বৈষম্যবিরোধী মামলার তদন্তে অগ্রগতি

জুলাইয়ের রক্তে চাঁদাবাজির ছাপ

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্ত নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে একটি সঙ্ঘব্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। চক্রটি একটি রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে ঢালাও মামলাগুলোতে অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও পুরনো দ্বন্দ্ব এবং পূর্বশত্রুতার জেরে মামলার পর মীমাংসার নামে চঁঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি পিবিআই ও ডিএমপির ৬৬ মামলার চূড়ান্ত (ফাইনাল) রিপোর্টের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। অনেক মামলার বাদি, সাক্ষী এমনকি ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পায়নি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এস এম মিন্টু
Printed Edition
  • তদন্ত ২৭২টি, তদন্ত শেষ ৯০ শতাংশ
  • ডিএমপিতে তদন্তাধীন ৫৯৯, অপ্রমাণিত ২০টি, চার্জশিট ৫টি

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্ত নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে একটি সঙ্ঘব্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। চক্রটি একটি রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে ঢালাও মামলাগুলোতে অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও পুরনো দ্বন্দ্ব এবং পূর্বশত্রুতার জেরে মামলার পর মীমাংসার নামে চঁঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি পিবিআই ও ডিএমপির ৬৬ মামলার চূড়ান্ত (ফাইনাল) রিপোর্টের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। অনেক মামলার বাদি, সাক্ষী এমনকি ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পায়নি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বা জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত ঘটনায় সারা দেশের থানায় মোট মামলা হয় ১৭৩০টি। তার মধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কাছে থানা এবং আদালতে করা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় ২৭২টি। পিবিআই এরই মধ্যে ৯০ শতাংশ মামলা তদন্ত শেষ করেছে। অপর দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে মামলা তদন্ত দেয়া হয়েছে ৫৯৯টি। তার মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৩২২টি এবং অন্যান্য মামলা রয়েছে ২৭৭টি। এর মধ্যে অপ্রমাণিত মামলা (ফাইনাল রিপোর্ট) দিয়েছে ২০টি। চার্জশিট দিয়েছে পাঁচটি। তার মধ্যে হত্যা মামলার ফাইনাল ও চার্জশিট ২১ টির এবং অন্যান্য মামলায় চারটি।

পিবিআই সূত্র জানায়, তদন্ত সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ১৬৩টির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে (পিবিআই)। এসব মামলার মধ্যে অন্তত ৪৬টির প্রতিবেদনে অভিযোগ ‘অপ্রমাণিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ১৪টি মামলা ‘মিথ্যা’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সে হিসাবে ৬০টি মামলাকে পিবিআই অপ্রমাণিত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মামলার এজাহার বা অভিযোগের অসংলগ্ন বর্ণনা, সাক্ষী-প্রমাণ ও আসামির নাম-পরিচয়ে গরমিল, বাদিকে না পাওয়া বা বাদির মামলা চালাতে না চাওয়াসহ এমন নানা অসঙ্গতির ভিত্তিকে ওই ৬০টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ‘অপ্রমাণিত’ হিসেবে আদালতে জমা দেয়া হয়।

পিবিআই সদর দফতর থেকে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থান বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো পিবিআই ছাড়াও আরো অন্য সংস্থা বা ইউনিট তদন্ত করছে। এর মধ্যে ২৭২টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই, যার মধ্যে আদালতে দায়ের হওয়া সিআর (কমপ্লেইন রেজিস্টার) মামলা ১৯৫টি এবং থানায় দায়ের হওয়া জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা ৭৭টি।

পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া মোট মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬৩টির (সিআর ১৩৪, জিআর ২৯) তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পিবিআই। এর মধ্যে ১০৩টির (সিআর ৮৪, জিআর ১৯) তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ ‘প্রমাণিত’ উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৬০টি (সিআর ৫০, জিআর ১০) মামলার প্রতিবেদনকে ‘অপ্রমাণিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে আবার ১৪টি মামলাকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মিথ্যা মামলার মধ্যে সিআর মামলা দুইটি এবং জিআর মামলা ১২টি। অন্য দিকে জিআর মামলা ৭৭টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৭টি, তদন্ত চলমান রয়েছে ৪০টি। এ ছাড়া সিআর মামলায় ১৯৫টির মধ্যে ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৪টি, তদন্ত চলমান রয়েছে ৬১টি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপ্রমানিত এবং মিথ্যা মামলাগুলো মূলত মামলাবাজরাই করেছে। মামলাবাজদের উদ্দেশ্য হাসিল, প্রতিপক্ষের সাথে পুরনো দ্বন্দ্ব এবং সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের ফাঁসিয়ে মূলত চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মামলাগুলো করেছে দুষ্কৃতকারীরা।

এ প্রসঙ্গে পিবিআই সদর দফতরের গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো: আবু ইউসুফ বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংক্রান্ত যেসব মামলা পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনিষ্পন্ন প্রায় ৯০ শতাংশের তদন্ত-প্রক্রিয়া এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। বাকি ১০ শতাংশ মামলার তদন্তও দ্রুত শেষ করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্টরা।

অন্য দিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহতদের ঘটনায় যেসব হত্যা মামলা হয়েছে তার মধ্যে অনেকটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি। সাধারণভাবে হত্যা মামলায় লাশের ময়নাতদন্ত বিচার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে তদন্ত সংস্থাগুলো কিছু লাশের (গলিত) ময়নাতদন্ত করলেও বেশ কিছুসংখ্যক লাশের বা মামলার ক্ষেত্রে তা হয়নি। ফলে এসব মামলার বিচারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও অনেকের মাঝে সংশয় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ওই ঘটনায় যেসব হত্যা মামলায় তদন্তে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নেই, সেখানে লাশ গোসলকারী, নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণকারী ইমাম এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের সাক্ষ্যকে প্রধান প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সাধারণত কোনো হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে হত্যা মামলার বিচারটি কোন আদালতে হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি সাধারণ হত্যা মামলা বা দায়রা জজ আদালতের মামলা হয়, তখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনেকটাই অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়ায়।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বা জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত ঘটনায় সারা দেশের থানায় মোট মামলা হয় ১৭৩০টি। এর মধ্যে হত্যা মামলার সংখ্যা ৭৩১টি। এসব মামলার তদন্ত রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), পিবিআই, সিআইডি এবং বিভিন্ন জেলা পুলিশের হাতে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকার (ডিএমপি) থানাগুলোতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ওই ঘটনায় মোট ৭১৫টি মামলা হয়, যার মধ্যে হত্যা মামলা ৪৪৬টি।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির উপ-কমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ডিএমপিতে তদন্তাধীন ৫৯৯টি মামলার মধ্যে ২৫টির তদন্ত শেষ করা হয়েছে। তার মধ্যে ফাইনাল রিপোর্ট ২০টি এবং চার্জশিট দেয়া হয়েছে পাঁচটি। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে।

অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, বৈষম্যবিরোধী মামলার সিআইড তদন্তের দায়িত্ব পায় ১১৭টি। তার মধ্যে একটি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে।