DAC এর জনসভায় হামলা
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে উঠলে পিডিএমের সাথে আরও তিনটি দল যোগ দিয়ে Democratic Action Committee (DAC/ডাক) গঠন করে। যোগদানকারী ওই তিনটি দল হচ্ছে : জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও ওয়ালির খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। ডাক এরও কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নির্বাচিত হন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান।
৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ ডাক-এ যোগ দিলেও মাঠের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নেয়ার লক্ষ্যে তারা ডাক-এর আয়োজিত জনসভায়ও হামলা চালিয়ে ভণ্ডুল করে দেয়। মওদুদ আহমদ তার বইয়ে জনসভা ভণ্ডুল করা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘ডাক যখন উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, ছাত্রসমাজ অনেক দূর অবধি এগিয়ে গেছে, তারা তখন ১৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে ছাত্রদের এই জনপ্রিয়তায় শরিক হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ডাক সে দিন জনসভা অনুষ্ঠান করতে পারেনি। অতীতে বাঙালিদের স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী নুরুল আমিন ও ফরিদ আহমদের মতো ডানপন্থী নেতারা ছাত্রসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হননি। স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিবাদের মুখে তারা বক্তৃতামঞ্চে আরোহণ করে ভাষণ দানেও ব্যর্থ হন। অচিরেই ছাত্ররা মঞ্চ দখল করে নেন। ছাত্রনেতা তোফায়েল ১১ দফা না ৮ দফার প্রতি জনসমর্থন রয়েছে জিজ্ঞেস করলে সমবেত জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাত তুলে ১১ দফা কর্মসূচির পক্ষে রায় দেন। জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের জন্য এ ছিল এক মহাবিজয়ের সূচক।’(পৃষ্ঠা ১১৪-১১৫)
৭০-এর নির্বাচনী সমাবেশে হামলা
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নির্বাচনী মিটিং মিছিল পণ্ড করা সম্পর্কে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘পরের রোববার ১৮ জানুয়ারি ছিল জামায়াতে ইসলামীর জনসভা। আগেই ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপের একটি সিদ্ধান্ত ছিল, জামায়াতকে নির্বিঘ্নে সভা করতে দেয়া হবে না। সভা শুরু হলে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে গগনবিদারী সেøাগান উঠলÑ ‘জয় বাংলা’। জামায়াতের কর্মীরা সম্ভবত আগে থেকে আঁচ করেছিলেন, সভায় গোলমাল হতে পারে। তারা মঞ্চের নিচে অনেক লাঠিসোটা জমা করে রেখেছিলেন। প্রতিপক্ষও প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। এলোপাতাড়ি সেøাগান, চিৎকার ও হই-হুল্লোড়ে সভা পণ্ড হয়ে গেল।’ (পৃষ্ঠা-২৮)
জামায়াতে ইসলামীর (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের জীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনে যা দেখলাম’-এর তৃতীয় খণ্ডে ওই জনসভার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার লেখা থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের গুন্ডারা জনসভা পণ্ড করার জন্য প্রথমে ইটপাটকেল ছোড়ে এবং পরে পুলিশের সহায়তায় ময়দানের ভেতর প্রবেশ করে নেতাকর্মীদের মারধর করে। তাদের হামলায় জামায়াতের দুজন স্বেচ্ছাসেবক নিহত এবং বিপুলসংখ্যক আহত হয়।
মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য মতে, ‘পরের রোববার ২৫ জানুয়ারি ছিল পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) জনসভা। ছাত্রলীগের সিরাজ গ্রুপ আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নুরুল আমিনকে সভা করতে দেয়া হবে না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে দায়ী করা হতো। এ জন্য তার ওপর মানুষের প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা ছিল। নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু হতে না-হতেই ‘জয় বাংলা’ সেøাগানে পল্টন ময়দান প্রকম্পিত হলো। কেউ কেউ শেখ মুজিবের ছবিসহ ক্যালেন্ডার নিয়ে মঞ্চে উঠে পড়লেন। পুরো পরিবেশটাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল। একপর্যায়ে পিডিপির নেতারা মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন।’ (পৃষ্ঠা ২৮-২৯)
রাজনীতির রহস্যপুরুষ হিসেবে পরিচিত সিরাজুল আলম খানের সহযোগী ও স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের অন্যতম শীর্ষনেতা কাজী আরেফ আহমেদ তার বই ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’-এ জামায়াতের ওই জনসভা পণ্ড করা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘এ ছাড়া দুই অংশের ঐক্যের ওপর জোর সৃষ্টিকারী যেকোনো অনুভূতিশীল পদক্ষেপের ওপর আওয়ামী লীগ আঘাত হানতে শুরু করল। জামায়াতে ইসলামীর ১৮ জানুয়ারির জনসভাকে পণ্ড করা হয়েছিল। কেননা ওই সভাতে দুই অংশের বন্ধনের প্রশ্নে ইসলামী ঐক্যের ওপর জোর দেয়া হয়েছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাকি সময়টুকুতেও আওয়ামী লীগ তার এই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটাল। দলটি একইভাবে পয়লা ফেব্রুয়ারিতে পিডিপির ঢাকার জনসভা, ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের জনসভা ও সৈয়দপুরে ৭ মার্চের জনসভা পণ্ড করে দিলো। কুমিল্লায় ১০ মার্চের কনভেনশন মুসলিম লীগের সভা, বরিশালের ১৫ মার্চ এবং ঢাকার ১২ মার্চের জনসভা নষ্ট করে দেয়া হলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপ কর্তৃক আয়োজিত আরো কয়েকটি জনসভা পণ্ড করে দেয়া হলো। এ কাজগুলো ‘নিউক্লিয়াস’ ও ‘বিএলএফ’-এর সদস্যরাই ঘটাল।’ (পৃষ্ঠা-৮৩)
ছাত্র হত্যার রাজনীতি
পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’টি ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটে। একটিতে নিহত হন জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সাইদুর রহমান পাসপার্তু এবং অপরটিতে ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেক। দু’টি ঘটনার সাথেই আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ জড়িত ছিল। একসময়কার ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ তার ‘আমার জীবন আমার সংগ্রাম’ বইয়ে পাসপার্তু নিহত হওয়ার সম্পর্কে লিখেছেন, উনিশ শ’ আটষট্টির অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ের একটি অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু স্বস্তিদায়ক ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ছিল, এনএসএফের পান্ডাদের একজন সাইদুর রহমান ওরফে পাসপার্তুসহ নেসারউদ্দীন, আবদুল আলীম সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছুরিকাহত হয়। তিন দিন পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাইদুর রহমান পাসপার্তুর মৃত্যু হয়। তার লেখা থেকে জানা যায়, হাতিরপুল-কেন্দ্রিক একটি গ্রুপের ছুরিকাঘাতেই পাসপার্তু নিহত হয়। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ হাতিরপুল গ্রুপের পরিচয় গোপন রাখলেও কাজী আরেফের ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বই থেকে জানা যায়, কামরুল আলম খান খসরু ও মোস্তফা মহসীন মন্টুর নেতৃত্বে ওই গ্রুপটি গড়ে উঠেছিল। এখানে উল্লেখ্য খোকা ও পাসপার্তুর নেতৃত্বে এনএসএফের একটি গ্রুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালালেও তাদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র নিহত হয়নি।
১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটলে দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। ইয়াহিয়া খান দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল নুর খান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। পাকিস্তানের শিক্ষানীতি কী হবে সে বিষয়ে ১২ আগস্ট টিএসসিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ইসলামী ছাত্র সঙ্ঘের সাথে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্ঘাত বাধে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ইসলামী ছাত্র সঙ্ঘের নেতা আব্দুল মালেককে ধাওয়া করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ১৫ আগস্ট মেধাবী ছাত্রনেতা আবদুল মালেক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
আদমজীতে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা
১৯৫৪ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পরই কেএসপির সাথে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় স্থান না দেয়ায় শেখ মুজিব তার অনুগত শ্রমিক নেতাদের দিয়ে এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজীতে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা লাগিয়ে দেন এবং তাতে প্রায় ৫০০ মানুষ নিহত হয়।
শেখ মুজিব তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আদমজীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করলেও আওয়ামী লীগেরই অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা খুলনার শেখ আবদুল আজিজ তার ‘রাজনীতির সেকাল ও একাল’ বইয়ে দাঙ্গার জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করে লিখেছেন, ‘অবশেষে হক সাহেব শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব এবং মওলানা ভাসানী সাহেবের সাথে পরামর্শ করে আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হন।
হক সাহেব যাদের প্রথম পর্যায়ে আওয়ামী লীগ থেকে মন্ত্রী করেছিলেন তাদের মধ্যে হলেন খান আতাউর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ, আব্দুস সালাম খান প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমানকে হক সাহেব মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না করায় তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে আদমজী জুট মিলে তার অনুগত শ্রমিকদের নিয়ে অবাঙালি শ্রমিকদের সাথে এক অপ্রীতিকর দাঙ্গা হাঙ্গামার সৃষ্টি করেছিলেন। যার ফলে আদমজীতে বেশ কিছু অবাঙালি শ্রমিক-কর্মচারীদের অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়। এ হৃদয়বিদারক অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা ফজলুল হক তার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন।’ (পৃষ্ঠা-২২৫)
স্পিকার শাহেদ আলী হত্যাকাণ্ড
১৯৫৮ সালের ২৩ জুন সংসদ কক্ষে মারামারির জেরে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীর মৃত্যুবরণের সাথে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই ঘটনার সাথে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ জোরেশোরে অস্বীকার করলেও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সহকারী আজিজুল হক শাহজাহানের এক লেখা থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য কোরবান আলী চেয়ারের একটি হাতল ভেঙে কেএসপি নেতা ইউসুফ আলী মোহন মিয়ার দিকে ছুড়ে মারলে মোহন মিয়া মাথা নিচু করে ফেলায় হাতলটি স্পিকার শাহেদ আলীর নাকে লাগে। গুরুতর আহত শাহেদ আলীকে পরবর্তীতে ঢাকা মেডিক্যালে নেয়া হয়। ২৬ জুন শাহেদ আলী মারা যান। পাকিস্তান আমলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনকার মতো এত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতপূর্ণ ছিল না। তার পরও আওয়ামী লীগ এতসব ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। এসব তথ্য বিবেচনায় নিলে যে কেউই ধারণা করতে পারবেন যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমলেই কতটুকু গণতন্ত্রমনা ছিল।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



