সদ্য বিদায়ী উপদেষ্টার বিতর্কিত বক্তব্য

স্থিতিশীলতার পরিপন্থী

দেশে অল্প কয়েকদিন হলো নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এ সময় রাজনীতিতে উত্তাপ কাম্য নয়। সরকারকে কিছু সময় পর্যবেক্ষণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। দেশবাসীর মতো আমাদেরও প্রত্যাশা, দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক।

নেপালে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। এরপর ছয় মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় নির্বাচন। জনমনে অভ্যুত্থানকালের চেতনা এখনো অটুট। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নির্বাচনের ফলে। অভ্যুত্থানের শক্তি জেন-জির নেতা বালেন্দ্র শাহের দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। প্রাচীনপন্থী সব দলের ঘটতে যাচ্ছে নিশ্চিত ভরাডুবি। এতে স্পষ্ট নেপালের নির্বাচনে জনমতের যথাযথ প্রকাশ ঘটেছে। তরুণ নেতৃত্ব জনগণের চাওয়া-পাওয়া কতটা পূরণ করতে পারবে সেটি পরের কথা; বড় কথা হলো, তাদের ৭৭ জনের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। জনগণ তাদের ভোট দিয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রতি আস্থা রেখেছে, সম্মান জানিয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের পরিবর্তনকামী মানুষ এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল তেমন সুবিধা করতে পারেনি। অথচ এ দেশে এক-দুশ’ নয়, দেড় হাজার মানুষের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে নতুন দেশ গড়ার যে বিরল সুযোগ তরুণরা তৈরি করেছিলেন, পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রাবল্যে তা বাস্তবে রূপ পায়নি। কায়েমি স্বার্থবাদীরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে দেয়নি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো– তরুণদের সাফল্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশ। বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী চেতনা তাজা থাকতে নির্বাচন হলে হয়তো নির্বাচনী ফলে তরুণরা ভালো করতে পারতেন। যেমনটা দেখা গেছে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলেও জনমতের প্রকৃত প্রতিফল হয়েছে কি না সে ব্যাপারে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী ফল কিভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে সেটি সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক একজন নারী উপদেষ্টার টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে। এ নিয়ে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। দু’জন উপদেষ্টাকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানানো হয়েছে সংসদের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে।

২০২৬ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টা জনগণের গণতান্ত্রিক অভিপ্রায় তথা নির্বাচনী রায়ে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছেন তা খতিয়ে দেখা উচিত। তবে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা অবশ্য সেই পুরনো রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে বলেছেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। দেশের কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে সদা তৎপর গণমাধ্যমের একটি অংশও যথারীতি ওই উপদেষ্টার পক্ষে সাফাই বয়ান তৈরির দায়িত্ব নিয়েছে। এতে প্রকৃত সত্য পাল্টে যাবে না।

এবারের কয়েকজন উপদেষ্টার প্রশ্নবিদ্ধ কার্যকলাপেরর ফল হবে সুদূরপ্রসারী। রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করে গেছে, দেশবাসী তার পক্ষে রায় দিয়েছে গণভোটে। কিন্তু জুলাই সনদ নিয়ে কোন গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে; সেটি জনগণের অজানা নয়। তারা সব দেখছেন, মনে রাখছেন। যেমন স্বৈরাচারের দীর্ঘ ১৫ বছরের অপকর্মে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছেন, প্রতিটি ঘটনা নীরবে মনে রেখেছেন নিজের স্মৃতিতে আর সেই ক্ষোভের মহাবিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন জুলাই বিপ্লবে।

দেশে অল্প কয়েকদিন হলো নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এ সময় রাজনীতিতে উত্তাপ কাম্য নয়। সরকারকে কিছু সময় পর্যবেক্ষণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। দেশবাসীর মতো আমাদেরও প্রত্যাশা, দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক।