ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের বয়স মাত্র ১১ দিন। এর মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তৎপরতা শুরু করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী ধীরে ধীরে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী নেতাকর্মীরা এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। কোনো কোনো জায়গায় শক্তি প্রদর্শনের মহড়াও দিচ্ছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পরের দিন থেকে বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় খুলতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। শুধু দলীয় কার্যলয় খোলা নয়, একের পর এক দলটির নেতাকর্মী জামিন পাচ্ছেন। তাদের মধ্যে কক্সবাজারের আবদুর রহমান বদি ও নারায়ণগঞ্জ সিটির সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি তালুকদার মো: ইউনুস, সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনের জামিন হয়েছে। এর আগে মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন ও মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান জামিন পান। নির্বাচন-পরবর্তী গোপালগঞ্জে দুই শতাধিক নেতাকর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তারা নিজেদের ঘরবাড়িতে উঠেছেন, আগের মতো প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। দেখা যাচ্ছে দেশের সব জেলায় পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— কিভাবে জামিন পাচ্ছেন তারা? তাদের অপরাধের বিষয়ে সরকারি কৌঁসুলিরা কী যথাযথ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হচ্ছেন? নাকি গোপন সমঝোতায় মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে জামিনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর দেশে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ শাসন করেছে। এতে দলটি নেতাকর্মীরা রাজনীতির পরিবর্তে মাস্তানতন্ত্র কায়েম করেন। তাই দেখা যাচ্ছে, কারাগার থেকে বেরিয়েও তারা তাদের আগের স্বভাব পরিবর্তন করতে পারেননি। তাই তো দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা আওয়ামী নেতাকর্মীরা জামিনে বের হয়ে স্থানীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। এতে নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। যেমন— ২৩ ফেব্রুয়ারি আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নড়াইলের সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান খায়ের মোল্যা এবং বিএনপি সমর্থিত স্থানীয় নেতা খলিল মোল্যার লোকজনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতে বিএনপি সমর্থিত চারজন ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত একজন নিহত হন।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী নেতাকর্মীরা সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থানীয়পর্যায়ে আনাগোনা বাড়িয়েছেন। ভীতি কাটিয়ে এলাকার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছেন। দেশ ছেড়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে যারা পালিয়েছেন, তারাও নির্বাচন-পরবর্তী সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীতিতে পুনর্বাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে দিল্লি থেকে বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের দেশে যেতে দলীয় প্রধান ও পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নির্বাচন-উত্তর সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, যা এখন দৃশ্যমান। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তার বহিঃপ্রকাশ মিলছে। বড় প্রশ্ন হলো— রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক কোনো গোষ্ঠীর সাথে সমঝোতার ইঙ্গিত, নাকি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বিশেষ করে ভারতের সাথে নতুন সরকারের বোঝাপড়ার কৌশলগত দিক— তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা আছে। এ নিয়ে যে আলোচনায় থাকুক না কেন; বাস্তবতা হলো— বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যে অপকর্ম করেছেন, তাদের সেই অপরাধের বিচারসম্পন্নের আগে যদি তারা রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান, তা হবে দেশের রাজনীতিতে অশনি সঙ্কেত।



