কে কথা কয় রে দেখা দেয় না

বাংলাদেশের জন্য শঙ্কা আরো প্রকট। এ সত্য কী কেউ বুঝতে পারছেন? আমাদের কী একজন জন কেরির দরকার নেই? আমরা যদি একজন জলবায়ু-বিষয়কমন্ত্রী পেতাম, তাহলে? তার মন্ত্রণালয় প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারত। আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে আরো বেশি সহায়তা আনতে পারত। গাছ লাগাতে পারত। নদী খনন করতে পারত। হাওর এলাকায় কী কী সঙ্কট হতে পারে, সেগুলো নিয়ে আগেভাগে ভেবে রাখতে পারত। বন বিনাশ কিছুটা হলেও কম হতো।

রাজনীতিতে চলছে তাপ-উত্তাপের মৌসুম। সংসদের ভেতরে গরম বিতর্ক। বাইরে উত্তাপ। কিন্তু এ উত্তাপ ছাপিয়ে গেছে আরো এক ভয়াবহ উত্তাপ। লকলকে আগুনের হল্কা হাতে দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতি। সেদিকে কারো খেয়াল নেই। রাজনীতিবিদদের তো নেই-ই। কখনো ছিল না। তারা যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় বসে সংবিধানের দাঁড়ি-কমা নিয়ে বিতর্ক করছেন, তখন রোদে পুড়ে ছাই হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অথচ রোদের এ তাপ, প্রকৃতির রোষ নিয়ে কোনো ‘অধিবেশন’ বসানো হয় না। এপ্রিলের শেষে ভ্যাপসা গরমে যখন পাথর হয়ে গিয়েছিল উত্তরের জনপদ, সেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়নি। নয়া দিগন্তের খবরে দেখা গেছে, ওই সময় রাজশাহীতে তাপমাত্রা ছিল ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিট স্ট্রোকে মৃত্যু হয়েছে এক শ্রমিকের। তখন খেটে খাওয়া মানুষের সামনে যেন খুলে গিয়েছিল জাহান্নামের দরজা!

এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছিল তাপ। ছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি। তারপর কিছু দিন কম। শেষে আবার বাড়তে থাকে। সেই তাপ গিয়ে ঠেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত। সারা দেশে চড় চড় করে বাড়ে বাতাসের আর্দ্রতা। এতে সাধারণ গরমও হয়ে ওঠে অসহনীয়। প্রকৃতি এখন খামখেয়ালি, বিদ্রোহী। অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খলÑ তাই করে ‘যখন চাহে এ মন যা’। এবার বৈশাখ সামনে রেখে একটা ঝড় তুলে দিলো প্রকৃতি! তারপর শুরু করল ‘ঘনঘোর বরিষণ’। বিরহী শ্রাবণের বর্ষণমুখর সময় চলে এলো বৈশাখে। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা সারা হওয়ার আগে গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

আসলে জলবায়ুর এখন ভীষণ অসুখ। এ অসুখ কতটা ভয়াবহ, সেটা দেখা গেছে হাওর এলাকায়। নয়া দিগন্ত অনলাইনে প্রকাশ হওয়া এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধান ও খড় হারিয়ে হাওরের কৃষকরা এখন নিঃস্ব। একবার ঢল নেমে ধানের মাঠ ডুবিয়েছে। তারপর আরো একটা ঢল এসে ডুবিয়ে দিয়েছে ঝাড়াইয়ের জন্য রাখা মাড়াই ধান। ভেসে গেছে ধানের খড়। যতটুকু আছে, সেটুকুতেও পচন ধরেছে। পচে যাওয়া খড়ে গরু মুখ দেয় না। বর্ষায় হাওর তলিয়ে যায়, সবুজ ঘাস থাকে না। ওই সময় কেবল শুকনো খড় খেয়ে থাকতে হয় গরুগুলোর।

তাহলে কী দাঁড়াল? হাওরে আগে আগে ঢল নেমে ধান (মানুষের খাবার) ডুবিয়ে দিলো। ভাসিয়ে নিয়ে গেল গরুর খাবারও। এ খবরে তোলপাড় হলো সারা দেশ। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেয়া হবে বলে ঘোষণা দিলো সরকার। ধরা যাক, এ সহায়তা পেয়ে সব ক্ষতি পুষিয়ে উঠলেন কৃষকরা। কিন্তু যে ধান তলিয়ে গেল, সেগুলোর কী হবে? এ ধান থেকে যে চাল হতো সেগুলো কি কেবল গেরস্ত-বাড়িতে খাওয়া হতো? নাকি সারা দেশে ছড়িয়ে যেত?

তাহলে? এখন সারা দেশের মানুষের গতি কী হবে? সরকার হয়তো সমাধান খুঁজবে চাল আমদানিতে। ঠিক আছে, এ বছর না হয় একটি সমাধান করা গেল। কিন্তু আগামী বছর?

আগামী বছর কি আগাম ঢল নামবে না? হাওরে কী এর আগে এমন ঢল নামতে দেখা যায়নি? দেখা গেছে, অহরহ দেখা যাচ্ছে। তারপরও আমাদের হুঁশ ফেরে না। এ সঙ্কট নিয়ে অধিবেশন বসানোর গরজবোধ করেন না রাজনীতিবিদরা। সরকারি দল, বিরোধী দল এর সমাধানে প্রশ্ন তোলে না।

আমাদের রাজনীতিবিদরা এ দায় উন্নত বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিয়ে হয়তো হাত ধুয়েমুছে বসে থাকতে পারেন। তারা বলতে পারেনÑ উন্নত দেশগুলো বেশি বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে। এতে ওজোন স্তর ফুটো হচ্ছে। আর তার মাশুল আমরা দিচ্ছি। এতে আমাদের আর কতটুকু করার আছে?

কথাটা সত্য, তবে পুরোপুরি নয়। আমাদের বাড়ির পাশের নদীটা যখন মরে যায়। বন যখন দখল হয়। তখন সেই দায় কার? আসলে নদী, বন আর প্রকৃতিও কথা বলতে জানে। আমরা শুনতে পাই না। প্রকৃতি যখন শান্ত থাকে, আমরা অস্তিত্ব টের পাই না। তাকে নিয়ে রাজনীতি করি না। কিন্তু ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রকৃতি কথা বলে। যন্ত্রণার তাপ ছড়ায়, অকাল বন্যা হয়ে কাঁদে। তখন লালনের গানের মতো প্রশ্ন করে বসি- কে কথা কয় রে দেখা দেয় না। নড়ে চড়ে হাতের কাছে খুঁজলে জনমভর মেলে না...

এ গান গাওয়া হয়েছে দেহ ও প্রাণের সম্পর্ক নিয়ে। এ সম্পর্ক রহস্যে ভরা। প্রাণ ছাড়া দেহ দিয়ে কী হবে? আবার কখনো প্রাণ মানে সেই ‘অচিন সত্তা’ দেহ-খাঁচায় থেকেও ধরা দেয় না। প্রকৃতিও তেমন, তার ইশারা বুঝতে না পারলে নেমে আসে বিপর্যয়। সেই বিপর্যয় এড়াতে কখনো আসমান-জমিন এক করে ফেলি আমরা। কিন্তু প্রাণ যে দেহের সাথে আছে, তা টের পাই না। বন, নদী আর মাটিকে ভালো থাকতে দিলেই যে প্রকৃতিও স্বাভাবিক থাকে, ভেবে দেখি না। এ ভাবনা আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে এখনো ‘অচীন’ থেকে গেছে।

অথচ যে উন্নত বিশ্বকে আমরা দোষ দিচ্ছি, তাদের অনেকে কিন্তু ‘অচীন’ ভেদ করে ফেলছে। তারা যা কিছু করে প্রকৃতির কথা অন্তত মাথায় রাখে। দূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘ক্লাইমেট ফান্ড’ বা জলবায়ু তহবিল গঠন করেছে দেশগুলো। সেই তহবিলের অর্থ আমাদের দেশেও আসে। কিন্তু ওগুলোর কতটুকু কাজে লাগানো হয়, কতটুকু দুর্নীতিতে ভেসে যায়, সেটা আমাদের জানা আছে।

জলবায়ু নিয়ে আমাদের মানসিকতা আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিকতায় খুব বেশি ফারাক নেই। আমরা বিষয়টিকে কখনো ইস্যু হিসেবে সামনে আনিনি। আনার ইচ্ছাও নেই। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু সঙ্কটকে বিষয়ের তালিকা থেকে আড়াল করতে মরিয়া। তার কাছে এটা কোনো সঙ্কট নয়। জলবায়ু সচেতনতাকে তিনি ‘ন্যাকামি’ মনে করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা বলে বিবেচনা করেন। সৌর বা বায়ুশক্তিকে ‘ঠাট্টা’ বলে উড়িয়ে দেন। ট্রাম্পের বিশ্বাস, যারা কার্বন নির্গমন কমানোর কথা বলছেন, তারা নিজেদের অর্থনীতি ধ্বংস করছেন। অথচ ট্রাম্পের উল্টো নীতিতে ছিল বাইডেন-প্রশাসন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যুদ্ধের মতো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বাইডেন। তিনি জন কেরির মতো তুখোড় রাজনীতিবিদকে ‘স্পেশাল প্রেসিডেন্সিয়াল এনভয় ফর ক্লাইমেট’ বা জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। মন্ত্রী মর্যাদার এ পদে থেকে প্যারিস চুক্তিতে ফিরতে কাজ করেছিলেন কেরি। হোয়াইট হাউজের ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাডভাইজর ছিলেন জিনা ম্যাকার্থি। পরে এ দায়িত্বে ছিলেন জন পোডেস্টা। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়লে তলিয়ে যেতে পারে আমেরিকার উপকূলীয় শহরগুলো।

বাংলাদেশের জন্য শঙ্কা আরো প্রকট। এ সত্য কী কেউ বুঝতে পারছেন? আমাদের কী একজন জন কেরির দরকার নেই? আমরা যদি একজন জলবায়ু-বিষয়কমন্ত্রী পেতাম, তাহলে? তার মন্ত্রণালয় প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারত। আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে আরো বেশি সহায়তা আনতে পারত। গাছ লাগাতে পারত। নদী খনন করতে পারত। হাওর এলাকায় কী কী সঙ্কট হতে পারে, সেগুলো নিয়ে আগেভাগে ভেবে রাখতে পারত। বন বিনাশ কিছুটা হলেও কম হতো।

বহুকাল আগে থেকে আমাদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন। কিন্তু আমরা কি এ বনকে রেহাই দিচ্ছি? মধুপুর ও ভাওয়ালে যে বন, সেগুলো কী আগের মতো আছে? নাকি ইটের ওপর ইট গেঁথে সমাধি বানিয়ে ফেলেছি। গাজীপুরের বনের দিকে তাকালে দেখা যায় কালো ধোঁয়া। দখল করা জমিগুলোতে উঠছে রাজকীয় অট্টালিকা।

অট্টালিকা আর সবুজের কী ফারাক, সেটা আমরা মুখে মুখে বলছি। রচনা লিখতে বললে খাতা ভর্তি করে লিখে দিয়ে আসছি। কিন্তু একবার রাজধানীর রমনা পার্কে গিয়ে সেই ফারাকটুকু ভেবে দেখছি না। এই ছোট সবুজটুকুর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও প্রাণ জুড়িয়ে যায়। পাওয়া যায় শীতল ছায়া। মীরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের কথাই ধরুন। শহরের অন্য রুক্ষ এলাকার চাইতে সেখানে বৃষ্টি হয় বেশি। গাছের সাথে যে মেঘের মিতালী আছে, সেটা এই কংক্রিটের শহর ভুলে গেছে। অথচ এই শহর একসময় কড়ই গাছে ভর্তি ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এখনো আছে শতবর্ষী কড়ই। সেগুনবাগিচা এলাকার নাম তো আর এমনি এমনি হয়নি। সেখানে ব্রিটিশরা সেগুনবাগান করেছিল। সেই গাছগুলো থাকলে এ শহর কী এতটা পাষাণ হতে পারত!

এখন বুড়িগঙ্গায় বয়ে যায় কালো স্রোত। নাকে আসে তীব্র কটু পচা গন্ধ। একসময় ঢাকায় ছিল অর্ধশতাধিক খাল। এগুলো প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ করত। এখন সামান্য বৃষ্টিতে পানি জমে যায় ঢাকায়।

এ দুঃসহ শহরে বসে কি রাতের আকাশ দেখা যায়? এ শহরে কী বসন্ত আসে? দেখা যায় শরতের মেঘ? যদি বসন্ত না-ই আসে, শরতের মেঘ দেখা না দেয়, তাহলে আমাদের কবিরা কবিতা লিখবেন কিভাবে? একটা সময় জীবনানন্দের সেই রূপসী বাংলাকে মনে হতে পারে এলিয়েনদের কাব্য।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]