কোরবানির ঈদ শেষ হয়েছে। কিন্তু ঈদের পর রাজধানীর কিছু এলাকায় যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা কোনো আধুনিক নগরের সাথে কী মানানসই? রাস্তার পাশে পড়ে আছে কোরবানির পশুর বর্জ্য। কোথাও জমে আছে পুরনো ময়লা। কোথাও দুর্গন্ধ। কোথাও জনভোগান্তি। বিষয়টি এতটা গুরুতর হয়ে ওঠে যে, খোদ প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় ব্যবস্থার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, সমস্যার মূল কি শুধু ওই দুই কর্মকর্তা? নাকি আরো গভীরে?
এবার কোরবানির বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশন যে চেষ্টা করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাঠে ছিলেন। অনেক এলাকায় দ্রুত বর্জ্য অপসারণও হয়েছে। আবহাওয়াও ছিল অনুকূলে। নাগরিকদের সচেতনতাও আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি অতীতের অনেক বছরের তুলনায় ভালো ছিল। তবু কিছু এলাকায় অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েছে। সেই ব্যর্থতার দায়ে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
জবাবদিহির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ইতিবাচক। দায়িত্বে অবহেলা করলে শাস্তি হতে হবে। রাষ্ট্রের প্রশাসনে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চলতে পারে না। কিন্তু এখানে প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। বরং এখান থেকে আসল প্রশ্ন শুরু হয়। যেসব এলাকায় বর্জ্য জমে ছিল, সেসব বর্জ্য কোথা থেকে এলো? কেবল কোরবানির পশু জবাইয়ের কারণে? নাকি এর পেছনে আরো কারণ ছিল?
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রায় ২৪টি পশুর হাটের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত হাটের বাইরে অসংখ্য অস্থায়ী পশুর বাজার বসে। অনেক জায়গায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছাগলের হাট বসেছে। মহল্লার ভেতরে হাট বসেছে। ফুটপাথ দখল হয়েছে। রাস্তা দখল হয়েছে। কোথাও কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
তেজগাঁও পলিটেকনিক মাঠে একটি নির্দিষ্ট স্থানে পশুর হাট হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, হাট ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। গোটা তেজগাঁও যেন পশুর বাজারে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় মেট্রোরেলের নিচেও পশুর হাট বসেছে।
এগুলো কি রাতারাতি ঘটেছে? না। দিনের পর দিন ঘটেছে। সবার চোখের সামনে ঘটেছে। তাহলে দায়িত্ব কার? সিটি করপোরেশন কী একা এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কি শুধু সিটি করপোরেশনের? বাস্তবতা হলো, না।
এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও দায়িত্ব ছিল। বিশেষ করে পুলিশের। অবৈধ হাট উচ্ছেদ করা, রাস্তা দখল বন্ধ করা, অনুমোদনের বাইরে বাজার পরিচালনা ঠেকানো, এসব কাজ প্রশাসনিক সমন্বয় ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে সেই সমন্বয় কোথায় ছিল?
যখন অবৈধ হাট বসছিল, তখন কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? যখন রাস্তা দখল হচ্ছিল, তখন কেন বাধা দেয়া হয়নি? যখন মেট্রোরেলের নিচে পশুর বাজার বসছিল, তখন কেন কেউ এগিয়ে আসেনি? এসব প্রশ্নের উত্তর অজানা। অথচ ঈদের পর বর্জ্য পরিষ্কার না হওয়ার জন্য দায়ী করা হচ্ছে কেবল সিটি করপোরেশনকে। এটি কি যুক্তিসঙ্গত?
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। পশুর হাটের ইজারার শর্ত ছিল, হাট শেষে সংশ্লিষ্ট ইজারাদাররা নিজেদের খরচে এলাকা পরিষ্কার করবেন। এটি কোনো নতুন নিয়ম নয়। বহু বছর ধরে এ শর্ত বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবে কতজন ইজারাদার ওই দায়িত্ব পালন করেছেন? অভিযোগ হলো, প্রায় কেউই করেনি। যদি সত্যিই তা না হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কেন হয়নি? শর্ত ভঙ্গের দায়ে কতজন ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? কতজনকে জরিমানা করা হয়েছে? কতজনকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে? উত্তর এখন পর্যন্ত প্রায় শূন্য।
এখানেই বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। নিয়ম তৈরি হয়। শর্ত দেয়া হয়। নির্দেশ জারি হয়। কিন্তু ভঙ্গের পরিণতি থাকে না। ফলে নিয়ম কাগজে থাকে। বাস্তবে প্রয়োগ হতে দেখা যায় না। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে পশুর হাটের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সাথে সম্পর্কিত থাকেন। স্থানীয়ভাবে তাদের প্রভাব থাকে। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে চায় না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও অনেক সময় নীরব থাকে।
ফল একটাই। আইন দুর্বল হয়। রাষ্ট্র দুর্বল হয়। শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এবারো সেই চিত্র দেখা গেছে। মহল্লায় মহল্লায় যে হাট বসেছে, সেগুলোর অনেকগুলো স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুমোদন ছিল না। তবু হাট বসেছে। কেউ বাধা দেননি।
কেন দেননি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বিপদ তখন দেখা দেয়, যখন রাজনৈতিক পরিচয় আইনকে অকার্যকর করে দেয়। আইন যদি সাধারণ মানুষের জন্য এক রকম হয় আর ক্ষমতাবানদের জন্য আরেক রকম হয়, তাহলে সেটি আর আইনের শাসন থাকে না। সেটি হয়ে যায় প্রভাবশালীদের শাসন।
আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বড় অংশ ঈদের সময় পশুর হাটগুলো পরিষ্কার করতে ব্যস্ত ছিলেন। কারণ, ইজারাদাররা নিজেদের দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে সিটি করপোরেশনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এর ফলে অন্য এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বিলম্ব হয়েছে। এটি কোনো অজুহাত নয়, বাস্তবতা।
যে জনবল অন্যত্র কাজ করার কথা ছিল, তারা অন্য কাজে আটকে গেছেন। ফলে কোথাও বর্জ্য অপসারণে সময় লেগেছে। তাহলে দায় কার? যে কর্মকর্তা পরিষ্কার করতে পারেননি, তার? নাকি যারা অবৈধ হাট বসিয়েছেন, তাদের? নাকি যারা শর্ত ভঙ্গ করেছেন, তাদের? নাকি যারা আইন প্রয়োগ করেননি, তাদের? নাকি সবার? উত্তর হলো-সবার।
সমস্যাটি ছিল সমন্বিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এতে একটি ভুল বার্তা যেতে পারে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ভাবতে পারেন, সব দায় শেষ পর্যন্ত তাদের ঘাড়ে বর্তাবে। অথচ অন্যরা দায়মুক্তি ভোগ করবেন। এ ধরনের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনকে আরো দুর্বল করে। জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু জবাবদিহি হতে হবে সবার জন্য।
যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন না করেন, তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যদি কোনো ইজারাদার চুক্তি ভঙ্গ করেন, তাকেও শাস্তি দিতে হবে। যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা অবৈধ হাট পরিচালনা করেন, তাকেও আইনের মুখোমুখি করতে হবে। আইনের সামনে সবাই সমান- এই নীতি হতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি।
বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই লক্ষণ দেখি, রোগ দেখি না। রাস্তার ময়লা দেখি। কিন্তু ময়লা তৈরির কারণ দেখি না। বর্জ্য দেখি। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দেখি না। কর্মকর্তার ভুল দেখি। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন এড়িয়ে যাই। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। এক বছর পর আবার একই ঘটনা ঘটে। আবার সবকিছু আগের জায়গায় ফিরে যায়।
এ চক্র ভাঙতে হবে। প্রথমত, অনুমোদিত হাটের বাইরে কোনো পশুর হাট বসতে দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, রাস্তা ও জনপথ দখল করে পশুর বাজার বসানোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, ইজারাদারদের কাছ থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জামানত রাখতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে সেই জামানত বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
চতুর্থত, অবৈধ হাটের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও ছাড় দেয়া যাবে না। পঞ্চমত, সিটি করপোরেশন, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখতে হবে। একটি শহর শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের শ্রমে পরিচ্ছন্ন থাকে না। একটি শহর পরিচ্ছন্ন থাকে আইন মানার সংস্কৃতিতে। দায়িত্ববোধে। জবাবদিহিতে। রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। যে শহরে নিয়ম ভাঙা লাভজনক, সেখানে ময়লা শুধু রাস্তায় জমে না। ময়লা জমে প্রশাসনে। ময়লা জমে রাজনীতিতে। ময়লা জমে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে। ঈদের বর্জ্য কয়েক দিনের মধ্যে সরিয়ে ফেলা সম্ভব। কিন্তু দায়মুক্তির বর্জ্য সরানো অনেক কঠিন।
কাজটি শুরু না হলে আগামী বছরও হয়তো আমরা একই দৃশ্য দেখব। শুধু শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তার নাম বদলাবে। সমস্যার নাম বদলাবে না।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



