বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। এর সাথে তাল মেলাতে দেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি জোরদার করার বিকল্প নেই। এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রযুক্তির এগিয়ে যাওয়া ও বাংলাদেশের কাঠামোগত বাস্তবতার কিছু দিক তুলে ধরেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য বার্তা দিয়েছেন। তার কথায় উঠে এসেছে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার বড় দুর্বলতাগুলো– কাঠামোগত জড়তা, পুরনো চিন্তাধারার আধিপত্য এবং পরিবর্তনের প্রতি অনীহা।
প্রধান উপদেষ্টা মন্তব্য করেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের পাঁচ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক না।’ এই মন্তব্য বিতর্ক উসকে দেয়ার মতো। কিন্তু এর গভীরে গেলে দেখা যাবে, এটি কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়। তিনি একটি দুর্বল ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। দীর্ঘ দিন একই কাঠামোর ভেতরে কাজ করতে করতে অনেক কর্মকর্তার চিন্তা স্থবির হয়ে যায়, এটা সত্য। প্রযুক্তি, সমাজ ও অর্থনীতি যেখানে প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে, সেখানে ৩০ বছর আগের অভিজ্ঞতা দিয়ে আজকের ডিজিটাল বাস্তবতা বোঝা প্রায় অসম্ভব। এটি ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; বরং ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
প্রধান উপদেষ্টা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আমাদের অনেক নীতি ও আইন এখনো ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার বহন করছে। ব্রিটিশ সময়ে তৈরি কাঠামোর ওপর খণ্ড খণ্ড সংস্কার চাপিয়ে আমরা আধুনিক রাষ্ট্র চালানোর স্বপ্ন দেখছি। এটি নিজেদের সাথে নিজেদের প্রতারণা। প্রযুক্তি যেখানে পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে, সেখানে রাষ্ট্র নিজেই যদি পুরনোকে আঁকড়ে রাখে, তাহলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। আর সেই দ্বন্দ্বে হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো এবং ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। এখানে স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও তরুণ উদ্ভাবকদের একসাথে হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দেখার বিষয়, এই উদ্ভাবনগুলো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে। প্রদর্শনী আর সেমিনারের গণ্ডি পেরিয়ে যদি নতুন ভাবনাগুলো নীতি ও প্রশাসনে জায়গা না পায়, তাহলে এমন আয়োজন কেবল উৎসবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা কঠোর মন্তব্য করেছেন জালিয়াতি ও অনৈতিকতা প্রসঙ্গে। ভিসা, পাসপোর্ট, সনদে জালিয়াতির অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মেধার ঘাটতি নেই; কিন্তু সেই মেধা ভুল পথে ব্যবহার হচ্ছে।’ এটি নৈতিকতা ও শাসনব্যবস্থার সমস্যা।
এই সমস্যাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে, প্রশাসনে নিয়মিত রোটেশন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময়ভিত্তিক নিয়োগ চালু করা যেতে পারে। নীতিনির্ধারণে তরুণ ও প্রযুক্তিবিদ প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সেবা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে ১০ বছর পরপর প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ধারণা বাস্তবায়নে পাইলট প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। এতে কাঠামোগত জড়তা ভাঙার সুযোগ তৈরি হবে। জালিয়াতি রোধে কেবল শাস্তি নয়, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের কিছু অংশ আমাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে; কিন্তু সেই অস্বস্তিই পরিবর্তনের প্রথম শর্ত। প্রযুক্তির যুগে টিকে থাকতে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে। না হলে আমরা সব বুঝেও পিছিয়ে থাকব। আর এর দায় আমাদেরই নিতে হবে।



