মিরপুরে ফ্ল্যাটে বৃদ্ধার মৃত্যু : মা-বাবার দেখভালে আইনি বাধ্যবাধকতা কী

মিরপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নূরজাহান বেগমের পচাগলা লাশ উদ্ধার হওয়ায় সন্তানদের অবহেলার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনা ও তদন্ত শুরু হয়েছে। ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী মা-বাবার ভরণপোষণ ও দেখাশোনা বাধ্যতামূলক; আইন ভঙ্গ করলে জরিমানা বা কারাদণ্ড হতে পারে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মিরপুরে ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধার পচনধরা লাশ উদ্ধার
মিরপুরে ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধার পচনধরা লাশ উদ্ধার |সংগৃহীত

ঘরভর্তি ময়লা-আবর্জনা, স্যাঁতসেতে মেঝেতে জন্মেছে ছত্রাক। এর মধ্যেই ছোট একটি খাটের ওপর পড়ে ছিল সত্তরোর্ধ্ব এক প্রবীণ নারীর নিথর দেহ। নাম নূরজাহান বেগম। তিনি কবে মারা গেছেন, বলতে পারেন না সন্তানরা।

ঘটনাটি ঢাকার মিরপুরের। খবর পেয়ে গত রোববার ওই বাসা থেকে পুলিশের সদস্যরা যখন ওই বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করেন, ততক্ষণে তাতে পচন ধরে রীতিমত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: হাসান বাসির বলেন, ‘ফ্ল্যাটটি এত পরিমাণে নোংরা এবং সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল যে, পুলিশের সদস্যরা দাঁড়াতে পারছিল না।

পুলিশ বলছে, ওই বৃদ্ধার সন্তানরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

ওসি বলেন, ‘উনার ছেলেদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, আরেকজন বুয়েটের শিক্ষক। এছাড়া উনার একটা মেয়ে আছে, যিনি স্থানীয় একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ওই মেয়ের সাথেই তিনি থাকতেন।’

স্যাঁতসেতে নোংরা যে ঘরটিতে বৃদ্ধা নূরজাহান বেগম মারা গেছেন, ইতোমধ্যেই সেটির ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

সেগুলো দেখার পর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অবহেলার অভিযোগ তুলে সন্তানদের শাস্তিও দাবি করছেন কেউ কেউ।

বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনও দায়ের করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী জানিয়েছেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়াত বৃদ্ধার যুগ্ম-সচিব ছেলের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তারা।

ইতোমধ্যে বুধবার ওই যুগ্মসচিবকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

কিন্তু বয়স্ক মা-বাবার দেখা-শোনার ব্যাপারে বাংলাদেশের আইনে ঠিক কী বলা আছে? কোনো সন্তান যদি ওই আইন না মানেন, সেক্ষেত্রে তাকে কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে?

প্রাথমিক তদন্তে যা পেয়েছে পুলিশ

মিরপুর ছয় নম্বর সেকশনের চতুর্থ তলার যে ফ্ল্যাটটি থেকে নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কে অবস্থিত। বাসাটি মূলত বৃদ্ধার মেয়ে ও তার স্বামীর বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ।

ওসি বাসির বলেন, ‘উনার মেয়ের জামাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। তাদের ছেলে-মেয়ে নেই। ফলে ঘরে মানুষ বলতে কেবল মা-মেয়ে দু’জনই ছিলেন।’

ভবনের অন্য বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করলেও তারা খুব একটা বাইরে বের হতেন না।

‘তারা কারো সাথে কথা বলত না, খুব একটা মিশত না। কোনো প্রয়োজনে বাসায় গেলে দরজাও খুলত না,’ বলছিলেন ভবনটির এক বাসিন্দা।

গত রোববার মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পাশের একটি ক্লিনিক থেকে দু’জন নার্সকে বাসায় ডেকে আনেন বৃদ্ধার চল্লিশোর্ধ স্কুল শিক্ষক মেয়ে।

ওসি বাসির বলেন, ‘তারা ঘরে ঢুকে বৃদ্ধাকে মরে পড়ে থাকতে দেখে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে খবরটা আমাদের জানান।’

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশের সদস্য নিশ্চিত হন যে বৃদ্ধার মৃত্যু বেশ কয়েকদিন আগেই হয়েছে। ওসি বলেন, ‘আমরা গিয়ে দেখি উনার শরীরে পচন ধরে গেছে। বিশেষ করে পিঠে এবং চোখে রীতিমত পোকা দেখা যাচ্ছিল।’

পুরো ফ্ল্যাটের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বলেও জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

ওসি বলেন, ‘বৃদ্ধার রুমের নোংরা পরিবেশের যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, পুরো ফ্ল্যাটটাই ওইরকম নোংরা। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে ওইরকম জায়গায় বসবাস করা সম্ভব না।’

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় বৃদ্ধার মেয়ের কথাবার্তা অসংলগ্নতা পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

‘সব মিলিয়ে বৃদ্ধার মেয়ে মানসিকভাবে সুস্থ কি-না, সেই প্রশ্নটাই এখন সামনে আসছে। তা না হলে মায়ের লাশ পচা গন্ধ উনি পেলেন না কেন?,’ বলেন পল্লবী থানার ওসি।

এদিকে, ময়নাতদন্তের পর নূরজাহান বেগমের লাশ তার বুয়েটের শিক্ষক ছেলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বিচারের দাবি

ছেলে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষিত এবং সামর্থ্যবান হওয়ার পরও ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের এমন মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।

‘এটা খুবই ন্যাক্কারজনক একটা ঘটনা। এমন মৃত্যু মোটেও মেনে নেওয়া যায় না,’ বলছিলেন ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা ইমতিয়াজ হোসেন।

সন্তানদের অবহেলার কারণেই ওই বৃদ্ধার এমন ‘করুণ মৃত্য’ হয়েছে বলে দাবি করছেন কেউ কেউ।

‘বৃদ্ধ ওই মা কতটুকু অবহেলার শিকার হয়েছিলেন, সেটা তার রুমের ভিডিও দেখলেই বুঝতে বাকি থাকে না,’ বলেন ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া সিদ্দিকী।

তিনি যোগ করেন, ‘বিচার ও শাস্তি না হলে এরকম করুন মৃত্যুর ঘটনা আরো ঘটতে থাকবে।’

এদিকে, নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন শরীফ সরকার নামের এক আইনজীবী।

ওই ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কি-না, সেটি খতিয়ে দেখতে মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সন্তানদের অবহেলায় মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী।

তিনি বলেন, ‘এটা অবশ্যই তদন্ত করা হবে। সেখানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে উনার যে যুগ্ম-সচিব ছেলে, তার বিরুদ্ধে আমরা আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

আইন কী বলে?

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছেলে-মেয়েরাই সাধারণত মা-বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে দেখে শুনে রাখেন। তবে বিষয়টি নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময় নানান অভিযোগ ওঠার কারণে ২০১৩ সালে এ নিয়ে একটি আইনও পাস করে সরকার।

‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ নামের ওই আইনে প্রতিটি সামর্থ্যবান ছেলে-মেয়েকে তার মা-বাবার ভরণপোষণ তথা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা প্রদানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

আইনে এটাও বলা হয়েছে যে কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন।

আরো বলা হয়েছে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সন্তানদেরকে তাদের সাথে একই স্থানে বসবাস করতে হবে।

মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না।

চাকরি বা অন্য কোনো কারণে সন্তানরা পিতা-মাতার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করলে নিয়মিতভাবে তাদেরকে মা-বাবার খোঁজ-খবর নেয়া এবং দেখা-সাক্ষাৎ করার কথা বলা হয়েছে।

সেইসাথে, মা-বাবাকে নিয়মিতভাবে যৌক্তিক পরিমাণ টাকা-পয়সা প্রদান করার কথাও রয়েছে আইনে।

আইন অনুযায়ী, ছেলে-মেয়ের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা তাদের বৃদ্ধ দাদা-দাদি বা নানা-নানির দেখাশোনা করবেন।

কেউ যদি এই আইন না মানে, সেক্ষেত্রে তাকে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের কেউ যদি এই আইন বাস্তবায়নে বাধা দেন, তাহলে তিনি একই শাস্তি ভোগ করবেন বলে আইনে বলা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি আইন। প্রচারণার মাধ্যমে এই আইন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা এবং এটি প্রয়োগ করে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে মিরপুরের ঘটনার মতো ঘটনা আর ঘটবে না বলে আমি মনে করি।’

সূত্র : বিবিসি