আমাদের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের পেশা মৎস্য আহরণ। সাগর ও নদীর মোহনা তাদের কাজের অন্যতম জায়গা। এদের বড় একটি অংশ গভীর সাগরে গিয়েও মাছ ধরেন। মৎস্য আহরণে তাদের অবলম্বন ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার। জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করলে দেখা গেল, প্রথমেই এসব এলাকার পেট্রলপাম্পে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানির অভাবে জেলেরা মৎস্য অভিযানে নামতে পারছেন না। প্রথম ধাক্কায় দক্ষিণের উপকূল অঞ্চলে মৎস্যজীবীরা উপার্জনের অবলম্বন হারিয়েছেন।
সহযোগী একটি দৈনিকের খবরে বলা হচ্ছে, কক্সবাজার ও তার আশপাশ এলাকায় ২১টি ভাসমান পাম্প গত তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ওই এলাকার কিছু পাম্প বিগত সাত দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। উপকূলে মাছ ধরার ট্রলারে এসব পাম্প থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। ডিজেলের অভাবে এখানকার ছয় হাজার ট্রলার মাছ ধরতে যেতে পারছে না। মাছ আহরণকেন্দ্রিক অর্থনীতি থমকে দাঁড়িয়েছে। এর চক্রাকার অভিঘাত জাতীয় অর্থনীতিকে নাড়া দেয়ার মতো। দরিদ্র জেলেদের দৈনিক উপার্জনের ওপর তাদের পরিবারের জীবিকা নির্ভর করছে। জ্বালানি সরবরাহ করা না গেলে দুই লাখ জেলে পরিবার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিদিন বিপুল মৎস্য আহরণ করা হয়। এটি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এই মাছ বিদেশেও রফতানি হয়। জেলেরা মাছ ধরতে না পারায় বাজারে মাছের সরবরাহে ইতোমধ্যে ভাটা পড়ছে। তার প্রভাব মৎস্য রফতানিতেও পড়বে।
যেকোনো ধরনের দুর্যোগে জেলেরা প্রথমে আক্রান্ত হন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের শিকার হন তারা। এখন দেখা যাচ্ছে, মনুষ্যসৃষ্ট সঙ্কটেও তারাই বেশি বিপদে পড়ছেন। সঙ্কটকালে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা রাখা হয় না। মা মাছের ডিম ছাড়া কিংবা ইলিশের জাটকা নিধন বন্ধে প্রায়ই উপকূলে এবং দেশের ভেতর প্রবাহিত নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। সেই সময়ও দরিদ্র জেলেরা বেশি আক্রান্ত হন। এখন জাটকা নিধন বন্ধে পদ্মাসহ ছয়টি নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। ১ মার্চ শুরু হয়ে দুই মাস এই নিষেধাজ্ঞা থাকবে। দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও দেশের মধ্যভাগে নদীতে মৎস্য আহরণ করে জীবিকা চালানো জেলেরা এ কারণে বেকার জীবনযাপন করছেন। তাদের দুরবস্থা নিয়েও খবর আসছে। এই সময়ে তাদের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হতেই জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির অভিঘাতটি জেলেদের ওপর সরাসরি পড়ল। ইতোমধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের রেশনিং তুলে দিয়েছে। তার পরও কক্সবাজারের ভাসমান পাম্পগুলোতে দ্রুত তেল সরবরাহ হবে কি-না তার নিশ্চয়তা নেই।
জেলেদের বড় একটি অংশ দরিদ্র। দাদন ব্যবসায়ী আড়তদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। এসব থেকে তাদের মুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেই। যুদ্ধের কারণে তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে আমাদের অন্তত জেলেদের নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা করা দরকার। মৎস্য আহরণকারী ট্রলারে জ্বালানি সরবরাহকারী পাম্পে যেকোনো জরুরি অবস্থায় যাতে তেলের মজুদ থাকে তার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।



