নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামীকাল ১৮ এপ্রিল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে ধাপে ধাপে গণমিছিলসহ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে জোটের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই ঘোষণা দেয়া হয়। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে পরবর্তী আন্দোলনের রোডম্যাপ দেয় ১১ দলীয় ঐক্য।
ব্রিফিংয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী ১৮ এপ্রিল রাজধানীতে গণমিছিল। ২৫ এপ্রিল রাজধানী বাদে অন্য সব মহানগরীতে গণমিছিল। ২ মে সব জেলা শহরে গণমিছিল। ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত সারা দেশে লিফলেট বিতরণ এবং মহানগর ও জেলা শহরগুলোতে সেমিনার আয়োজন করা হবে। পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে সব বিভাগে জনসভা করা হবে। এর মধ্যে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে ঢাকায় মহাসমাবেশ করা হবে বলে জানানো হয়।
ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। গণভোটের মাধ্যমে পাঁচ কোটি মানুষ বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্য দিয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে দলীয়করণ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত এবং একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব থেকে দেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। আমরা এখন বেদনার সাথে দেখতে পাচ্ছি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সরকার তা থেকে ইউটার্ন করে নানান অজুহাত তুলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করে গুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।’
তিনি আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। দেড় লাখের মতো হামের রোগী সঙ্কটজনক অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দেশে তেলের সঙ্কট চললেও পার্লামেন্টে বলা হয় তেলের কোনো সঙ্কট নেই। চাঁদাবাজি, দখলদারি ও আগের মতো কর্তৃত্ববাদী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংক খাত ধ্বংসের মুখে পড়ে গেছে; এক-দেড় মাসের মধ্যে একটি দেশের সরকার ৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার মতো নজির আর নেই। ব্যাংকের দায়িত্ব একজন সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, ফলে আমানতকারীরা তাদের আমানতের দাবিতে রাস্তায় নামছেন ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। দেশকে দলীয়করণের লক্ষ্যে প্রশাসনকে কুক্ষিগত করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজ দলীয় লোক বসানো হচ্ছে। এত রক্ত দেয়ার পরও জাতিকে আবার সেই আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘জ্বালানি সঙ্কট থাকলেও জ্বালানিমন্ত্রী হাস্যকরভাবে বলছেন দেশে কোনো জ্বালানি সঙ্কট নেই। পেট্রলপাম্পগুলোতে তেলের জন্য গাড়ির দীর্ঘ লাইন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা তেল পাচ্ছেন না। এমনকি সংসদ সদস্যরা তেল না পেয়ে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সারসঙ্কট জ্বালানি থেকেই তৈরি হচ্ছে। আসন্ন বোরো মৌসুমে জ্বালানির প্রয়োজন।’
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেয়া, আইনের রূপান্তর করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, সংবিধান সংস্কার কমিশনের অধিবেশন ডাকা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরো বলেন, ‘সরকার বলছে বিরোধী দল নিজের মতো করে করছে। আমরাও বলি আমরা আমাদের মতো করে করছি। জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে যেগুলো ওই কমিশনে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে এবং গণভোট যা অনুমোদিত হয়ে আছে এটাই আমাদের কর্মসূচি। জনগণের গণভোটের যে সুফল রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে চাই। সরকার গণভোটের রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছে যার সাথে জনমতের কোনো সম্পর্ক নেই।’
সরকার আন্দোলনকে জনগণকে সাথে নিয়ে মোকাবেলার যে ঘোষণা দিয়েছে, তার উত্তরে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে নিয়মতান্ত্রিক, গঠনমূলক আন্দোলন বিরোধী দল করবে। কিন্তু সরকারি দলের মোকাবেলার ভাষার মধ্যে ফ্যাসিবাদী ভাষার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। তাদের মোকাবেলার অর্থ যদি হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনী, রাষ্ট্রীয় শক্তি এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা লাঠি-অস্ত্র ও বুলেট দিয়ে জনগণের আন্দোলনকে মোকাবেলা করা, তবে তারা চরম ভুল করবেন। তাদের ২৪-এর অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। পুলিশ, র্যাব বা কোনো বাহিনী দিয়ে জনগণের ন্যায্য আন্দোলনকে থামানো যায় না।’
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের বক্তব্য আর বাস্তবতার কোনো মিল নেই। আমরা দেখছি হামের টিকার অভাবে অনেক শিশু মারা যায়, অথচ সরকার সংসদে বলছে সব ঠিক আছে। সংসদে সরকার বলে জ্বালানির কোনো সমস্যা নেই কিন্তু বাস্তবে দেখি দেশে জ্বালানির জন্য হাহাকার, পাম্পে শত শত গাড়ি। সরকারের প্রতিটি বক্তব্য প্রতারণার শামিল।’
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সারসঙ্কট, জ্বালানি সঙ্কট ও দেশকে দলীয়করণের মতো নির্লজ্জ কাজের জোগান দিয়েছে বর্তমান সরকার। সরকারের পদক্ষেপে স্বাস্থ্য খাতের নৈরাজ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলীয়করণ এবং ব্যাংক খাতে নৈরাজ্য চলছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জনদাবি মেনে নেয়ার লক্ষ্যে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীর বিক্রম, মাওলানা মামুনুল হক, ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, আবদুল মাজেদ আতহারী, মুফতি মুসা বিন ইযহার, ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, নিজামুল ইসলাম নাঈম এবং মোবারক হোসাইন প্রমুখ।



