বাজেট ঘাটতি ও সুদের অভিশাপ

আমরা সরকারের কাছে চারটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রত্যাশা করি। প্রথমত, আগামী দুই বছরের মধ্যে সার্বভৌম সুকুকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হোক এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোসহ সব কিছু সুকুকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অর্থায়ন করা হোক। পাশাপাশি সরকারি সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ঋণপত্র সুদমুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন জাতীয় জাকাত কর্তৃপক্ষ গঠন করা হোক, যেখানে জাকাত ও করের সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল জাকাত পেমেন্ট ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। তৃতীয়ত, ওয়াক্ফ প্রশাসনের সংস্কার করে একটি আধুনিক ও সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হোক। চতুর্থত, রাজস্ব কাঠামোতে ক্রমান্বয়ে পরোক্ষ কর কমিয়ে আনার রূপরেখা প্রণয়ন করা

ড. (মুফতি) ইউসুফ সুলতান ও প্রফেসর মোহাম্মদ কবির হাসান
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি অনেকের কাছেই প্রত্যাশার প্রতীক। কিন্তু বাজেটের গুরুত্ব এর আকারে নয়, এর অভিমুখে। বাজেট হলো রাষ্ট্র কোথা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে, কিভাবে ব্যয় করে এবং ঘাটতি মেটাতে কোন পথ বেছে নেয়, সেসব পছন্দের সমষ্টি। তাই বাজেট স্রেফ হিসাবের খতিয়ান নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের দর্পণ। আর সেই দর্পণে আজ যে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তা স্বস্তিদায়ক নয়।

এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশ দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকছে। ফলে, প্রতি চার টাকা খরচ করতে সরকারকে এক টাকা ধার করতে হবে। এই ঘাটতি মেটানো হবে ট্রেজারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং বিদেশী ঋণের মাধ্যমে। এই তিনটি পথের প্রতিটিতেই রয়েছে সুদ।

প্রতি বছর কেবল সুদের কিস্তি মেটাতেই বাজেটে বিপুল অর্থ আগেভাগে সরিয়ে রাখতে হয়। শুধু এই অর্থবছরেই পুরনো ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ এক লাখ সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা-মোট বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ। এই অঙ্ক পুরো শিক্ষা খাতের বরাদ্দকে ছাড়িয়ে গেছে এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রায় দ্বিগুণ। বিষয়টিকে একবাক্যে বললে দাঁড়ায়, রাষ্ট্র এখন তার শিশুদের পড়ানোর চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে অতীতের ঋণের সুদ গুনতে। এ কেবল উদ্বেগজনক নয়, জাতির ভবিষ্যৎকে বর্তমানের দায়ের কাছে বন্ধক রাখার শামিল।

সুদভিত্তিক ঋণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এই চক্র নিজে থেকেই বাড়তে থাকে। ঘাটতি মেটাতে ঋণ নিতে হয়, সেই ঋণের সুদ শোধ করতে গিয়ে ঘাটতি আরো বাড়ে, ফলে আরো বড় ঋণ নিতে হয়। আল্লাহ তায়ালা আলকুরআনে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি সুদ নিঃশেষ করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করে দেন। (২ : ২৭৬) সুদভিত্তিক ঋণ ও অর্থনীতিতে তাই বারাকাহ বা আল্লাহর অনুগ্রহ থাকে না।

বাজেটের ব্যয় মেটাতে সরকারকে প্রাথমিকভাবে নির্ভর করতে হয় নানাবিধ করের ওপর। এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট আদায়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আমদানি শুল্ক থেকে, যেগুলো সবই পরোক্ষ কর। ফলে একজন দরিদ্র মানুষ যখন মোবাইলে রিচার্জ করেন কিংবা বাজার থেকে নিত্যপণ্য কেনেন, তখন তাকেও ঠিক ততটুকুই ভ্যাট দিতে হয়, যতটুকু দেন একজন কোটিপতি ব্যবসায়ী। দুজনের আয়ের ব্যবধান আকাশ-পাতাল, অথচ করের হার অভিন্ন। কারণ পরোক্ষ কর আয়ের অনুপাতে নয়, ভোগের ভিত্তিতে আদায় হয়। ফলে যার আয় যত কম, আনুপাতিক হারে করের বোঝা তার কাঁধেই তত ভারী হয়ে চাপে।

ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি বলে ঠিক উল্টো কথা। যেমন, জাকাত আদায় করতে হয় পুঞ্জীভূত সম্পদের ওপর, দৈনন্দিন ক্রয় বা ভোগের ওপর নয়। যার কাছে সম্পদ জমে আছে, বা যে ধনী, সে জাকাত দেবে। যে সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে, তার কাঁধে অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হবে না। এটিই ইনসাফ।

করভিত্তিক এ বাজেটের আরেকটি বিচিত্র দিক আছে। রাষ্ট্র এক হাতে কৃষক ও দরিদ্র পরিবারকে ভর্তুকি দিচ্ছে প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা, আর অন্য হাতে ভ্যাটের মাধ্যমে সেই একই মানুষের পকেট থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি তুলে নিচ্ছে। এ যেন এক হাতে কিছু দিয়ে অন্য হাতে বেশি নিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা। পরোক্ষ কর স্বভাবতই এই দ্বিমুখী আচরণ করে।

অন্য দিকে, জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থ রাষ্ট্রের কাছে আমানতস্বরূপ। কিন্তু সেই আমানত কতটা নিরাপদ থাকছে, সে প্রশ্ন বারবারই বিবেককে নাড়া দেয়। অর্থনীতিবিষয়ক একটি শ্বেতপত্র জানাচ্ছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠন ও পাচার হয়েছে। বার্ষিক গড়ে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এই চিত্র মেলান আমাদের বার্ষিক বাজেট ঘাটতির সাথে, যা দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, যতটুকু ঘাটতি পূরণে ঋণ নিতে হচ্ছে, প্রায় ততটুকুই প্রতি বছর দুর্নীতি ও পাচারের মাধ্যমে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ যেন ছিদ্র বন্ধ না করে প্রতি বছর পাত্র ভরার চেষ্টা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-তে মাত্র ২৪, অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫০তম। গত কয়েক বছরে স্কোর ২৪-২৬-এর মধ্যেই থেকেছে বরাবর, যা বাংলাদেশকে দুঃখজনকভাবে বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই চিত্র দেখিয়ে দেয় যে রাজস্ব বাড়ানোর চেয়েও জরুরি হলো যা আদায় হচ্ছে তার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা। বড় বাজেট আর দুর্বল শাসনব্যবস্থা একসাথে চললে ফলাফল কখনো ভালো হয় না।

এই তিনটি সমস্যার বিপরীতে ইসলামী অর্থনীতি একটি শক্তিশালী নৈতিক আহ্বানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আর্থিক উপকরণও সরবরাহ করে, যেগুলো অন্য দেশে পরীক্ষিত এবং কার্যকর প্রমাণিত।

প্রথমেই আসে সুকুকের কথা। সুকুক হলো বন্ডের শরিয়াহসম্মত বিকল্প, যা প্রকৃত সম্পদের সাথে যুক্ত এবং সুদমুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম সার্বভৌম সুকুক ইস্যুতে প্রায় চার গুণ এবং সাম্প্রতিক একটি ইস্যুতে প্রায় ১২ গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। এই বিপুল অতিরিক্ত চাহিদা স্পষ্ট প্রমাণ করে, মানুষ হালাল বিনিয়োগের সুযোগ চায়, অথচ রাষ্ট্র এখনো তা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারেনি। তবে এখানে একটি সৎ স্বীকারোক্তি জরুরি : আমাদের বর্তমান সুকুকগুলোর অধিকাংশই প্রকৃত অর্থে সম্পদ-নির্ভর (ধংংবঃ-নধপশবফ) নয়; বরং সম্পদের কেবল ব্যবহারস্বত্বের ওপর দাঁড়ানো ধংংবঃ-নধংবফ কাঠামো-যা অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রে প্রচলিত ঋণের কাছাকাছি থেকে যায়। প্রকৃত ঝুঁকি ও মুনাফা-ভাগাভাগির নীতির ওপর সুকুককে দাঁড় করাতে না পারলে এটি কেবল নামেই বিকল্প হয়ে থাকবে। তাই পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি কাঠামোগত শুদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে জমে থাকা বিপুল অলস তারল্য সুকুকের মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে লাগানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, জাকাতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, সঠিক কাঠামো গড়তে পারলে বাংলাদেশে জাকাত থেকে জিডিপির ২.৩ থেকে ৩.৮ শতাংশ পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব। এই অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরাসরি কাজে লাগলে সরকারকে সেই পরিমাণ ঋণ কম নিতে হবে। মালয়েশিয়ায় জাকাতদাতারা আয়কর ছাড় পান, ফলে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত আদায় সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তৃতীয়ত, ওয়াক্ফ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্থায়ী ওয়াক্ফ সম্পদ গড়ে উঠলে প্রতি বছর এই খাতে ঋণ করার প্রয়োজন কমে আসবে। ইন্দোনেশিয়া ক্যাশ ওয়াক্ফ-লিংকড সুকুকের মাধ্যমে এই ধারণার বাস্তব রূপ দিয়েছে, যেখানে নাগরিকরা ওয়াক্ফে অর্থ রাখেন এবং সেই অর্থ সুকুকে বিনিয়োগ হয়ে সামাজিক প্রকল্পে ফিরে আসে।

চতুর্থত, রাজস্ব কাঠামোতে পরিবর্তন আনা দরকার। ভ্যাটের ভার ধীরে ধীরে কমিয়ে সম্পদ ও আয়করের অনুপাত বাড়াতে হবে। যাদের সামর্থ্য বেশি, তারা বেশি কর দেবেন। এটি ইসলামী ইনসাফের দাবি, একই সাথে আধুনিক প্রগতিশীল করনীতিরও।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ নানা মুসলিম দেশ এই পথগুলো বাস্তবে ব্যবহার করছে এবং ফলাফল পাচ্ছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে এগুলোর সামাজিক চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে।

আমরা সরকারের কাছে চারটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রত্যাশা করি। প্রথমত, আগামী দুই বছরের মধ্যে সার্বভৌম সুকুকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হোক এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোসহ সব কিছু সুকুকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অর্থায়ন করা হোক। পাশাপাশি সরকারি সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ঋণপত্র সুদমুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন জাতীয় জাকাত কর্তৃপক্ষ গঠন করা হোক, যেখানে জাকাত ও করের সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল জাকাত পেমেন্ট ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। তৃতীয়ত, ওয়াক্ফ প্রশাসনের সংস্কার করে একটি আধুনিক ও সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হোক। চতুর্থত, রাজস্ব কাঠামোতে ক্রমান্বয়ে পরোক্ষ কর কমিয়ে আনার রূপরেখা প্রণয়ন করা।

রাতারাতি সব বদলে যাবে না। কিন্তু সঠিক অভিমুখে যাত্রা শুরু করা এখনই সম্ভব। যে বাজেট সুদের চক্রে আবদ্ধ, যে রাজস্বব্যবস্থা দুর্বলের কাঁধে সবচেয়ে ভারী বোঝা চাপায় এবং যে শাসনব্যবস্থা জনগণের আমানত রক্ষা করতে পারে না-সেই অবস্থা থেকে ইনসাফের বাজেটের দিকে অগ্রসর হওয়া কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি অর্থনৈতিক দূরদর্শিতারও দাবি।

লেখক : শরিয়াহ উপদেষ্টা ও ইসলামিক ফিন্যান্স বিশেষজ্ঞ; প্রতিষ্ঠাতা, আদল অ্যাডভাইজরি (মালয়েশিয়া)

প্রফেসর মোহাম্মদ কবির হাসান। ইসলামী অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, ফিন্যান্স বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অর্লিয়ানস (যুক্তরাষ্ট্র)