নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিরা
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেয়ার (পুশইন) ধারাবাহিক অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত কয়েক দিন ধরে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৮ থেকে ১০টি পৃথক সীমান্ত পয়েন্টে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও অনমনীয় অবস্থানের মুখে বিএসএফের এসব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে ভারতের অভ্যন্তর থেকে বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশে পুশইনের এই হিড়িক দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
লালমনিরহাটে ৩৩ জনকে ফেরত নিতে বাধ্য হলো বিএসএফ : লালমনিরহাটের তিনটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নারী-পুরুষসহ মোট ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার বিএসএফের বড় একটি প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজিবি। শুক্রবার ভোরে হাতীবান্ধার বড়খাতা সীমান্তে ১১ জন, পাটগ্রামের পঁয়ষট্টিবাড়ী সীমান্তে ১০ জন এবং আদিতমারীর দিঘলটারি-দুর্গাপুর সীমান্তে ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করে বিজিবি।
১৫ ও ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের তীব্র প্রতিরোধ ব্যুহ এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধার মুখে অনুপ্রবেশকারীরা দিনভর শূন্যরেখায় আটকে থাকে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকালের মধ্যে বিভিন্ন দফায় ভারতের ১৫৭ এবং ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন তাদের নিজ নিজ নাগরিকদের পিকআপ ভ্যানে তুলে ভারতীয় ভূখণ্ডের আরো ভেতরের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
হিলি সীমান্তে গভীর রাতে পুশইনের চেষ্টা নস্যাৎ : সর্বশেষ আজ শনিবার (৬ জুন) ভোর সাড়ে ৩টার দিকে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের ঘাসুড়িয়া এলাকায় পাঁচজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। জয়পুরহাট-২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল লতিফুল বারী জানান, বিজিবির নৈশকালীন বিশেষ টহল দলের তৎপরতায় তাৎক্ষণিকভাবে এই অনুপ্রবেশ রুখে দেয়া হয়। বর্তমানে হিলি সীমান্তের অরক্ষিত পকেটগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে উত্তেজনা, পতাকা বৈঠক নিষ্ফল
নওগাঁর সাপাহারের হাঁপানিয়া ও করমডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৭ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন শূন্যরেখায় অবস্থান নিয়ে বিএসএফকে বাধা দিলে সেখানে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই বিষয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বিএসএফের একগুঁয়েমির কারণে কোনো সুরাহা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।
অনুরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বাংগাবাড়ী ও বিভীষণ সীমান্তে। সেখানে বিএসএফ কর্তৃক পুশইন করা প্রায় ২৮ জন মানুষ এখনো নো ম্যানস ল্যান্ডে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যাদের ফিরিয়ে নিতে বিএসএফ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ৫৯ (মহানন্দা) বিজিবির কড়া পাহারার কারণে তারা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ ও যশোর সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাষা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া বড়বাড়ি সীমান্তে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা প্রতিহত করেছে ৫৬ বিজিবি (নীলফামারী ব্যাটালিয়ন)। কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশী দাবি করলেও কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারায় বিজিবি তাদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
এ ছাড়া ঝিনাইদহের মহেশপুর (৫৮ বিজিবি) আওতাধীন যাদবপুর সীমান্ত এবং যশোরের বেনাপোলের সাদিপুর, গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত দিয়ে পৃথক পৃথক দলবদ্ধ পুশইনের চেষ্টা ২১ বিজিবির কঠোর বাধায় পণ্ড হয়ে যায়।
সিলেট ও নেত্রকোনা সীমান্তে বিজিবির কড়া অবস্থান
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট (৪৮ বিজিবি) সীমান্তের উৎমাছড়া এলাকায় সন্দেহভাজন দুই ভারতীয় নাগরিককে আটক করে বিজিবি। পরে আইনি প্রক্রিয়া ও ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে তাদের আবার ভারতে পুশব্যাক করা হয়। অন্য দিকে নেত্রকোনা (৩১ বিজিবি) সীমান্তের কচুগাড়া ও লেঙ্গুরা বিওপির বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানা এলাকায় ১৫-২০ জন মানুষকে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করার খবর পেয়ে বিজিবি ওই অঞ্চলের কাঁটাতারবিহীন অংশে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।
পঞ্চগড়ে রোদ-বৃষ্টিতে নারী নারী শিশুসহ ১০ জন
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইনের ঘটনায় উভয় পক্ষ কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছায় দ্বিতীয় দিনের মতো ভেস্তে গেছে পতাকা বৈঠক। জেলা সদরের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি এলাকার ভারতীয় শূন্যরেখার জমির আইলেই এখনো অবস্থান করছে তিন শিশু, দুই নারীসহ ১০ জন। দিনের প্রখর রোদ, আর রাতে বৃষ্টির পানিতে ভিজে অমানবিকভাবেই তারা পড়ে রয়েছে শূন্যরেখায়।
বিজিবি ও সীমান্তের লোকজন জানান, বৃহস্পতিবার ভোর রাতে পঞ্চগড় উপজেলা সদরের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৫৮ এর ৫ নম্বর সাব পিলার এলাকা দিয়ে ওই ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। ওইদিনই সীমান্তের উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে কয়েক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সুরাহ হয়নি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৬ ঘণ্টা ধরে নারী ও শিশুদের নিয়ে দুই পরিবারের ১০ জন খোলা আকাশের নিচে অমানবিক অবস্থান করছেন। রাতে বৃষ্টি আর প্রচণ্ড বজ্রপাতের সময়েও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাদা-পানির মধ্যেই শুয়ে বসে ছিলেন। কোনো দেশের পক্ষ থেকে তাদের খাবার ও পানির ব্যবস্থাও করা হয়নি। বিএসএফের এমন নির্মম ও অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ সীমান্তের বাংলাদেশ প্রান্তের লোকজন।
সিলেট বিজিবি-এলাকাবাসী একাট্টা
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেট সীমান্তে -বিএসএফের পুশইন ঠেকাতে এলাকাবাসী ও বিজিবি একাট্টা হয়েছে। এর সুফলও মিলছে। এবার পুশইন ঠেকাতে গভীর রাতে সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিশেষ সতর্কতামূলক মাইকিং করেছে বিজিবি।
এক দিন আগে সিলেটের উৎমা সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ বাংলাদেশে লোকজন পুশইনের চেষ্টা করলেও এলাকাবাসী ও বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই তা প্রতিহত হয়েছে।
শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে সম্ভাব্য পুশইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সিলেট ৪৮ বিজিবি গোয়াইনঘাট সীমান্ত এলাকায় এ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
রংপুর ব্যুরো জানায়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের চারজেলায় তিন দিনে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৮৮ জন জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে। বিজিবি এবং স্থানীয়দের বাধার মুখে তা পণ্ড হলে এসব ব্যক্তি এখন নো ম্যান্স ল্যান্ড বা শূন্য রেখায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ দিকে বিজিবির প্রবল প্রতিরোধেমুখে এরই মধ্যে ৩৩ জনকে শূন্যরেখা থেকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতঙ্কের সাথে উত্তেজনা ছড়িয়েছে সীমান্তে। তবে বিজিবির কড়া অবস্থানে খুশি এলাকাবাসী।
১০ নারী-পুরুষকে শূন্যরেখা থেকে ফেরত নিয়েছে বিএসএফ
পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) সংবাদদাতা জানান, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে অবশেষে বিজিবি ও এলাকাবাসীর কঠোর অবস্থানের মুখে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী-বিএসএফ বাংলাদেশে পুশইন করতে সীমান্তের শূন্যরেখায় নিয়ে আসা ১০ ভারতীয়কে গতকাল ভোরে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার রাতের কোনো এক সময়ে ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পানিশালা মহানদী ক্যাম্পের সদস্যরা উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের বাবুল কামাত সীমান্তের ৮৪৬-এর ১/২ এস পিলারের কাছে দিয়ে ১০ ভারতীয়কে বাংলাদেশে পুশইনের জন্য শূন্যরেখায় জড়ো করে। বিষয়টি টের পেয়ে ৬৫ বাড়ি বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেই অপচেষ্টা রুখে দেয়। ওই গ্রুপে পুরুষের পাশাপাশি যুবতী নারী ও শিশুও রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হতভাগ্য ওই ভারতীয়রা সারারাত ভারতীয় অংশে সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে অমানবিকভাবে খোলা আকাশের নিচে ঝড় বৃষ্টিতে পড়ে ছিল। আর তার পাশেই বিএসএফ ঘরের ভেতরে তাদের পাহারায় নিয়োজিত ছিল। পরে বিজিবি ও এলাকাবাসীর শক্ত প্রতিরোধে শনিবার ভোরে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে গেছে। এর আগে শুক্রবার দিনভর বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার নানা প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু বাংলাদেশীদের প্রতিরোধের মুখে তারা ব্যর্থ হয়। বিএসএফের এই অপতৎপরতা রুখে দিতে শুক্রবার রাতভর বিজিবির পাশাপাশি এলাকাবাসীও লাঠি হাতে পাহারায় ছিল।
চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজিপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাংলা ভাষাভাষী নারী, পুরুষ ও শিশুদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ পরিচয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা চলছে।
এ বাস্তবতায় গতকাল চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্তে টহল জোরদারের পাশাপাশি যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সেই সাথে সীমান্তবর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, ‘সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পারাপার প্রতিরোধে বিজিবির নিয়মিত অভিযান ও টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তের সার্বিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
দিনাজপুর সীমান্তে ১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুর ৪২ বিজিবির মশালগাঁও বিওপির (হরিপুর উপজেলা, ঠাকুরগাঁও জেলা) দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় গতকাল ভোররাতে বিএসএফের বাংলাদেশে ১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিজিবি প্রতিহত করেছে। ওই ১১ জনের মধ্যে তিনজন পুরুষ, চারজন নারী ও চারজন শিশু। বর্তমানে তারা ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছে। বিজিবি সতর্ক অবস্থায় আছে।
এ দিকে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও সীমান্তে সম্ভাব্য পুশইন প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানোসহ স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করছে বিজিবি।
হিলি সীমান্তে ৫ ভারতীয়কে পুশইনের চেষ্টা
হিলি (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের হিলির পাঁচ ভারতীয়কে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। গতকাল ভোর রাত সাড়ে ৩টায় ঘাসুড়িয়া সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে রুখে দেয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে জয়পুরহাট-২০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল লতিফুল বারী জানান, ভারত থেকে অবৈধ পথে কোনো মানুষ যেন হিলি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে সেই লক্ষ্যে বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়াও অরক্ষিত সীমান্তে গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি বিজিবির নজরদারি করছে। এখন পর্যন্ত সীমন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
কি বলছেন রণধীর জয়সওয়াল
গত শুক্রবার (৫ জুন) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতে কোনো বিদেশী নাগরিক অবৈধভাবে অবস্থান করলে, তিনি বাংলাদেশি বা অন্য কোনো দেশের নাগরিক হোন, ভারতীয় আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য তথ্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এ ধরনের অনেক আবেদন এখনো বাংলাদেশের কাছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদন দ্রুত যাচাই ও নিষ্পত্তি করা হলে ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো সহজ ও কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ কোনো ধরনের অবৈধ পুশইন বা পুশব্যাকের পক্ষে নয়। এ কারণে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকে গুরুত্ব পাবে পুশইন
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা, অবৈধ পুশইনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিজিবি সদর দফতরের উপপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, এবারের সম্মেলনে আমরা পুশইন এবং সীমান্ত হত্যাকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা করব। সেই প্রস্তুতি নিয়েই আমরা যাচ্ছি। পুশইন এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতেই হবে।
বিজিবি সদর দফতরের বিশেষ বার্তা
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ উল ইসলাম জানিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে বিএসএফের অন্তত ১০টি পুশইনের অপচেষ্টা সফলভাবে রুখে দেয়া হয়েছে। রংপুর সেক্টরসহ বিভিন্ন বিজিবি সদর দফতর থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, বৈধ আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া, আন্তর্জাতিক সীমান্ত বিধিমালা লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক লোক ঢোকানোর যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। যেকোনো উসকানিমূলক পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের সব ক’টি সীমান্তে বিজিবির অতিরিক্ত টহল এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে এই পুশইন ইস্যুটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তোলা হবে বলে জানা গেছে। পুশইনের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অবস্থান ও বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এই বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো :
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বক্তব্য ও অবস্থান
বিজিবি পুশইনের এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের পরিপন্থী এবং দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করছে। তাদের প্রধান বক্তব্যগুলো হলো-
আন্তর্জাতিক নিয়মের লঙ্ঘন : বিজিবির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, বৈধ ও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া, সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন এলাকা বা ফেন্সিং গেট ব্যবহার করে জোরপূর্বক লোক ঠেলে দেয়ার এই চেষ্টা আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
পরিচয়ের প্রমাণহীনতা : বিজিবি বলছে, বিএসএফ যাদের বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করছে, তাদের বাংলাদেশী নাগরিকত্বের কোনো বৈধ প্রমাণ বা নথিপত্র ভারত কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারছে না।
সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জিরো টলারেন্স : বিজিবি সদর দপ্তর জানিয়েছে, সীমান্তে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বরদাশত করা হবে না। যেকোনো ধরনের পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে অতিরিক্ত টহল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বক্তব্য ও দাবি
বিএসএফ সাধারণত পুশইনের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করে না বরং বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। তাদের দাবি ও বক্তব্যগুলো হলো
‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ সনাক্তকরণ : বিএসএফের দাবি, তারা ভারতের অভ্যন্তরে (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম বা অন্যান্য রাজ্যে) বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে বসবাসকারী সন্দেহভাজন বাংলাভাষী লোকদের আটক করে। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এদের সীমান্ত পার করার প্রক্রিয়া নেয়া হয়।
বাংলাদেশী নাগরিক দাবি : বিএসএফের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, আটককৃত ব্যক্তিরা মূলত বাংলাদেশী নাগরিক, যারা কাজের সন্ধানে বা অন্য কোনো উপায়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল। তাই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
পতাকা বৈঠকে অনড় অবস্থান : বিজিবির সাথে বিভিন্ন কোম্পানি বা ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকে বিএসএফ অনেক সময় দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার কথা বললেও, মাঠপর্যায়ে পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা ব্যক্তিদের সহজে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে চায় না। বিএসএফ যেখানে এই মানুষদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে সীমান্ত পার করে দিতে চাইছে; বিজিবি সেখানে আইনি নথিপত্র ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া যেকোনো ধরনের পুশইনকে অবৈধ অনুপ্রবেশ হিসেবে গণ্য করে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করছে।



