ভুল যুদ্ধের দায় কে নেবে

বিশ্বরাজনীতির এই দ্বিচারিতা আজ মানুষকে হতাশ করছে। এক দিকে মানবাধিকারের কথা বলা হয়, অন্য দিকে একই শক্তিধর রাষ্ট্র স্বার্থের প্রশ্নে যুদ্ধকে বৈধতা দেয়। এক দিকে শান্তির আহ্বান, অন্য দিকে অস্ত্র ব্যবসার প্রসার। এই ভণ্ডামিই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

আহসান হাবিব বরুন
রামায়ণের অন্যতম চরিত্র মন্থরা, যে নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, কুটিল বুদ্ধি ও ক্ষমতার মোহে একটি রাজ্যকে অশান্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, আজও যেন পৃথিবীর রাজনীতিতে বারবার ফিরে আসে। ইতিহাসের প্রতিটি অস্থির সময়ে, প্রতিটি যুদ্ধের প্রাক্কালে, প্রতিটি মানবিক বিপর্যয়ের আগে আমরা যেন একই কণ্ঠ শুনি, ভয় দেখাও, বিভাজন সৃষ্টি করো, শক্তির দম্ভ দেখাও, তারপর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শান্তির ভাষণ দাও।

আজকের বিশ্বরাজনীতিতে সেই পুরনো কণ্ঠস্বর যেন আবারো শোনা যাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন, ইরাক যুদ্ধ ছিল ‘চরম বোকামি’, শুরুতেই সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়া উচিত হয়নি। একই সাথে তিনি আবার দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ না নিলে দেশটি পরমাণু অস্ত্রের মালিক হয়ে যেত। এই দ্বৈততা, এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানই আসলে বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গভীর সঙ্কটকে উন্মোচন করে।

এখানে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন ওঠে- যে রাষ্ট্র নিজেই স্বীকার করে তার অতীতের যুদ্ধ ছিল ভুল, সে আবার কিভাবে নতুন সঙ্ঘাতের নৈতিক বৈধতা দাবি করে?

ইরাক যুদ্ধের পরিণতি পৃথিবী দেখেছে। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগ তুলে একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা হলো অথচ পরে প্রমাণিত হলো সেই অভিযোগের ভিতই ছিল দুর্বল। লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি, মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্য দায় কে নেবে? ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু করা সহজ; কিন্তু যুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানবসভ্যতাকে পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।

আজ ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমাদের সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি’, তখন সেটি নিছক আত্মসমালোচনা নয়; বরং এটি আমেরিকান সামরিক আগ্রাসনের এক অনিচ্ছাকৃত স্বীকারোক্তি। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো, একই সাথে তিনি আবার শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি চালিয়ে যেতে চান। এক দিকে অনুশোচনা, অন্য দিকে নতুন হামলার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা- এই দ্বিমুখী নীতি বিশ্বকে আরো বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে ‘বিশ্ব পুলিশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে দিয়েছে এই একক কর্তৃত্ব? জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক আইন কিংবা বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে যখন একটি দেশ নিজের স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে, তখন বিশ্বব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর এই একতরফা আচরণই ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিরাপত্তাহীনতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।

ট্রাম্পের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকে এখন আর আদর্শিক লড়াই হিসেবে দেখে না; বরং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। তিনি বলেছেন, ইরানের সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়নি, কারণ অতীতে ‘সবকিছু ধ্বংস করে দেয়া’ ভুল হয়েছে। এই বক্তব্য শুনতে মানবিক মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ ভয়াবহ। অর্থাৎ, কোথায় কতটুকু ধ্বংস করতে হবে, কোনো রাষ্ট্রকে কত বছর পিছিয়ে দিতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও যেন কয়েকজন ক্ষমতাধর নেতার টেবিলে নির্ধারিত হয়।

যুদ্ধের আগুন কখনো সীমান্ত মানে না। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিটি সঙ্ঘাতের অভিঘাত আজ ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এমনকি বাংলাদেশের বাজারেও অনুভূত হয়। তেলের দাম বাড়ে, খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। একজন দিনমজুর, একজন রিকশাচালক কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের গৃহিণী হয়তো আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল হিসাব বোঝেন না; কিন্তু তারা ঠিকই বুঝতে পারেন বাজারে চাল, ডাল, তেল ও শিশুখাদ্যের দাম কেন হঠাৎ বেড়ে যায়।

বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধনীতি আজ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সঙ্কট, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, সবকিছুর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ যারা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের জীবনে সেই কষ্টের ছায়া পড়ে না।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের বড় সমস্যা হলো, তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রায়ই ব্যবসায়িক দরকষাকষির মতো দেখেন। সেখানে মানবিকতা, কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার চেয়ে তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদর্শন বেশি গুরুত্ব পায়। এই মনোভাব শুধু আমেরিকার জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক। কারণ যখন কোনো পরাশক্তির নেতা অস্থির, আবেগপ্রবণ এবং আত্মকেন্দ্রিক অবস্থান নেন, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

বিশ্ব আজ এক নতুন শীতল যুদ্ধের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইরান, সব পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। পারমাণবিক অস্ত্রের ছায়া আবার ঘন হচ্ছে। অথচ মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন যুদ্ধ নয়, সহযোগিতা। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, মহামারী, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা- এসব বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলায় ঐক্য দরকার। কিন্তু বিশ্বনেতাদের একাংশ যেন এখনো সামরিক আধিপত্যের পুরনো খেলায় মত্ত।

ইতিহাস সাক্ষী, সাম্রাজ্যবাদ কখনো স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া কিংবা সিরিয়া, প্রতিটি উদাহরণ প্রমাণ করে, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ একটি রাষ্ট্রকে শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, সামাজিক ও মানবিক দিক থেকেও বিপর্যস্ত করে তোলে। যুদ্ধের পর জন্ম নেয় অনিশ্চয়তা, উগ্রবাদ, শরণার্থী সঙ্কট এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত।

ট্রাম্প হয়তো এখন অতীতের ভুলের কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ভুলের দায় কে নেবে? নিহত লাখো মানুষের জীবনের মূল্য কে দেবে? যে শিশুরা যুদ্ধের কারণে শিক্ষা হারিয়েছে, যে পরিবারগুলো ধ্বংস হয়েছে, যে দেশগুলো কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে, তাদের প্রতি কি শুধু ‘ভুল হয়েছে’ বললেই দায় শেষ হয়ে যায়?

বিশ্বরাজনীতির এই দ্বিচারিতা আজ মানুষকে হতাশ করছে। এক দিকে মানবাধিকারের কথা বলা হয়, অন্য দিকে একই শক্তিধর রাষ্ট্র স্বার্থের প্রশ্নে যুদ্ধকে বৈধতা দেয়। এক দিকে শান্তির আহ্বান, অন্য দিকে অস্ত্র ব্যবসার প্রসার। এই ভণ্ডামিই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

পৃথিবীর মানুষ শান্তি চায়। তারা চায় খাদ্যের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতাধর নেতাদের অহঙ্কার, প্রতিযোগিতা ও আধিপত্যবাদী মানসিকতা সেই স্বপ্নকে বারবার ভেঙে দিচ্ছে।

মন্থরার মতো কুটিল পরামর্শদাতারা ইতিহাসে সবসময় ছিল। তারা ক্ষমতাকে উসকে দেয়, যুদ্ধকে মহিমান্বিত করে, বিভাজনকে স্থায়ী করতে চায়। কিন্তু সভ্যতার অগ্রযাত্রা কখনো তাদের হাতে নিরাপদ হয়নি। আজ যখন আবারো যুদ্ধের ভাষা শোনা যায়, তখন বিশ্ববাসীর উচিত আরো জোরালোভাবে শান্তির পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]