বৈদেশিক আয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সময়

বাস্তবতা হলো- যে দেশ বৈদেশিক আয়ের উৎসকে যত বেশি বৈচিত্র্যময় করতে পেরেছে, সেই দেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট তত ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের সামনেও আজ সেই সুযোগ হাজির। রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং বহুমাত্রিক বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়ন। এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের আগামী দিনের প্রধান অগ্রাধিকার।

মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
দেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সংবাদগুলোর একটি প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য, সদ্য সমাপ্ত মে মাসে দেশে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, টানা ছয় মাস ধরে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে প্রবাহিত হয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক।

দেশ যখন বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট, আমদানি ব্যয়ের চাপ, ঋণ পরিশোধের দায় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তখন প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা এবং বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রেমিট্যান্সের অবদান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, বাংলাদেশ কী কেবল রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণ করতে পারবে? উত্তর, না। রেমিট্যান্স অবশ্যই অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলোর একটি; কিন্তু টেকসই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বৈদেশিক আয়ের উৎসগুলো বহুমুখীকরণ করতে হবে। রফতানি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন, জাহাজ নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন খাতে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর বেশ সুযোগ আছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস এখনো তৈরী পোশাক শিল্প। দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। কিন্তু একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ববাজারে মন্দা, ক্রেতাদের চাহিদা হ্রাস বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ে। ফলে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ববাজারে আমাদের ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে শতাধিক দেশে বাংলাদেশী ওষুধ রফতানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আগামী দশকে ওষুধ শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের জেনেরিক ওষুধ সরবরাহে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতও বৈদেশিক আয়ের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) এবং ডিজিটাল সেবা রফতানির মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। কিন্তু এ খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। উন্নত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিকমানের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে তথ্যপ্রযুক্তি খাত আগামী কয়েক বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক আয় নিশ্চিত করতে পারে।

কৃষি খাতেও আছে বিপুল সম্ভাবনা। বাংলাদেশের ফলমূল, সবজি, মসলা, মাছ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার ক্রমে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে দেশীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রফতানি অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কৃষিপণ্য রফতানি থেকে বৈদেশিক আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।

মৎস্য খাত বিশেষ করে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারেও বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমা দেশের জন্য এক অনন্য সম্পদ। সামুদ্রিক মাছ আহরণ, গভীর সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম, সামুদ্রিক খনিজসম্পদ অনুসন্ধান এবং উপকূলভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে নীল অর্থনীতিকে বৈদেশিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ আজ ব্লু-ইকোনমিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসাবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও এই সুযোগ নিতে আর বিলম্ব করতে পারে না।

পর্যটন খাতের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বনভূমি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ধর্মীয় পর্যটনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অফুরান। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে পর্যটন খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

জাহাজ নির্মাণ শিল্পও আমাদের একটি উদীয়মান সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জাহাজ রফতানি করে আন্তর্জাতিক বাজারে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। দক্ষ জনশক্তি, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই খাত আরো প্রসারিত করা যায়।

প্রবাসী আয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- দক্ষ মানবসম্পদ রফতানি। বর্তমানে বিদেশগামী শ্রমিকদের বড় অংশ অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। ফলে তারা তুলনামূলক কম মজুরির শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ থাকেন। অথচ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, কানাডা এবং ইউরোপের দেশে দেশে দক্ষ কারিগরি কর্মী, নার্স, কেয়ারগিভার, প্রকৌশলী এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক চাহিদা আছে। জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের প্রবেশ নিশ্চিত করা গেলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।

একই সাথে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেল সহজ, দ্রুত ও কম খরচে পরিচালনার ব্যবস্থা করা গেলে আরো বেশি প্রবাসী বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হবেন। ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবার সম্প্রসারণ এবং প্রণোদনা কার্যক্রম অব্যাহত রাখাও জরুরি।

বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক আয় বাড়াতে বিনিয়োগ একটি শক্তিশালী মাধ্যম। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থাকলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। কারণ আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। সেই সাথে শিল্পায়ন, জ্বালানি আমদানি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে। ফলে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন বৈদেশিক আয়ের উৎস তৈরি করা অপরিহার্য।

প্রবাসী আয়ের সাম্প্রতিক রেকর্ড প্রবাহ আমাদের অর্থনীতিতে অবশ্যই আশার বার্তা। দেশের লাখো প্রবাসী কর্মীর কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই অর্জন আরো বিস্তৃত অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রফতানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি রফতানি, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প, নীল অর্থনীতি, পর্যটন, জাহাজ নির্মাণ এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা।

বাস্তবতা হলো- যে দেশ বৈদেশিক আয়ের উৎসকে যত বেশি বৈচিত্র্যময় করতে পেরেছে, সেই দেশ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট তত ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের সামনেও আজ সেই সুযোগ হাজির। রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং বহুমাত্রিক বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়ন। এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের আগামী দিনের প্রধান অগ্রাধিকার। তাহলে রেমিট্যান্সের বর্তমান সাফল্য একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করবে, আশা করা যায়।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক

[email protected]