সন্তান হারানো পুলিশ বাবার আর্তনাদ

‘উপরের নির্দেশে’ আড়াল করা হয়েছিল গুলির চিহ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে খোদ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইম। সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এক শিউরে ওঠা সত্য প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। তিনি জানিয়েছেন, নিজের সন্তানের লাশের সুরতহাল করার সময়ও সহকর্মী পুলিশ সদস্যরা পেশাদারিত্বের চরম অবমাননা করেছেন। ‘উপরের নির্দেশ’ পালন করতে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদনে গুলির তথ্য গোপন করে তাকে মিথ্যা জবানবন্দীতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে খোদ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইম। সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এক শিউরে ওঠা সত্য প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। তিনি জানিয়েছেন, নিজের সন্তানের লাশের সুরতহাল করার সময়ও সহকর্মী পুলিশ সদস্যরা পেশাদারিত্বের চরম অবমাননা করেছেন। ‘উপরের নির্দেশ’ পালন করতে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদনে গুলির তথ্য গোপন করে তাকে মিথ্যা জবানবন্দীতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে দেয়া জবানবন্দীতে তিনি এসব কথা বলেন।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় আন্দোলন চলাকালীন অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ইমাম হাসান তাইমকে। এই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ জন আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসে ময়নাল হোসেন বলেন, বর্তমানে তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে এসআই হিসেবে কর্মরত। অর্থাৎ, যে বাহিনীর গুলিতে সন্তান হারিয়েছেন, সেই বাহিনীরই একজন সদস্য তিনি।

২১ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তাইমের লাশের ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় ছিলেন ময়নাল হোসেন। জবানবন্দীতে তিনি উল্লেখ করেন, শাহবাগ থানার তৎকালীন এসআই শাহাদাত হোসেন সেখানে উপস্থিত হলে ময়নাল নিজের পরিচয় দিয়ে জানান যে, পুলিশই তার ছেলেকে গুলি করে মেরেছে। তিনি দ্রুত সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের অনুরোধ করেন।

ময়নাল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন একই পেশার সহকর্মী হওয়া সত্ত্বেও শাহাদাত আমাকে কোনো সান্ত¡না দেননি। বরং তিনি ফোনে অন্য কারো সাথে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং সুরতহাল করতে অকারণে দেরি করেন। দুপুর ১২টার দিকে যখন সুরতহাল শুরু হয়, তখন আমি দেখি তিনি গুলির চিহ্নের কথা না লিখে কেবল ‘কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট’ থাকার কথা লিখছেন। গুলির কথা না লেখায় প্রতিবাদ জানালে এসআই শাহাদাত রুক্ষ স্বরে ময়নাল হোসেনকে বলেন, ‘এটা ওপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না।’ শাহাদাত দাবি করেন যে, ছাত্র-জনতার আঘাতেই তাইম মারা গেছে।

জবানবন্দীতে ময়নাল হোসেন তার তৎকালীন মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন আমার সন্তান মারা গেছে। একদিকে চাকরি হারানোর ভয়, অন্যদিকে ছেলের লাশ প্রায় পচন ধরে যাচ্ছিল। ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত হচ্ছিল না। সব মিলিয়ে এক চরম অসহায়ত্বের মধ্যে আমি ওই মিথ্যা সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। দীর্ঘ চেষ্টার পর বিকেল ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের কক্ষে লাশ নেয়া হয় এবং সাড়ে ৪টার দিকে তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই মামলায় মোট ১১ জন আসামির মধ্যে দু’জন গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান; তৎকালীন এসআই (যিনি সুরতহাল করেছিলেন) শাহাদাত আলী।

বাকি ৯ জন আসামি বর্তমানে পলাতক। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান; তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী; ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসেন; সাবেক এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম; ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো: মাসুদুর রহমান মনির; তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস; পুলিশ পরিদর্শক জাকির হোসেন ও ওহিদুল হক মামুন; এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। তার সাথে ছিলেন আবদুস সোবহান তরফদার ও মঈনুল করিম।

শাপলা চত্বরে গণহত্যা : আসামি হচ্ছেন সাবেক আইজিপি মামুন

এদিকে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গণহত্যার দায়ে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবার আসামি হচ্ছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। এ ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। গতকাল বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

প্রসিকিউশন জানায়, ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন র‌্যাবের কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। তাকে এ মামলার আসামি করা হবে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আসলে কারা আসামি হতে যাচ্ছেন, তা এখনই প্রকাশ করতে পারছি না। তবে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অনেক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাচ্ছি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণ প্রতিবেদন পাবো বলে আমরা আশাবাদী। এ নিয়ে কাজ করছে তদন্ত সংস্থা।

নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাকাণ্ড গোটা পৃথিবীর মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। সেহেতু মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় যাদেরই সম্পৃক্ততা মিলবে, আমরা তাদেরই আইনের আওতায় আনবো। তিনি সিভিলিয়ান কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হোক। আমরা প্রত্যেককেই বিচারের আওতায় নিয়ে আসব।

বর্তমানে এ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। গত ৫ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৭ জুন দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল।

এ মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।

এদিকে, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে দেশজুড়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে রয়েছেন চৌধুরী মামুন। সাবেক এই আইজিপি এ মামলার রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দীও দিয়েছেন।