উইমেন ফর গুড গভর্ন্যান্সের নির্বাহী পরিচালক রুবি আমাতুল্লাহ বলেছেন, জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক শক্তি এমন এক প্রক্রিয়া চালাচ্ছে যাতে জনমতের মূল্যায়ন হচ্ছে না। সত্তর শতাংশ ভোটার বা পাঁচ কোটি মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কার চেয়েছে, গণরায়ের ওপর কোনো ম্যান্ডেট কোনো দেশে থাকতে পারে না। যে কোনো দেশের সর্বোচ্চ ম্যান্ডেট হচ্ছে গণরায়। এ গণরায়কে বাতিল বা অগ্রাহ্য করা গণবিরোধী। তিনি বলেন, জনগণকে বাদ দিয়ে প্রশাসন একটা কিছু করতে চাচ্ছে, ওরা বলছে ওদের মতো করে সংস্কার করবে, কিন্তু জনগণ তা বলেনি। জনগণ দীর্ঘ সময়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংস্কার প্রস্তাবেই রায় দিয়েছে। একটা গণ-আস্থা থেকেই এ রায় তারা দিয়েছে।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবি আমাতুল্লাহ বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার ধারাবাহিকতা, ছয়টি কমিশনের বিশেষজ্ঞ মতামত, এসব প্রক্রিয়া সম্পর্কে পাবলিকলি প্রচার থেকে ডিসিসন মেকিং প্রসেস সম্পর্কে জনগণ ওয়াকিবহাল ছিল এবং তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।
নয়া দিগন্ত : সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বিধাবিভক্তির মধ্য দিয়ে তাহলে কি জনগণকে অবহেলা করা হচ্ছে?
রুবি আমাতুল্লাহ : অবশ্যই অবহেলা করা হচ্ছে, জনগণকে আন্ডারমাইন করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণকে ক্ষমতায়িত করার বড় সুযোগ পেয়েছিলাম, তাদের মতামত নিয়ে কাজ করার ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এখানে প্যারাডাইম শিফ্ট দরকার। প্রথমত নির্বাচনে যে ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার চলছে সেখানে গণভোটের রায় বাতিল করলে নির্বাচনও বাতিল হয়ে যায়।
নয়া দিগন্ত : সংবিধানের কথা বলা হচ্ছে।
রুবি আমাতুল্লাহ : নির্বাচনটা সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। গণ-আন্দোলন সংবিধান অনুযায়ী হয় না। জুলাই সনদ সংবিধানে নাই। নির্বাচন হলো সংবিধানের বাইরে গিয়ে এমন এক সময়ে নিয়ম কানুন না মেনে। অন্তর্বর্তী সরকারও তাহলে তো বেআইনি। গণ-অভ্যুত্থান কখনো সংবিধান মেনে হয় না। জনগণের অভিপ্রায়ের চরম বহিঃপ্রকাশ গণ-অভ্যুত্থান।
নয়া দিগন্ত : ব্রুটাল মেজরিটি বা জনগণের সমর্থনের কথা বলে যদি সরকার তার মতো করে সংস্কার করে, রাষ্ট্রের পুরনো কাঠামো অবশিষ্ট রেখে।
রুবি আমাতুল্লাহ : জনগণ সোচ্চার না হলে, সঙ্ঘবদ্ধ না হলে, জনগণের কাছ থেকে যে একটা ধাক্কা আসে, শান্তিপূর্ণভাবে জনগণ যদি সরকারকে মোকাবেলা না করে, সিভিল সোসাইটি, বিশেষ করে বিরোধী দল বিরাট এক ঐতিহাসিক রোল প্লে করছে। বিরোধী দল দায়িত্ব পালন করে জনগণকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও সংস্কার হোক, দলগুলো ভালো পারফর্ম করুক, এটাই জনগণের ইচ্ছা। বিরোধী দল ছাড়া কখনো গণতন্ত্র টিকে থাকে না। টেকসই করা যায় না। ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি আমরা, যারা আমাদের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে জনকল্যাণ করার কথা, একটা সামাজিক চুক্তির মতো তাই ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের রায়কে অবমাননা করার কোনো সুযোগ নাই। যারা এখন বিরোধী দল তারাই এখন জনগণের রায়কে বাস্তবায়নের সংগ্রাম করছে।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু ক্ষমতা অনেক সময় করাপ্ট করে তোলে, দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়, এখানে চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স কিভাবে সম্ভব, বিরোধী দল যদি পাত্তাই না পায়।
রুবি আমাতুল্লাহ : গণতন্ত্রে এটার সুরাহা হচ্ছে সেপারেশন অব পাওয়ার অ্যান্ড লিমিটেশন অব পাওয়ার। আপনি ক্ষমতাকে কখনো আকাশচুম্বী করতে দেবেন না, কোনো দলের কাছে ক্ষমতা যেন কুক্ষিগত হয়ে না পড়ে, বিচার বিভাগকে স্বাধীন করে দেবেন, লেজিসলেচার একটা অর্গ্যান ও নির্বাহী বিভাগ আরেকটা। এরা তিনজন একে অপরকে চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সের মধ্যে রাখবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখবে। ইন্টারনাল চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স ছাড়াও সরকারের সাথে বিরোধী দলের সম্পর্কে ভারসাম্য রাখতে হবে। সরকার যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না। বিরোধী দল তাতে বাধা দেবে, কথা বলবে। এই ভারসাম্যে জনগণের একটা সংযোগ রাখতে হবে। যতক্ষণ জনগণ অ্যাক্টিভ না থাকে, ওয়াকিবহাল না থাকে, সোচ্চার না হয় তাহলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা যায় না। জনগণকে সোচ্চার রাখাই সিভিল সোসাইটির কাজ।
নয়া দিগন্ত : সরকারে যে দল থাকে সেই দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরও তো একটা ভূমিকা থাকে? যাতে গণতন্ত্রের ভেতরে থেকেও কেউ বা কোনো দল কিলার অব ডেমোক্র্যাসি বা গণতন্ত্র হন্তারক না হয়ে ওঠে, অতীতে তো এমন নজির দেখেছি ।
রুবি আমাতুল্লাহ : রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের ক্ষমতায়িত পিরামিড অব স্ট্রাকচার। দলের ভেতরে থেকেও আইনবিরোধী বা জনবিরোধী কাজকে সমর্থন না দিয়ে সমালোচনার সুযোগ নেয়া প্রয়োজন। সংস্কার আগে হলে এসব সমস্যা ফেস করতে হতো না কারণ সংসদে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ সদস্য ফ্লোর ক্রস করতে না পেরে সে তার নিজ দলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। নির্বাচনী এলাকায় সে যে ম্যান্ডেট পেয়েছে তা সে দলের ভেতরে থেকে অনেক সময় এক্সারসাইজ করতে পারে না। ৭০ অনুচ্ছেদ শর্তসাপেক্ষ করে তোলা হয়েছিল সংস্কারের মধ্যে। ইনফ্যাক্ট সংস্কারগুলো কিন্তু কনস্ট্রাকট্ভি ফোর্সফুল যা রাষ্ট্রকাঠামোকে শক্তিশালী করত। এখন সংস্কার দ্রুত না করে কাঠামোকেই নড়বড়ে করে দেয়া হলো। একটা রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ সবাই সংস্কার নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং হতবাক। জনগণ ভাবছে সরকারকে এত ক্ষমতা দিলাম আর ক্ষমতায় গিয়েই আমাদের অপমান করছে। বিশেষজ্ঞরা চিন্তা করছে অঙ্গীকার, জুলাই সনদে স্বাক্ষর, গণভোটকে আমন্ত্রণ জানানোর পর গণরায়কে কিভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : জনগণতো বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে সরকারকে।
রুবি আমাতুল্লাহ : রাজনৈতিক শক্তি যদি নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের ম্যান্ডেটকে তোয়াক্কা না করে তাহলে সে সরকার যেকোনো জিনিস করতে পারে। শঙ্কা রয়েছে, গণভোটের রায়কে যে বাতিল করতে পারবে, ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে পারবে, সে ধাক্কা মেরে অনেক কিছুই ফেলে দিতে পারবে।
নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিক সঙ্কট ছাড়াও তো ভূকৌশলগত একট জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সঙ্কট অর্থনীতিতে সবধরনের সঙ্কট টেনে আনছে, রাজনীতিবিদদের কী ধরনের প্রস্তুতি থাকার দরকার।
রুবি আমাতুল্লাহ : ভূরাজনীতিকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারি না। ইরানে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব আমাদেরও ওপর পড়ছে। বিশ্বের শতাধিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা যৌথ ঘোষণায় বলেছে এ যুদ্ধ বিনা উসকানিতে আগ্রাসন। আগ্রাসনটা করেছে আমেরিকা ও ইসরাইল। অথচ বলা হচ্ছে ইরান সন্ত্রাসী দেশ। সারা বিশ্ববাসী দেখছে ইরানের ওপর কী অন্যায় হচ্ছে, ইরান কতবার শান্তিপূর্ণভাবে চুক্তি করার চেষ্টা করেছে, অতীতেও চুক্তি করেছে, সেই চুক্তি থেকে আমেরিকা একতরফা বের হয়ে গেছে। এবারো আলোচনার মধ্যে ইরানে আঘাত হানা হয়েছে, কোনো দেশের সামরিক শক্তিকে আত্মসমর্পণ করতে বলা, কোনো ক্ষেপণাস্ত্র না রাখা এমন শর্ত জুড়ে দেয়া যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত। একটা স্বতন্ত্র দেশকে বলবেন যথাযথ প্রতিরক্ষা বাহিনী রাখা যাবে না, এটা দেশটির সার্বভৌমত্বে সরাসরি আঘাত। এখন ভূকৌশলগত অবস্থানের সাথে প্রতিটি দেশ এতটাই ইন্টারকানেক্টেড যে রাজনীতিবিদদেরও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক রাজনীতিবিদ তাই তাদের বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানতে হবে।



