনুগ্রহভাজন হয়ে ওঠে সমকালীন বিলাসপ্রিয় উদাসীন শাসকবর্গের আর সেই উদাসীনতার সুযোগেই রাজপ্রাসাদ-অপ্রান্তরে কূটনৈতিক প্রবেশ লাভ ঘটে ইংরেজদের। প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁকে হাত করে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে। পরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে বাংলা বিহার উড়িষ্যার এবং ক্রমে ক্রমে ভারত বর্ষের প্রায় গোটা অঞ্চল। ঈসা খাঁ, মীর কাসিম খাঁন, টিপু সুলতান প্রমুখ সমকালীন স্বাধীনচেতা রাজন্যবর্গ স্থানীয়ভাবে তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চাঙ্গা করেও ব্যর্থ হন- বলাবাহুল্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু সেখান থেকেই। বিদেশ বিভুঁইয়ে সাহায্য ও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য সম্প্রদায়গত বিভাজন সৃষ্টি করতে আনুকূল্য প্রদর্শনার্থে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তন করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই নীতির ফলে এ দেশীয় স্বাধীনতাকামী জনগণের মধ্যে পৃথক পৃথক অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হয় এবং ব্রিটিশ শাসকের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে বৃহৎ দু’টি সম্প্রদায়। হিন্দু জমিদাররা ইংরেজদের আনুগত্য পেতে থাকে, পক্ষান্তরে রাজ্য হারিয়ে মনমরা মুসলমান সম্প্রদায় (যার অধিকাংশ পরিণত হয় রায়ত কৃষকে) দিন দিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহেও ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি বেশ কাজ করে, আরো দ্বিধাবিভক্তিতে আচ্ছন্ন হয় উভয় সম্প্রদায়। এরপর স্যার সৈয়দ আহমদ, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী, খানবাহাদুর আহছান উল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারবাদী কর্মপ্রচেষ্টার ফলে বা ধীরে ধীরে আধুনিক শিক্ষার আলোক পেয়ে বাংলাদেশের মানুষ ক্রমান্বয়ে চক্ষুষ্মান হতে থাকে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস এবং তার ২১ বছর পর ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম লীগ’ নামের রাজনৈতিক সংগঠন। বৃহৎ ভারত বর্ষের ব্যাপারে না গিয়ে শুধু এই বাংলাদেশ বিষয়ে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে প্রধান ঘটনা স্থপতি হিসেবে কাজ করেছে তা হলো ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এমন দ্বিধাবিভক্তির প্রেক্ষাপটে প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব থেকেই ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পূর্ববাংলার নেতা শের-ই-বাংলা ‘উপমহাদেশের মুসলমান প্রধান অঞ্চলগুলো নিয়ে ‘রাষ্ট্রগুলো’ গঠনের প্রস্তাব করেন। ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রগুলো গঠনের প্রস্তাবকে’ উপচিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতায়, পূর্ব বঙ্গবাসীদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সহস্রাধিক মাইল ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে একীভূত হয় এবং পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এটা যে পূর্ববঙ্গের প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা প্রাপ্তি ছিল না; বরং উপনিবেশবাদের কাছে হস্তান্তর মাত্র তা পূর্ব বঙ্গবাসীরা ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করতে পারেন। এটা বোঝা গিয়েছিল এই নব্য উপনিবেশবাদে নিজেদের আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে তাদের সচেতনতার পরিচয় দেয় ১৯৫২ ও ভাষা আন্দোলনে, ১৯৫৪’র নির্বাচনে, ১৯৬২’র ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে। এতদিনে পশ্চিম পাকিস্তানি সামন্তবাদী চক্রের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়। একইভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি বৈষম্যের বিরোধও তেমনি তাদেরকে প্রথমে স্বাধিকার এবং পরে স্বাধীনতার আন্দোলনে উজ্জীবিত করে। ১৯৭১-এর অব্যবহিত পরে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা কেনাবেচার নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে নিজেকে হারিয়ে খোঁজার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। এখন নতুন করে শুরু করার (বাংলাদেশ বিগিনস এগেইন) সুযোগ সবার সামনে সমুপস্থিত।

লেখক : অনুচিন্তক