যাদের পকেট ছিল না, পকেট নিয়ে তাদের চিন্তা করারও দরকার ছিল না। আগের দিনের মানুষের পকেট রাখার দরকার হতো না। তাদের ছিল গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু আর পুকুরভরা মাছ। আর যাদের এই প্রাচুর্যটুকুও ছিল না, তাদের জীবনে পকেটের অস্তিত্ব থাকারই তো কোনো কারণ নেই।
১৭৫৭ সালে যদি বাংলা, বিহার উড়িষ্যার মানুষদের পকেট থাকতো, তাহলে পলাশীর ইতিহাস ভিন্ন হতো। পকেট বাঁচানোর তাগিদে হলেও পলাশীর প্রান্তরে ছুটে যেতো সাধারণ মানুষ। তাদের পায়ে ওড়া ধূলায় উড়ে যেতো ইংরেজ বাহিনী। তখন সাধারণের পকেট ছিল না বলে রাজনীতি নিয়ে তাদের গরজ ছিল না। এতে দুইশো বছরের জন্য হারাতে হয় স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা ফেরত এসেছে। সাথে এসেছে পকেটের বাস্তবতা। এখন সবার সাথে পকেট থাকে; কিন্তু পকেটের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মানুষের পকেট খালি থাকবে না ভরা থাকবে, এগুলো নির্ভর করে অর্থনীতি নামের এক ‘জটিল’ বিষয়ের ওপর। আর এই বিষয়ের নিয়ন্ত্রণও কোন দেশের সরকারের ওপর এককভাবে থাকে না। বিশ্ব এখন একটা গ্রাম। আর বাংলাদেশ হলো সেই গ্রামের একটা পাড়া। গ্রামের অর্থনীতিতে সুনামি বয়ে গেলে কোনো পাড়া সেটা এড়াতে পারে না। তারপরও কোনো গ্রামের একটা পাড়া যদি চায়, তাহলে নিজেদের মতো করে চলা সম্ভব। এর জন্য পাড়ার লোকদের সচেতন হতে হয়। নেতাদের থাকতে হয় দূরদৃষ্টি।
একটা দেশের সরকারের দৃষ্টি কতো দূরে যেতে পারে, তা বোঝা যায় বাজেট থেকে। বাজেট সামনে এলেই পকেট নিয়ে হাহাকারে পরে মানুষ।
আজ শুরু হচ্ছে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। বাজেট উপস্থাপন হবে ১১ তারিখ। উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই (২০২৬-২৭ অর্থবছরের) বাজেটের আকার হতে পারে ৯.৩০ লাখ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর বাজেটের ফাইলে কী আছে, ইতোমধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে সেটা চূড়ান্ত নয়। বাজেট উপস্থাপনের পর তা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। তারপর অধিকাংশ সদস্যের মতের ভিত্তিতে পাস হয়। এর মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অর্থাৎ সরকারিদল যা চাইবে, সেটাই হবে। তাহলে বিরোধীদলের দরকার কী? দরকার আছে। সরকারিদল যা চাইছে, সেটার সমালোচনা করার জন্যই সংসদে বিরোধীদল। ভালোকে ভালো বলা, মন্দকে মন্দ বলা, উপায় বাতলে দেয়া। চাইলে যুক্তিসঙ্গত ও শক্ত অবস্থান নিয়ে বিরোধীদলও সরকারি দলের চাওয়া বদলে দিতে পারে।

সরকারিদল ও বিরোধীদল, দুই দলকেই জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছে জনগণ। তারা ভোট দিয়েছে, তাদের জন্য নীতি ঠিক করতে। তাদের পকেটের হেফাজত করতে। কিন্তু সংসদে গিয়ে সেইকথা মনে রাখেন কয়জন?
শেখ হাসিনার সময়ও সংসদ বসতো। কিন্তু সেই সংসদে যাওয়ার জন্য জনগণের ভোটের দরকার হতো না। এ কারণে জনগণের পকেট নিয়ে টানাটানি করতেও দ্বিধা হতো না তাদের। শেখ হাসিনা রেজিম ঋণ করে ঘি খেতে পছন্দ করতো। তবে সবাইকে সাথে নিয়ে খেতো না। সরকারে থাকা লোকজন ও তাদের একান্ত লোকেরা খেতো। আর ঘিয়ের মূল্য চুকাতে হতো মানুষকে। ‘বন্ধু’দেশকে খুশি রাখতে বিদ্যুৎ চুক্তির বাহানায় আদানির মাধ্যমে উপঢৌকন পাঠানো হতো। চুক্তিতে বাংলাদেশকে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেয়ার কথা আদানির। এর জন্য ২৫ বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশী টাকায় চল্লিশ বিলিয়ন ডলার মানে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকারও বেশি! চুক্তির একটা বড় অংশজুড়ে ছিল ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ নিলেও এই চার্জ দিতে হবে, না নিলেও দিতে হবে। অথচ এই পরিমাণ টাকায় বাংলাদেশের পানি আর খাবারের সঙ্কট দূর করা সম্ভব ছিল। এক হিসাবে বলা হয়েছে, এই টাকায় ‘পদ্মা-তিস্তা-যমুনা আন্তঃসংযুক্ত ব্যারাজ ও অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্প’ করে ফেলা যেতো। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও তিস্তা নদীর অববাহিকায় চার স্তরের ‘রিভার বেসিন গ্রিড’ তৈরি হতো। শুকনো মৌসুমে ব্যারাজের মাধ্যমে পানি ধরে রেখে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় নদীগুলোকে বাঁচানো যেতো। এতে সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা পেতো। কৃষিতে ঘটতে পারতো বিপ্লব।
এই প্রকল্প থেকে কেবল ব্যারাজভিত্তিক জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত! এতে বিদ্যুতের স্থায়ী অগ্রগতি হয়ে যেতো।
হাসিনা রেজিম পনেরো বছরে পনেরোটি বাজেট করেছিল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজেট পেশ করেছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। আকার ছিল মাত্র ১,১৩,৮১৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট উপস্থাপন করেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। আকার ছিল ৭,৬১,৭৮৫ কোটি টাকা। তাহলে পনেরো বছরে বাজেটের আকার বেড়ে দাঁড়ালো প্রায় আট গুণ। খালি চোখে মনে হতে পারে, এই পনেরো বছরে দেশের বিশাল উন্নতি হয়ে গেছে। কিন্তু তখন জুন মাস এলেই অদ্ভুত তামাশা চলতো। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেখা যেতো উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। মে আর জুন- এই দুই মাসে এসে শুরু হতো লুট। তড়িঘড়ি করে ভুয়া বিল-ভাউচার বানানো হতো। একেকটা বালিশ কেনা হতো পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায়। মানহীন ও অর্ধেক কাজ করে খাতা-কলমে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ দেখানো হতো। উন্নয়ন বাজেটের বেশিরভাগ, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ চলে যেতো ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ আর মেগা প্রজেক্টের পেছনে। সেখান থেকে লুটে-পুটে খেতো সুবিধাভোগী চাটুকাররা। প্রতিটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়ানো হতো বারবার। বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার রাস্তা এবং সেতু বানানোর খরচ ছিল কয়েক গুণ বেশি।
শেখ হাসিনা রেজিমের সৃষ্ট অর্থনীতির ধস অনেকটাই রোধ করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারপর এসেছে নির্বাচিত সরকার। এই সরকারের দায়িত্ব, সেই অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করা। মানুষের পকেটে যেন টান না পড়ে সেই চেষ্টা করা। এর জন্য অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সরকার এখন বাস্তবায়নযোগ্যতা ও ব্যয় সঙ্কোচনের কথা বলছে। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ইঙ্গিত আছে। কিন্তু বাজেটের অর্থায়নের বড় অংশই নির্ভর করবে নানা পরোক্ষ করের ওপর। বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর ও ভ্যাটের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে শুধু ভ্যাট থেকেই ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা আছে। এই টাকাগুলো আদায় করা হবে মানুষের পকেট থেকে।
মানুষ তো এমনিতেই পকেট নিয়ে হাঁসফাঁস করছে। চাল, ডাল, তেল, নুন কিনতেই মধ্যবিত্তের আয়ের পুরোটা শেষ হয়ে যায়। তার ওপর বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। আবার যদি ট্যাক্স ভ্যাটের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়, সেটা কতোটা নেয়া সম্ভব হবে? একজন রিকশাচালক এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে নিলে যে টাকা ভ্যাট দিতে হয়, একজন কোটিপতিকেও দিতে হয় সেই টাকা। এই পরোক্ষ করনীতি বৈষম্য বাড়ায়। মানুষের এখন বাড়তি এক টাকা দেয়ারও সামর্থ্য নেই। আবার ভিক্ষার চাল নিয়ে নিজেদের কাঁধে ঝামেলা নিতে চায় না তারা। ভিক্ষার চালের কিছু অংশ কাড়া থাকে, কিছু অংশ থাকে আকাড়া। ভিক্ষুককে শত শত দরজার সামনে গিয়ে ভিক্ষা চাইতে হয়।
আমাদের বাজেটের ঘাটতি পূরণে হাত পাতা হয় আন্তর্জাতিক নানা উৎসের কাছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, কিংবা বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ঋণ নিতে হয়। ঋণ নেয়ায় সমস্যা নেই। কিন্তু এই ঋণগুলো আসে নানা কঠিন শর্তে। দাতা সংস্থাগুলো মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর শর্ত বেঁধে দেয়। বলে ভর্তুকি কমাতে হবে, বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে।
আমাদের অভাবের সংসার, এটা ঠিক। অভাব থাকলে টুকটাক হাত পাততে হয়। কিন্তু অভাবে স্বভাব নষ্ট যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোনো পরিবারের বাবা যদি আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করেন। তাহলে তার সন্তানরা মনে করতে পারে- বাবার অনেক টাকা আছে! সে হিসাবে সন্তানরাও বেহিসেবি খরচ করা শুরু করে। পরে ঋণের দায়ে ঘরবাড়ি নিলাম হয়ে যায়। ইংরেজিতে বলা হয়, ‘কাট ইউর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইউর ক্লথ’ অর্থাৎ, তোমার কাপড় যতটুকু আছে, কোটটা ততটুকুই কাটো। কিন্তু আমাদের দেশে বছরের পর বছর ধরে কাপড়ের তোয়াক্কা না করে মস্ত বড় কোট কাটার ফ্যাশন চলছে।
এখন কাপড়ের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর দিকে মন দেয়া উচিত সরকারের। এক্ষেত্রে ‘বেগমপাড়া’য় পাচার হয়ে যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়। এতে ঘাটতি অনেকটা কমে আসবে। দেশের মানুষের কাঁধ থেকেও করের বাড়তি বোঝা নামানো সম্ভব হবে।
এবার কালো টাকা সাদা করার বড় সুযোগ রাখা হতে পারে। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হয়। একজন মানুষ সততার সাথে ব্যবসা করে, চাকরি করে সরকারকে নিয়মিত কর দেয়। আর অন্যজন কর ফাঁকি দিয়ে, দুর্নীতি করে, টাকা পাচার করে বেগমপাড়ায়। আর মাত্র কয়েক শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করে ফেলে সব টাকা! চোরকে যদি বলা হয়, তুমি চুরি করা সম্পদের একটা ছোট অংশ রাজকোষে জমা দিয়ে দেবে। তাহলে সমাজে চোরের সংখ্যা কমবে না বাড়বে, সেটা সাদামাটা বুদ্ধিতেই বোঝা যায়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



