পাহাড়ের বিদ্রোহ

‘একমাত্র উপায়’ মিথের আড়ালে

‘একমাত্র উপায়’ তত্ত্বটি মূলত এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষামূলক আখ্যান। এই আখ্যানের আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সত্যটি ঢাকা পড়ে রয়েছে, তা উন্মোচন করা আজ অত্যন্ত জরুরি। এই অঞ্চলের দশকের পর দশক ধরে চলা সশস্ত্র অস্থিরতায় বহু পাহাড়ি ও বাঙালি জীবন হারিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং শান্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পার্বত্য সঙ্কটের প্রকৃত সমাধান প্রোপাগান্ডা বা ঐতিহাসিক সত্য আড়াল করে সম্ভব নয়

জি. এম. আহমেদ
পাহাড়ের নৈসর্গিক অবয়ব মানুষকে অপার্থিব প্রশান্তির বার্তা দেয়। যেন অপার সৌন্দর্য আর অনাদি স্থিতি সেখানে মিলেমিশে একাকার। তবে প্রকৃতির এই শান্ত নীরবতা যে সবসময় একটি অঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের সাক্ষ্য দেয় না, তার জীবন্ত উদাহরণ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে এখানে জমে আছে দীর্ঘ টানাপড়েন, মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব আর অশান্তির জটিল ইতিহাস। এই ইতিহাস কেবল ভূমি কিংবা রাজনীতির গতানুগতিক আখ্যান নয়, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে অধিকারহীনতার ক্ষোভ, বঞ্চনার হতাশা এবং ভাঙা-গড়ার এক অন্তহীন মনস্তত্ত্ব।

পার্বত্য অঞ্চলের এই দীর্ঘ সঙ্কটের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-পিসিজেএসএস এবং এর তৎকালীন সশস্ত্র শাখা ‘শান্তি বাহিনী’র বিদ্রোহ। পাহাড়ি নেতৃত্বের একটি বড় অংশের দাবি : তৎকালীন সময়ে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই তারা অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ‘বাধ্যবাধকতা’ বা ‘একমাত্র বিকল্প’-এর তত্ত্বটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় ও সমতলের একাংশের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে এসেছে।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ আলোয় যদি আমরা তাকাই, তবে প্রশ্ন জাগে, এই দাবি কতটা বস্তুনিষ্ঠ? পাহাড়ের সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত শুরুটা ঠিক কোথায় হয়েছিল? এই জটিল আখ্যানের পেছনের সত্যটি কেবল সাদা-কালো সমীকরণে মেলানো সম্ভব নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক পরিকল্পনা।

সশস্ত্র সংগ্রামই কি ছিল শেষ বিকল্প
পিসিজেএসএসের বর্তমান সভাপতি ও শান্তি বাহিনীর সাবেক ফিল্ড কমান্ডার সন্তু লারমা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি আদায়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই তারা চূড়ান্ত পথ বেছে নেন। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি তারিখটিকে তারা সশস্ত্র বিপ্লব শুরুর আনুষ্ঠানিক ক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন। সংগঠনটির প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানও এটিই যে, আত্মপরিচয় ও জননিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্র ধারণ করা ছাড়া তাদের আর কোনো ‘উপায়’ ছিল না।

কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল ও সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এই দাবির সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় নেতারা তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ও খোলামেলা আলোচনার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তা করেছিলেনও। এমনকি সশস্ত্র সঙ্ঘাত শুরুর পর কিংবা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঝড়ো হাওয়াতেও এই অঞ্চলে পিসিজেএসএসের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি।

সংগঠনটি তার রাজনৈতিক তৎপরতা নিজস্ব উপায়ে জারি রাখতে পেরেছিল। অন্তত ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত যে পার্বত্য রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ ও আইনি পথগুলো অবারিত ছিল, তা অনস্বীকার্য। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই উন্মুক্ত পরিবেশের মধ্যেই কেন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শান্তিবাহিনী’ বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের সমান্তরাল প্রস্তুতি চলছিল?

সবচেয়ে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায় পিসিজেএসএস এবং এই সশস্ত্র বিদ্রোহের মূল স্থপতি এম এন লারমার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। ১৯৭৫ সালে তিনি তৎকালীন সরকারের একক জাতীয় দল ‘বাকশাল’-এ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) যোগ দেন। প্রকাশ্যে একটি সরকারি দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যখন তিনি ব্যবস্থার ভেতর থেকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজছেন, ঠিক সেই সময়েই গোপনে পাহাড়ে সশস্ত্র কার্যক্রমের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছিল। এই অবস্থানকে রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘দ্বিমুখী কৌশল’ বা নীতিগত দ্ব্যর্থতা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?

তাছাড়া, ১৯৭৬ সাল থেকে এই সশস্ত্র বিদ্রোহ যেভাবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এবং সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল, তা কোনো আকস্মিক বা তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপের লক্ষণ নয়। একটি সুশৃঙ্খল এবং বিস্তৃত গেরিলা যুদ্ধ শুরুর জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি রসদ, প্রশিক্ষণ এবং নিখুঁত পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়, তা এই বিদ্রোহের দ্রুত বিস্তৃতিই প্রমাণ করে। অতএব, ‘গণতান্ত্রিক স্পেস না থাকায় বাধ্য হয়ে অস্ত্র ধারণ’ করার তত্ত্বটি ইতিহাসের নিবিড় পর্যালোচনায় ধোপে টেকে না।

শেকড়ের সন্ধানে : কাপ্তাই বাঁধের ক্ষত ও রাজনৈতিক জাগরণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ষাটের দশকের পাকিস্তান আমলে। ষাটের দশকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্মিত কাপ্তাই বাঁধ এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও জনমিতিতে স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রায় এক লাখ পাহাড়ি ও বাঙালি মানুষ তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি এবং উর্বর চাষাবাদের জমি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের অপরিকল্পিত পুনর্বাসন ও নামমাত্র ক্ষতিপূরণ স্থানীয় জনমনে গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

একই সময়ে সরকারি উদ্যোগে শিক্ষা বিস্তারের ফলে পাহাড়ি তরুণদের মধ্যে নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। এই তরুণ সমাজ প্রথাগত ও ঐতিহ্যবাহী সামন্ততান্ত্রিক নেতৃত্বÑ বিশেষ করে তৎকালীন চাকমা সার্কেল চিফের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ ছিল, কারণ তারা জনগণের অধিকার রক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৬৬ সালে গঠিত হয় ‘উপজাতীয় কল্যাণ পরিষদ’ এবং পরবর্তীতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শিক্ষক সমিতি’। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন মনে হলেও, এদের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক অভিপ্রায় ছিল সুনির্দিষ্ট। এই সময় থেকেই পাহাড়ি তরুণদের একাংশের মধ্যে বামপন্থী ও বিপ্লবী চিন্তাধারার প্রভাব পড়তে শুরু করে। গবেষক উইলেম ভ্যান সেন্দেল (১৯৯২) উল্লেখ করেছেন, উপজাতীয় কল্যাণ পরিষদের গঠনের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রবক্তারা প্রথমবারের মতো সামনে আসতে শুরু করেন।

‘দ্য ব্লাইন্ড স্পট’: মার্কসবাদী দর্শন ও গোপন বিপ্লবী সংগঠন
সত্তরের দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছয় দফা ও ১১ দফার আন্দোলন পাহাড়েও গভীর প্রভাব ফেলে। পাহাড়ি ছাত্র সমিতি তাদের কার্যক্রম রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তর করে এবং সমতলের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে সমর্থন জানায়। এই প্রেক্ষাপটে এম এন লারমা পাহাড়ি সমাজকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূরাজনীতি ও ভৌগোলিক বাস্তবতা ছিল বেশ জটিল। ব্রিটিশ আমল থেকেই ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ থাকার কারণে সেখানে সমতলের মতো উন্মুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেনি। তদুপরি, পার্বত্যাঞ্চলের ১১টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মধ্যে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিকাশের ভিন্নতা থাকায় তাদের সবাইকে একটি একক জাতীয়তাবাদী পতাকাতলে আনা ছিল অত্যন্ত দুরূহ কাজ।

এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এম এন লারমা মার্কসবাদ, লেনিনবাদ এবং বিশেষ করে মাও সে তুংয়ের ‘দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ’ (Protracted PeopleÕs War) তত্ত্বের মধ্যে সমাধান খোঁজেন। তবে সমতলের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে মতাদর্শগত দূরত্বের কারণে তিনি সম্পূর্ণ অঞ্চলভিত্তিক একটি গোপন বিপ্লবী দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এই কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একই সাথে দু’টি সংগঠন দাঁড় করানোর নীতি গ্রহণ করা হয় :

১. প্রকাশ্য সংগঠন : যা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলবে; কিন্তু এই সংগঠনের বেশির ভাগ সদস্যই ভেতরের গোপন কাঠামোর অস্তিত্ব সম্পর্কে অন্ধকারে থাকবেন।

২. গোপন সংগঠন : যা মূলত কট্টর মার্কসবাদী তত্ত্বে দীক্ষিত ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত হবে। এই গোপন কেন্দ্রই হবে মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ‘ছায়াতন্ত্র’।

এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭০ সালের ১৬ মে রাঙ্গামাটির এক গোপন বৈঠকে জন্ম নেয় ‘রাঙ্গামাটি কমিউনিস্ট পার্টি, আরসিপি। প্রখ্যাত পাহাড়ি লেখক সিদ্ধার্থ চাকমার মতে, তৎকালীন সেই গোপন সভারই প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি ছিল পরবর্তীকালের প্রকাশ্য সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’-পিসিজেএসএস।

আদর্শের উত্তরাধিকার : গণমুক্তি ফৌজ থেকে শান্তিবাহিনী
আরসিপি গঠনের মধ্য দিয়েই মূলত এই অঞ্চলের সশস্ত্র আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি, অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর আগেই আরসিপি একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল, ‘রাঙ্গামাটির কমিউনিস্ট পার্টির লাল ঝাণ্ডা এগিয়ে চলেছে’। সেখানে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করা হয়, ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক রাঙ্গামাটি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত মুক্তি সংগ্রাম চলবেই।’ এই ইশতেহারে একটি ‘লাল ফৌজবাহিনী’ গঠন এবং দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে উৎখাতের আহ্বান জানানো হয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও গবেষক সুবীর ভৌমিকের (১৯৯৬) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লারমা ভ্রাতৃদ্বয় পাকিস্তান আমলের শেষ দিকেই অনুমান করেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে বাঙালি ও পাহাড়িদের মধ্যে এক ধরনের স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি হতে পারে। সেই দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক হিসাব থেকেই তারা একটি গোপন ক্যাডারভিত্তিক গেরিলাবাহিনী গড়ার প্রস্তুতি শুরু করেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ক্রান্তিকালে, যখন সমতলের মানুষ পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন সন্তু লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ি যুবকদের আরসিপিতে রিক্রুটমেন্ট ও সামরিক প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। এই সশস্ত্র উইংটিই ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’-পিএলএ বা ‘গণমুক্তি ফৌজ’ নামে পরিচিতি পায়, যা গবেষক আফতাব আহমাদ (১৯৯৩) তার গবেষণায় নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির ইটছড়িতে এই ‘গণমুক্তি ফৌজ’-ই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটায় এবং কালক্রমে তা ‘শান্তিবাহিনী’ নামে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮০), সিআইএর ডিক্লাসিফাইড রিপোর্ট (১৯৮২, ১৯৮৬) এবং গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের (২০২২) মতো বহু নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্র প্রমাণ করে, শান্তি বাহিনীর এই সশস্ত্র তৎপরতা ১৯৭২ সাল থেকেই সচল ছিল।

এমনকি তৎকালীন পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোতেও ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘চাকমাস্তান’ নামক পৃথক ভূখণ্ড গঠনের প্রচারণা এবং বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর সুনির্দিষ্ট তথ্য নথিবদ্ধ রয়েছে। সুতরাং, ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে, শান্তিবাহিনী কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক সঙ্কটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না; বরং এটি ছিল আরসিপি থেকে উদ্ভূত এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক-রাজনৈতিক পরিকল্পনার চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

  • এই আখ্যান কেন আজও টিকে আছে
    ইতিহাসের এই অকাট্য দলিলগুলোর পরও কেন পিসিজেএসএস বা তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ‘একমাত্র উপায়’ বা ‘বাধ্য হয়ে অস্ত্র ধারণের’ আখ্যানটি জিইয়ে রেখেছে? এর পেছনে রয়েছে কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ :
  • সহিংসতার ন্যায্যতা : যেকোনো সশস্ত্র সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে এটিকে একটি ‘বাধ্যগত প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন হয়। ‘অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না’-এই ন্যারেটিভটি সহিংসতার নৈতিক বৈধতা দেয়।
  • ইতিহাসের সরলীকরণ ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি : একটি আদর্শিক এবং সমাজতান্ত্রিক গেরিলা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে আড়াল করে একে যদি ‘বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা গবেষকদের স্বতঃস্ফূর্ত সহানুভূতি পাওয়া সহজ হয়।
  • ভুক্তভোগী পরিচয় ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য : ‘আমরা আক্রান্ত এবং আমাদের কোনো বিকল্প ছিল না’-এই যৌথ মনস্তত্ত্ব সংগঠনের সাধারণ কর্মী ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের আবেগঘন ঐক্য ধরে রাখে। এটি তাদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের মনোবল অভ্যন্তরীণভাবে চাঙ্গা রাখে।
  • নৃতাত্ত্বিক ও ভূরাজনৈতিক ঢাল : পাহাড়ের বিশিষ্ট নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় ও এর সীমান্তসংলগ্ন স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে এই আখ্যানটিকে একটি প্রান্তিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে বিশ্বমঞ্চে চিত্রায়িত করার সুবিধা পাওয়া যায়।

শেষ কথা
পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা বা একক কোনো সরকারের আচরণের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। কাপ্তাই বাঁধের কারণে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, পাকিস্তান আমলে আরসিপির গোপন আত্মপ্রকাশ, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং স্বাধীনতার পরপরই পিসিজেএসএস ও শান্তিবাহিনীর প্রকাশ্য রূপÑ সবই ছিল একই সুতোয় গাঁথা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। পাহাড়ের নেতৃত্ব সচেতনভাবেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মার্কসবাদী-মাওবাদী ঘরানার সশস্ত্র পথ বেছে নিয়েছিলেন।

‘একমাত্র উপায়’ তত্ত্বটি মূলত এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষামূলক আখ্যান। এই আখ্যানের আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত সত্যটি ঢাকা পড়ে রয়েছে, তা উন্মোচন করা আজ অত্যন্ত জরুরি। এই অঞ্চলের দশকের পর দশক ধরে চলা সশস্ত্র অস্থিরতায় বহু পাহাড়ি ও বাঙালি জীবন হারিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং শান্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পার্বত্য সঙ্কটের প্রকৃত সমাধান প্রোপাগান্ডা বা ঐতিহাসিক সত্য আড়াল করে সম্ভব নয়। সততা ও স্বচ্ছতার সাথে অতীতের ভুলভ্রান্তি ও কৌশলগত সত্য স্বীকার করেই কেবল বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম পাহাড়ের বুকে একটি স্থায়ী, টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যেখানে কোনো মিথের আড়ালে নয়; বরং সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিনির্মিত হবে পাহাড় ও সমতলের এক যৌথ প্রীতিময় জনপদ।

তথ্যসূত্র :

  • মহিউদ্দিন আহমদ (২০২২), পার্বত্য চট্টগ্রাম : শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন, প্রথমা প্রকাশন।
  • সুবীর ভৌমিক (১৯৯৬), Insurgent Crossfire: North East India, ল্যান্সার পাবলিশার্স, নয়াদিল্লি।
  • উইলেম ভ্যান সেন্দেল (১৯৯২), ‘The Invention of the Jummas’, মডার্ন এশিয়ান স্টাডিজ।
  • সিদ্ধার্থ চাকমা (১৩৯২ বঙ্গাব্দ), প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম, নাথ ব্রাদার্স, কলকাতা।
  • সিআইএ ডিক্লাসিফাইড রিপোর্ট (১৯৮২, ১৯৮৬), Bangladesh: Tribal Unrest in the Chittagong Hills.
  • অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮০), Bangladesh: Recent Developments in the CHT.

লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রাম অনুরাগী ও গবেষক