কূটনৈতিক প্রতিবেদক
রোহিঙ্গা সঙ্কট এখন আর শুধু মানবিক সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া এই সঙ্কটের চাপ শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর প্রভাব ফেলবে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বাস্তববাদী রাজনৈতিক উদ্যোগ- এই তিনটি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
২০১৭ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন ও সহিংস দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে উল্টো জটিলতা বেড়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে চলমান সঙ্ঘাতের ফলে আরো প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে। সবমিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ।
নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হারানো এই জনগোষ্ঠীকে জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের সবচেয়ে নিগৃহীত জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
প্রত্যাবাসন চুক্তির অচলাবস্থা : ২০১৭ সালের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি ঘটনার পর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। উল্টো রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্ঘাতে নতুন করে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটছে।
বর্তমান বাস্তবতায় রাখাইনে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি না হলে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা নিতে প্রস্তুত নয়। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ বাড়লেও বাস্তবিকভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি আনা সম্ভব হচ্ছে না।
রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ও আরাকান আর্মির ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি ২০২৭ সালের মধ্যে ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া সঙ্ঘাতে তারা এখন পর্যন্ত রাখাইনের ১৪টি টাউনশিপ এবং দক্ষিণ চিন রাজ্যের পালেতওয়া দখল করেছে।
বর্তমানে রাখাইনের মাত্র তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা- রাজধানী সিত্তুয়ে, কিয়াকফিউ এবং মানাউং- মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে এই রাজনৈতিক-সামরিক পরিবর্তনের মধ্যেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি অনুকূল হয়নি। বরং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈরী মনোভাবের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কারণে তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না বলেও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঙ্ঘাতকালীন সময়ে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী উভয়েই বিভিন্ন কৌশলগত প্রয়োজনে রোহিঙ্গা যুবকদের ব্যবহার করছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এর ফলে আরসাসহ (আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি) বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথেও সঙ্ঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কূটনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশের অবস্থান
সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সাথেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এমনকি উভয় পক্ষ থেকেই বাংলাদেশকে কূটনৈতিক বার্তা ও শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।
এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে এখন দ্বিপক্ষীয় নয়, বরং বহুপক্ষীয় ও জটিল রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংসদে জানিয়েছে, চলমান সঙ্ঘাতের কারণে এখনই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব নয়। সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সঙ্কটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ও চাপ অব্যাহত রাখা হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাস ও মানবিক সঙ্কট
বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন সঙ্ঘাত ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমশ কমে আসছে। মার্চ মাস পর্যন্ত শরণার্থী শিবিরে প্রতিটি পরিবারকে ১২ মার্কিন ডলার করে সহায়তা দেয়া হলেও ১ এপ্রিল থেকে তা হ্রাস করে তিনটি ক্যাটাগরিতে ৭, ১০ ও ১২ ডলারে নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জানিয়েছে, অর্থ সঙ্কটের কারণেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে তারা। এতে শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জীবনমান আরো ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক সঙ্কট গভীর হচ্ছে এবং অনেক রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়াসহ অন্য দেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবিতে প্রায় ২৫০ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এই সঙ্কটের ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূতের বিশ্লেষণ
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরতে না পারা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের জীবন কেবল বেঁচে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা ভবিষ্যৎ গঠনের কোনো বাস্তব সুযোগ নেই। ফলে তারা মরিয়া হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বলি হচ্ছে। বছরের পর বছর সমাধান না হওয়ায় তারা এখন চরমভাবে হতাশ ও মরিয়া।’
তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে নীতিগত পরিবর্তনের আশা কম। তাই যাদের সাথে বাস্তবসম্মতভাবে কাজ করা সম্ভব, তাদের সাথেই কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
তার মতে, ‘বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান জরুরি। এর সাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তাও গভীরভাবে জড়িত। সমাধান সম্ভব হলে মিয়ানমার ও আসিয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে।’
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব
হুমায়ুন কবির মনে করেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকে আর কেবল প্রশাসনিক বা কারিগরি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এটিকে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- প্রথমত, রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের নিজেদের বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া, যেখানে বাংলাদেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তৃতীয়ত, রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন পক্ষের সাথে অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা খোলা রাখা।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আবেগের জায়গা থেকে নয়, বাস্তব ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। সব সম্ভাব্য উপাদান কাজে লাগিয়ে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।



