জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের এটিই প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও এটি। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির আওতায় তৈরী পোশাকসহ প্রায় সাত হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশী পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্য দিকে বাংলাদেশের বাজারে পর্যায়ক্রমে এক হাজার ৩৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে জাপান। পরে ধাপে ধাপে আরো দুই হাজার ৭০২টি জাপানি পণ্য শুল্ক ছাড়ের আওতায় আসবে। একপর্যায়ে উভয় দেশের মোট ৯ হাজার ৩৫৪টি পণ্যে কোনো শুল্ক থাকবে না। তবে জাপানের গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনে জাপানি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সরকারিভাবে বলা হয়েছে, চুক্তির সব পণ্যে শুল্ক ছাড় কার্যকর হলে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে বাংলাদেশের। তার পরও এই চুক্তি সম্পাদনের একটি যৌক্তিক কারণ আছে। সেটি হলো, এলডিসি উত্তরণের পর জাপানের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশে কোনো শুল্ক সুবিধা থাকবে না। শুল্ক সুবিধা ছাড়া পণ্য প্রবেশে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে তিন হাজার কোটি টাকা থেকে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। তাই সার্বিক লাভক্ষতি বিবেচনায় এই চুক্তি সম্পাদন শুধু যথার্থ নয়, অত্যন্ত সময়োচিত এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলে আমরা মনে করি। বর্তমানে জাপান হলো এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য। বাংলাদেশ জাপানে রফতানি করে বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য, যার বেশির ভাগই তৈরী পোশাক। আর জাপান থেকে আমদানি করে বছরে ১৮০ থেকে ২৭০ কোটি ডলারের পণ্য।
চুক্তিটি কেবল বাণিজ্যিক দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের দ্বার উন্মোচনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যাতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে আরেকটি বড় অর্জনের সম্ভাবনা আছে। চুক্তির আওতায় পোশাক খাতে এমন সুবিধা যুক্ত হয়েছে, যাতে এখন থেকে কাঁচামাল নিয়ে কোনো জটিলতা ছাড়াই বাংলাদেশী পোশাক সহজে রফতানি করা যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পর বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের পোশাক খাত ধ্বংসের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এমতাবস্থায় জাপানের সাথে চুক্তি সেই ঝুঁকি ও আশঙ্কা দূর করতে সহায়ক হবে।
এর পাশাপাশি জাপানের তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিক্ষা, কেয়ার গিভিং ও নার্সিংয়ের মতো প্রায় ১৬টি বিভাগের ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশী দক্ষ পেশাজীবীদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে। এ দিক থেকেও চুক্তিটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তা ছাড়া এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিকস ইত্যাদি খাতে জাপানের সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা যথাসময়ে ঠিক কাজটি করেছেন। এ জন্য সরকার এবং উপদেষ্টা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।



