সমুদ্রে অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত গত এক দশকে এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দেশীয় গ্যাসের ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন, আমদানিনির্ভর এলএনজি অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা একসাথে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, বস্ত্রশিল্প, সিমেন্ট, সিরামিক, ইস্পাত- প্রায় সব শিল্প খাতই গ্যাসনির্ভর। অথচ দেশের বড় বড় স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্র- তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, কৈলাসটিলা, রশিদপুর- ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নতুন বড় আবিষ্কার না হওয়ায় উৎপাদন কমছে, আর সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

  • সম্ভাবনার বঙ্গোপসাগর
  • অনুসন্ধানে ধীরগতি
  • গ্যাস পাবে তো বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত গত এক দশকে এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দেশীয় গ্যাসের ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন, আমদানিনির্ভর এলএনজি অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা একসাথে রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শিল্পায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, বস্ত্রশিল্প, সিমেন্ট, সিরামিক, ইস্পাত- প্রায় সব শিল্প খাতই গ্যাসনির্ভর। অথচ দেশের বড় বড় স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্র- তিতাস, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ, কৈলাসটিলা, রশিদপুর- ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নতুন বড় আবিষ্কার না হওয়ায় উৎপাদন কমছে, আর সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে এলএনজি সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন করে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে- বাংলাদেশ কি তবে নিজের সমুদ্রবক্ষে লুকিয়ে থাকা অফশোর সম্পদ অনুসন্ধানে পিছিয়ে পড়েছে? সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বঙ্গোপসাগরে বড় কোনো নতুন অফশোর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে না আসার পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ভুল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগসঙ্কট এবং কার্যকর দূরদর্শিতার অভাব।

২০২২ সালের বৈশ্বিক জ্বালানিসঙ্কটের পর পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হয়। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেলে বাংলাদেশকে একাধিক কার্গো বাতিল করতে হয়। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কাতার থেকেও সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার ঘটনা দেশের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে- বাংলাদেশ কি তার নিজের সমুদ্রেই লুকিয়ে থাকা জ্বালানিসম্পদের যথাযথ অনুসন্ধান করেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বঙ্গোপসাগরের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান আবারো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনার কথা বহুদিন ধরে বলা হলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো নতুন বাণিজ্যিক অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উৎপাদনে আনতে পারেনি। কেন? কোথায় অগ্রগতি? কোথায় ব্যর্থতা? এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে? এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হয়েছে।

৫০ বছরের অফশোর যাত্রা ও ‘সাঙ্গু’ শিক্ষা

বাংলাদেশে অফশোর অনুসন্ধানের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭৪ সালে, যখন স্বাধীনতার পরপরই সরকার প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির (আইওসি) জন্য সমুদ্রের ব্লকগুলো উন্মুক্ত করে।

প্রথম পর্যায় (১৯৭৪-১৯৯০): শেল ও ইউনোক্যালের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা প্রাথমিক জরিপ করলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও তথ্যের অভাবে উল্লেখযোগ্য সফলতা পায়নি। সাঙ্গুর সাফল্য ও দ্রুত অবসান (১৯৯৬-২০১৪): ৯০-এর দশকে কেয়ার্ন এনার্জি বঙ্গোপসাগরে ‘সাঙ্গু’ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ১৯৯৬ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ভুল রিজার্ভ মূল্যায়নের কারণে ২০১৪ সালে এর উৎপাদন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। স্থবিরতার দশক (২০০০-২০১০): সাঙ্গু বন্ধ হওয়ার পর এবং স্থলভাগের গ্যাসের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়ায় অফশোর অনুসন্ধানে কার্যত এক দশকের স্থবিরতা দেখা দেয়।

ভূরাজনৈতিক বিজয়ে বিশাল সম্ভাবনা, কিন্তু স্থবির বাস্তবায়ন

বাংলাদেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে আন্তর্জাতিক সালিশের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর। দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধ থাকায় গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানকার্যক্রম কার্যত স্থবির ছিল। ২০১২ সালে সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল মিয়ানমারের সাথে বিরোধে বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয়, যার ফলে বঙ্গোপসাগরের একটি বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার ও সম্পদ অনুসন্ধানের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৪ সালে স্থায়ী সালিশি আদালত ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি করে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) আরো সম্প্রসারিত হয়।

এই দুই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে বাংলাদেশ প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাসসহ সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের পূর্ণ অধিকার লাভ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু ভূখণ্ডগত সাফল্য নয়, বরং দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা, সুনীল অর্থনীতি এবং সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগের সূচনা করে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পরই গভীর সমুদ্রের নতুন ব্লক ঘোষণা, আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির অংশগ্রহণ এবং আধুনিক সিসমিক জরিপের পথ উন্মুক্ত হয়। এ কারণেই নীতিনির্ধারকরা একে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ‘দ্বিতীয় গ্যাস যুগ’-এর ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেন।

আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?

বঙ্গোপসাগর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। মিয়ানমার বহু বছর ধরেই ইয়াদানা, শ্বে ও জাওটিকা গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন করছে এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশে গ্যাস রফতানির সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির সাথে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এবং রফতানিমুখী অবকাঠামো গড়ে তোলার ফলে দেশটি অফশোর সম্পদকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে।

অন্য দিকে ভারত কৃষ্ণা-গোদাবরী (কেজি) বেসিনে গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান ও উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ বিনিয়োগ, উন্নত সামুদ্রিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী সেবা শিল্প এবং বিস্তৃত পাইপলাইন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো ভারতের অফশোর খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান কূপের সংখ্যা সীমিত, নতুন কোনো বাণিজ্যিক অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উৎপাদনে আসেনি এবং গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো অনুসন্ধাননির্ভর পর্যায়েই রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত ধারাবাহিকতা, দ্রুত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করতে পারলেই কেবল বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

তথ্যসঙ্কট ও সিসমিক জরিপের বর্তমান চিত্র

অফশোর ড্রিলিংয়ের মূল শর্ত হলো সঠিক ভূতাত্ত্বিক ডাটা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেট্রোবাংলা ২ডি এবং ৩ডি সিসমিক জরিপে গতি আনলেও তা সামগ্রিক গভীর সমুদ্রের জন্য এখনো অপ্রতুল।

২ডি জরিপ: প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার ডাটা সংগৃহীত হয়েছে, যা প্রাথমিক ট্র্যাপ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। আর ৩ডি জরিপ: কয়েকটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনাময় ব্লকে উচ্চমানের ৩ডি জরিপ পরিচালিত হয়েছে, যা ড্রিলিং ঝুঁকি কমায়।

আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে পুরো সমুদ্রসীমার শতভাগ পূর্ণাঙ্গ ৩ডি কভারেজ দ্রুত শেষ করা আবশ্যক বলে মনে করছেন দেশের ভূতাত্ত্বিকরা।

অন্য দিকে মডেল পিএসসি (পিএসসি) সংশোধন ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) বা উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির কাঠামো। আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর মতে, আগের পিএসসিতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ ছিল তুলনামূলক কম এবং বৈশ্বিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পাশাপাশি অনুসন্ধান ও কূপখননে বিপুল বিনিয়োগের পর ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ সীমিত থাকায় প্রকল্পগুলো আর্থিকভাবে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়ত। এর সাথে যুক্ত ছিল বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি, দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, যা সম্ভাবনাময় ব্লক থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ থেকে নিরুৎসাহিত করেছিল।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিএসসি কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনে। সংশোধিত চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের জন্য কর-সুবিধা এবং দ্রুত অনুমোদনপ্রক্রিয়ার মতো ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তির শর্তাবলি আরো নমনীয় ও বিনিয়োগবান্ধব করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংস্কারের ফলে বাংলাদেশের অফশোর খাত আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এবং গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহ আবার বাড়তে শুরু করেছে। তবে এই আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে নীতিগত ধারাবাহিকতা, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘদিন ধরে সাড়া না পাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল অনুদার প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)। গ্যাসের আন্তর্জাতিক দামের সাথে মূল্য সমন্বয় না থাকা এবং ব্যয়নির্বাহের সীমাবদ্ধতার কারণে সুপারমেজর কোম্পানিগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

সম্প্রতি সরকার মডেল পিএসসি সংশোধন করে- ১. আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মূল্য কাঠামো, ২. ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ৩. কর মওকুফসহ দ্রুত অনুমোদনপ্রক্রিয়ার সুযোগ যুক্ত করেছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানিচাহিদা বিবেচনায় শেভরন, এক্সনমোবিলের মতো বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আবারো আগ্রহ দেখালেও চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আরো ডাটা নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা চাচ্ছে।

কেন সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলনে এত কোটি ডলারের হিসাব?

গভীর সমুদ্রে অফশোর অনুসন্ধান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

কাজের বিবরণ সম্ভাব্য আনুমানিক ব্যয় (মার্কিন ডলার)

একটি সিসমিক জরিপ (প্রতি ব্লক) ২০ - ৫০ মিলিয়ন ডলার

একটি অনুসন্ধান কূপ ড্রিলিং ৮০ - ১৫০ মিলিয়ন ডলার

একটি অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন ৩ - ৫ বিলিয়ন ডলার

২০০ কিমি সাবসি পাইপলাইন নির্মাণ ১ - ১.৫ বিলিয়ন ডলার

এই বিশাল অঙ্কের মূলধন জোগান দেয়া রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সের পক্ষে অসম্ভব। স্থলভাগে সাফল্য থাকলেও গভীর সমুদ্রে আধুনিক ড্রিলশিপ ও সাবসি ইঞ্জিনিয়ারিং অভিজ্ঞতার অভাবে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বই একমাত্র বাস্তবমুখী পথ।

সামুদ্রিক গ্যাসসম্পদের আনুমানিক পরিমাণ

বিভিন্ন ভূ-বিজ্ঞানী ও জ্বালানি সংস্থার মূল্যায়নে বঙ্গোপসাগরে গ্যাসের সম্ভাব্য সম্পদের হিসাব তুলে ধরা হলো:

নি¤œ অনুমান : ১০ থেকে ১৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)

মধ্যম অনুমান : ২০ থেকে ৩০ টিসিএফ

উচ্চ অনুমান : ৪০ টিসিএফ বা তার বেশি

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, যদি মাত্র ২০ টিসিএফ প্রমাণিত রিজার্ভ পাওয়া যায়, তবে তা দিয়ে পরবর্তী ২০-২৫ বছর বাংলাদেশের বেশির ভাগ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব, যা এলএনজি আমদানির বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার চাপ থেকে দেশকে চিরতরে মুক্ত করবে।

অফশোর গ্যাস আবিষ্কার বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্তই উন্মোচন করবে না, বরং এটি কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, রাজস্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও উৎস হতে পারে। তাই এই খাতকে ঘিরে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জন্য প্রথমেই প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) আলোচনায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে চুক্তির আর্থিক ও আইনি শর্তাবলি জনস্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। একই সাথে দেশীয় প্রকৌশল, নির্মাণ, লজিস্টিকস ও সেবা খাতকে যুক্ত করতে কার্যকর লোকাল কনটেন্ট নীতি প্রণয়ন জরুরি, যাতে বিদেশী বিনিয়োগের সুফল দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানে প্রতিফলিত হয়।

এ ছাড়া রয়্যালটি, মুনাফা এবং কর-রাজস্বের বণ্টন কাঠামোও সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্র ন্যায্য অর্থনৈতিক সুবিধা পায় এবং ভবিষ্যতে কোনো বিরোধের সৃষ্টি না হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ, যারা সম্ভাব্য পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের মুখোমুখি হবে, তাদের উন্নয়ন, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকায় বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও নীতিগতভাবে নিশ্চিত করা উচিত। অতীতে জ্বালানি খাতে চুক্তির স্বচ্ছতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে অফশোর গ্যাস উন্নয়নে জবাবদিহিতা, স্বাধীন তদারকি এবং আন্তর্জাতিক মানের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। কারণ, সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বঙ্গোপসাগরের গ্যাসসম্পদ শুধু জ্বালানি ঘাটতি দূর করবে না, বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা এবং গ্যাস উন্নয়নের সম্ভাব্য রোডম্যাপ

বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম স্পর্শকাতর সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম। অফশোর ড্রিলিং ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশ্বমানের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) নিশ্চিত না করলে সুন্দরবনসহ তটরেখার মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক প্রাণীবৈচিত্র্য চরম হুমকিতে পড়বে। পাশাপাশি সমুদ্রে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা স্থলভাগে নিয়ে আসার জন্য সাবসি পাইপলাইন, অনশোর প্রসেসিং প্ল্যান্ট ও জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো নির্মাণের পূর্বপ্রস্তুতি এখনই গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী এক দশকের বেশি সময়জুড়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুসরণ করতে পারলে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দেয়া সম্ভব।

স্বল্পমেয়াদে (১-৩ বছর) সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্ভাবনাময় অফশোর ব্লকগুলোতে পূর্ণাঙ্গ থ্রিডি (৩ডি) সিসমিক জরিপ সম্পন্ন করা এবং সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে উচ্চ সম্ভাবনাময় কাঠামো চিহ্নিত করা। একই সাথে সংশোধিত ও বিনিয়োগবান্ধব প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে হবে। এ সময়েই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুসন্ধান কূপ খনন শুরু করা জরুরি, কারণ প্রকৃত গ্যাস মজুদ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় হলো ড্রিলিং।

মধ্যমেয়াদে (৩-৭ বছর) অনুসন্ধানে সম্ভাব্য বড় আবিষ্কার হলে তার বাণিজ্যিক সক্ষমতা মূল্যায়ন, রিজার্ভ নিরূপণ এবং ক্ষেত্র উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি সমুদ্র থেকে স্থলভাগে গ্যাস পরিবহনের জন্য সাবসি পাইপলাইন, অনশোর প্রসেসিং সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর নকশা, অর্থায়ন ও নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে (৭-১৫ বছর) লক্ষ্য হবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে দেশীয় শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর ফলে সার, বিদ্যুৎ, ইস্পাত, সিমেন্ট ও রফতানিমুখী শিল্পের সম্প্রসারণে নতুন গতি আসতে পারে। যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় গ্যাস মজুদ আবিষ্কৃত হয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এলএনজি রফতানির সম্ভাবনাও বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পর্যবেক্ষণ : সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে

বাংলাদেশের অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান আজ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আশাবাদ ও বাস্তবতা পাশাপাশি চলছে। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দেশ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে। আধুনিক সিসমিক জরিপ সম্ভাবনার নতুন ইঙ্গিত দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানির আগ্রহও কিছুটা ফিরেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাস্তব উৎপাদনের পথে বড় কোনো অগ্রগতি আসেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব জ্বালানি বাজার নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে। আগামী দুই দশকের মধ্যে গ্যাসের বৈশ্বিক চাহিদা স্থিতিশীল বা কমতেও পারে। ফলে বাংলাদেশ যদি আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে বড় আবিষ্কার ও উন্নয়নপর্যায়ে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সম্ভাব্য সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই কমে যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় অফশোর অনুসন্ধানকে আর শুধু একটি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শিল্পায়নের ভবিষ্যতের সাথে জড়িত একটি কৌশলগত কর্মসূচি। সফল হলে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তের সূচনা; ব্যর্থ হলে দেশ আরো গভীর আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির ফাঁদে আটকে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ এখন সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে- যেখানে সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা গ্যাস শুধু একটি সম্পদ নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার সম্ভাব্য ভিত্তি।