ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক নবায়নের লোকজ উৎসব

লোহাগাড়ায় এখনো টিকে আছে হালখাতা

Printed Edition
ক্রেতাদের লিস্ট করছেন এক ব্যবসায়ী	:  নয়া দিগন্ত
ক্রেতাদের লিস্ট করছেন এক ব্যবসায়ী : নয়া দিগন্ত

শরিফুজ্জামান, লোহাগড়া (নড়াইল)

পয়লা বৈশাখ মানেই নতুনের আহ্বান। আর এই নতুনের উৎসবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ‘হাল খাতা’। এক সময় বাংলা নববর্ষের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল এই হাল খাতা, যা শুধু হিসাবের খাতাই নয়- ব্যবসায়ী ও ক্রেতার সম্পর্ক নবায়নের এক অনন্য আর্থ-সামাজিক লোকজ উৎসব।

‘হাল খাতা’ শব্দটির উৎপত্তি ফারসি ভাষা থেকে। ‘হাল’ অর্থ নতুন এবং ‘খাতা’ অর্থ হিসাবের বই। অর্থাৎ পুরনো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে নতুন খাতা খোলার মধ্য দিয়েই শুরু হতো ব্যবসার নতুন যাত্রা। লাল সালু কাপড়ে মোড়ানো খাতার পাতায় সযতেœ লেখা থাকত জমা ও খরচের হিসাব- যা ছিল ব্যবসার পাশাপাশি পারস্পরিক বিশ্বাসেরও প্রতীক।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন মূলত খাজনা আদায়কে সুশৃঙ্খল করতে। সেই সময় জমিদারদের ‘পুণ্যাহ’ নামে একটি বিশেষ আয়োজন ছিল, যেখানে প্রজারা বছরের প্রথম দিনে খাজনা পরিশোধ করতেন এবং বিনিময়ে পেতেন আপ্যায়ন। এই প্রথা থেকেই পরবর্তীতে ব্যবসায়িক হাল খাতার ধারণার বিকাশ ঘটে। সময়ের পরিক্রমায় জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও হাল খাতা টিকে আছে নিজস্ব ঐতিহ্যে। এক সময় দোকানিরা নববর্ষ উপলক্ষে নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে ক্রেতাদের দাওয়াত দিতেন। সাজানো হতো দোকান, পরিবেশন করা হতো শরবত, মিষ্টি ও পান। এটি শুধু হিসাব মেটানোর অনুষ্ঠানই ছিল না, বরং সামাজিক বন্ধন আরো দৃঢ় করার একটি উপলক্ষ। ধর্মীয় ভিন্নতা থাকলেও হাল খাতার উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন। মুসলিম ব্যবসায়ীরা নতুন খাতার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখে দোয়া ও মিলাদ করতেন, আর হিন্দু ব্যবসায়ীরা গণেশ ও লক্ষ্মী পূজার মাধ্যমে নতুন হিসাব শুরু করতেন। লক্ষ্য ছিল একটাই- নতুন বছরে সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা।

ডিজিটাল যুগে কাগজের খাতার ব্যবহার কমে এলেও হাল খাতার চর্চা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন লেনদেনের প্রসারে এর রূপ কিছুটা বদলালেও অনেক এলাকায় এখনো ঐতিহ্যটি টিকে আছে। কোথাও এটি আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ, আবার কোথাও প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবে নড়াইল জেলার লোহাগড়া বাজারে হাল খাতা এখনো প্রাণবন্ত এক লোকজ উৎসব হিসেবে টিকে আছে। নবগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে প্রতি বছরই হাল খাতাকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই নিমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন ক্রেতা কিংবা পাওনাদারদের কাছে। নববর্ষের দ্বিতীয় দিনে মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের নবায়ন ঘটে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে।

গত মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) সকাল থেকেই লোহাগড়া বাজারে হাল খাতাকে ঘিরে দেখা যায় উৎসবের আমেজ। শত শত মানুষের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাজার এলাকা। বিশেষ করে স্বর্ণপট্টিতে নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দোকানগুলো রঙিন সাজে সজ্জিত হয়ে ওঠে, যা উৎসবের আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নির্মল পোদ্দার কালু বলেন, ব্যবসায়িক নিয়ম মেনে প্রতি বছরের মতো এবারও হাল খাতা পালন করছি। লোহাগড়ায় এটি একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

জননী জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী বিকাশ কর্মকার জানান, আমরা বংশ পরম্পরায় এই উৎসব পালন করে আসছি। হাল খাতা মানুষে মানুষে সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করে। স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রভাষক রূপক মুখার্জি বলেন, হাল খাতা আমাদের ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির অংশ। এই উৎসব টিকিয়ে রাখতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।