ড. আর আই চৌধুরী : নীরব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

ড. আর আই চৌধুরীর জীবন আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে : রাষ্ট্রের প্রকৃত নির্মাতা কারা? যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেন, নাকি যারা দূর থেকে চিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করেন? তিনি হয়তো জাতীয়ভাবে আলোচিত হননি, কিন্তু তার চিন্তা, সততা এবং দূরদর্শিতা তাকে এক ‘নীরব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যারা আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও নেপথ্যে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন। ড. আর আই চৌধুরী তেমনি এক ব্যক্তিত্ব-ঢাকার বাইরে থেকেও যিনি রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তার জীবন ও চিন্তা কেবল একজন শিক্ষকের নয়; বরং একজন বিকল্প রাষ্ট্রদর্শনের ধারকের।

১৯২৮ সালে ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার গুথুমা চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন সোনারগাঁয়ে নবাব স্টেটের ম্যানেজার- অর্থাৎ পারিবারিকভাবে প্রশাসনিক পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। কিন্তু তার মানসিক গঠন তৈরি হয় ঢাকায়, যেখানে তিনি পড়াশোনা করেন। রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন।

জগন্নাথ কলেজে পড়াকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ছিলেন-যা সে সময়ের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ঢাকার আরমানিটোলায় বড় ভাইয়ের বাসায় থাকতেন; তার ভাই ছিলেন সিআইডি ইন্সপেক্টর এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ। এই পরিবেশই তরুণ আর আই চৌধুরীকে মুজিব-অনুরাগী করে তোলে।

ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে প্রস্তাবিত হয়- যা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি গড়ে দেয়। ঘটনাটি তার রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তবে তার জীবন শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ছিল চিন্তার স্বাধীনতায় পরিপূর্ণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে যাননি- যা অনেকের কাছে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। কিন্তু এর পেছনে ছিল ব্যক্তিগত বাস্তবতা- তার স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা। তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার এক বৌদ্ধ গাড়িচালকের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এ সিদ্ধান্ত তার মানবিকতা ও বাস্তববোধের পরিচায়ক, যদিও এর ফলে তার সাথে শেখ মুজিবের দূরত্ব তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর তিনি যে তিনটি পরামর্শ দিয়েছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি বলেছিলেন- মুজিব যেন রাষ্ট্রক্ষমতায় সরাসরি না যান; রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা নির্বিশেষে অস্ত্র উদ্ধার এবং সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হোক। এ তিন প্রস্তাব ছিল একধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। কিন্তু এসব পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে তিনি ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।

১৯৭৫ সালে বাকশাল আমলে তাকে ফের ডাকা হয়েছিল, কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। তার বক্তব্য ছিল-সময় পেরিয়ে গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই অবস্থান তাকে একজন নীতিনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী হিসেবে আলাদা করে চিহ্নিত করে।

Editorial-2-5-26

শিক্ষক হিসেবে তার অবদান ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ছিলেন সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষক। তবে তার প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে তিনি ১৯৬৯ সালে যোগ দেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত যুক্ত থাকেন। ১৯৯০-৯৫ সালে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন।

একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে তার গভীরতা থাকা সত্ত্বেও ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে তিনি খুব পরিচিত ছিলেন না। এটি একধরনের ‘কেন্দ্র-বহির্ভূত’ বুদ্ধিজীবী হওয়ার বাস্তবতা- যেখানে রাজধানীর বাইরে থাকা মানে আলোচনার বাইরে থাকা। কিন্তু চট্টগ্রামে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী একাডেমিক ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাষ্ট্রচিন্তার বীজ বপন করেছেন। ২০০৮ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর তার মৃত্যু হয়। তাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। চট্টগ্রামের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর- যা তার জীবনের শেষ অধ্যায়কে সংজ্ঞায়িত করে।

ড. আর আই চৌধুরীর জীবন আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে : রাষ্ট্রের প্রকৃত নির্মাতা কারা? যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেন, নাকি যারা দূর থেকে চিন্তার ভিত্তি নির্মাণ করেন? তিনি হয়তো জাতীয়ভাবে আলোচিত হননি, কিন্তু তার চিন্তা, সততা এবং দূরদর্শিতা তাকে এক ‘নীরব রাষ্ট্রবিজ্ঞানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আজকের বাংলাদেশে যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, জাতীয় ঐক্য এবং বিকল্প রাষ্ট্রদর্শনের প্রশ্ন সামনে আসে- তখন ড. আর আই চৌধুরীর চিন্তাগুলো নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, ঢাকার বাইরে থেকেও একজন মানুষ রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক