মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
জন ডানের ‘দ্য গুড মরো’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটি কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার অতীত জীবনের অজ্ঞতার রূপক নয়; এটি সামগ্রিকভাবে মানবজাতির রাজনৈতিক ও আত্মিক অজ্ঞতারও এক শক্তিশালী রূপক। ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বৈরতন্ত্রের আস্ফালন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। যারা সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং স্রষ্টার ওপর ভরসা করে জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, চূড়ান্ত বিজয় তাদেরই হয়
সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধিবিদ্যক (গবঃধঢ়যুংরপধষ) কবি জন ডান তার বিখ্যাত ‘দ্য গুড মরো’ (ঞযব এড়ড়ফ গড়ৎৎড়)ি কবিতায় প্রেম এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। মানবাত্মার জাগরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব এবং পুরাণের নানাবিধ রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং গভীর অর্থবহ রূপকটি হলো ‘সেভেন স্লিপারস ডেন’ (ঝবাবহ ঝষববঢ়বৎং' ফবহ) বা সপ্ত-নিদ্রিতের গুহা। ডান এই মিথ বা উপাখ্যানটিকে প্রেমের আলোকে অজ্ঞতা থেকে পূর্ণতার দিকে যাত্রার রূপক হিসেবে ব্যবহার করলেও, এই উপাখ্যানের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি অত্যন্ত সুগভীর। খ্রিষ্টীয় ইতিহাস এবং পবিত্র কুরআনের সূরা কাহাফে বর্ণিত এই ঘটনাটি নিছক কোনো অলৌকিক কল্পকাহিনি নয়; বরং এটি হলো এক নির্মম স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গুটিকয়েক সত্যনিষ্ঠ তরুণের আদর্শিক লড়াই, ঐশী সুরক্ষা এবং স্বৈরতন্ত্রের অনিবার্য পতনের এক শাশ্বত বয়ান। যখন সাধারণ জনগণ স্বৈরশাসকের নিপীড়ন ও মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, তখন কিভাবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ স্রষ্টার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়, এটি তারই এক তাত্ত্বিক ও দার্শনিক আখ্যান।
জন ডান সপ্তদশ শতাব্দীর অধিবিদ্যক কাব্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তার কবিতায় দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী বিষয়ের মধ্যে অপ্রত্যাশিত এবং চমকপ্রদ তুলনার (ঈড়হপবরঃ) ব্যবহার অত্যন্ত সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য। ডান তার বিখ্যাত ‘দ্য গুড মরো’ কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রকৃত প্রেমের সন্ধান পাওয়ার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী জীবনের একটি তুলনামূলক চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। প্রেমের এই জাগরণকে তিনি নিছক কোনো আবেগ হিসেবে না দেখিয়ে একে আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কবিতার প্রথম স্তবকেই তিনি প্রবল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন যে, প্রকৃত প্রেমে পড়ার আগে তাদের জীবন কতটা অর্থহীন এবং সুপ্ত অবস্থায় ছিল। ডান লিখেছেন, ‘আমি অবাক হই, সত্যি বলছি,/ তুমি আর আমি কী করতাম, যতদিন না আমরা ভালোবেসেছিলাম?/ আমরা কি ততদিন মায়ের দুধ ছাড়িনি?/ নাকি গ্রাম্য আনন্দে শিশুর মতো মগ্ন ছিলাম?/ অথবা আমরা কি সপ্ত-নিদ্রিতের গুহায় নাক ডাকছিলাম? এখানে মায়ের দুধ না ছাড়া এবং গ্রাম্য আনন্দ শব্দবন্ধের মাধ্যমে কবি মূলত জাগতিক, শারীরিক ও অপরিণত বাসনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা এক প্রকার আধ্যাত্মিক অন্ধত্বকে নির্দেশ করে। এরপরই ডান সপ্ত-নিদ্রিতের গুহার রূপকটি ব্যবহার করেছেন এক দীর্ঘ, অচেতন এবং অর্থহীন ঘুম বোঝাতে। প্রকৃত প্রেমের আলো পাওয়ার আগে প্রেমিক যুগলের জীবন ছিল ঠিক সেই গুহায় ঘুমন্ত সাত তরুণের মতো, যারা বাইরের জগতের সমস্ত কোলাহল, পরিবর্তন এবং বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। ডানের দর্শনে, প্রেম হলো একটি পরাবাস্তব জাগরণ (ঞৎধহংপবহফবহঃধষ ধধিশবহরহম)। এই জাগরণ প্রেমিক-প্রেমিকাকে সাধারণ স্থান-কালের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়। তবে ডানের এই রোমান্টিক এবং অধিবিদ্যক চিন্তার বাইরেও এই উপাখ্যানের একটি বিশাল রাজনৈতিক এবং প্রতিরোধমূলক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক দলিল। ডান যেখানে ব্যক্তিগত চেতনার জাগরণকে নির্দেশ করেছেন, ধর্মতত্ত্ব এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেখানে সামষ্টিক এবং কাঠামোগত আধিপত্যের (ঝঃৎঁপঃঁৎধষ যবমবসড়হু) পতনকে নির্দেশ করে।
বাইবেলের ঐতিহ্য এবং প্রারম্ভিক খ্রিষ্টীয় ইতিহাস ঘাঁটলে ‘সপ্ত-নিদ্রিত’ বা সেভেন স্লিপারস অব ইফেসাস-এর ঘটনার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, ঘটনাটি ঘটেছিল ২৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে, যখন রোমান সম্রাট ডেসিয়াস (ঊসঢ়বৎড়ৎ উবপরঁং) ক্ষমতায় ছিলেন। ডেসিয়াস ছিলেন একজন চরম স্বৈরাচারী শাসক, যিনি সমগ্র সাম্রাজ্যে রোমান দেব-দেবীদের উপাসনা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। তার এই আদেশের মূল উদ্দেশ্য কেবল ধর্মীয় ছিল না, বরং এটি ছিল নিরঙ্কুশ আনুগত্য আদায়ের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। যারা এই আদেশ অমান্য করত, তাদের ওপর নেমে আসত নির্মম নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড। ইফেসাস নামক স্থানে সাতজন তরুণ ছিলেন, যারা সম্রাট ডেসিয়াসের এই অন্যায্য ও স্বৈরতান্ত্রিক আদেশের কাছে মাথানত করতে অস্বীকৃতি জানান। তারা একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং মূর্তিপূজার মাধ্যমে স্বৈরশাসকের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন। যখন সম্রাট তাদের বিশ্বাস পরিবর্তনের জন্য সময় বেঁধে দেন, তখন তারা নিজেদের ঈমান এবং আদর্শ রক্ষার জন্য শহরের কোলাহল ছেড়ে একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। সম্রাট ডেসিয়াস যখন জানতে পারেন যে এই তরুণরা গুহায় লুকিয়ে আছে, তখন তিনি নির্দেশ দেন গুহার মুখ পাথর দিয়ে চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার, যাতে তারা ভেতরেই অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু স্রষ্টার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। এই তরুণরা গুহার ভেতর এক অলৌকিক এবং গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রায় ৩০০ বছর পর, যখন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টধর্ম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং ডেসিয়াসের মতো স্বৈরশাসকদের পতন ঘটে গেছে, তখন সেই গুহার মুখ উন্মুক্ত হয় এবং তরুণরা জাগ্রত হন।
পবিত্র কুরআনের ১৮তম সূরা ‘সূরা আল-কাহফ’-এ (গুহাবাসী) এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও তাত্ত্বিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে এই তরুণদের ‘আসহাবুল কাহফ’ বলা হয়। কুরআনের বর্ণনায় এই তরুণদের নির্দিষ্ট সংখ্যা বা নাম উল্লেখ করার চেয়ে তাদের আদর্শিক লড়াইয়ের উদ্দেশ্য এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কুরআন তাদের ‘ফিতইয়াহ’ (সাহসী তরুণ) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আরবি ভাষায় ফিতইয়াহ শব্দটি কেবল বয়সের দিক থেকে তরুণ বোঝায় না; বরং এটি নৈতিক সাহসিকতা, প্রচলিত ভ্রান্ত কাঠামোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং সত্যের প্রতি অবিচলতাকে নির্দেশ করে। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে যখন বয়োজ্যেষ্ঠরা ভয় কিংবা স্বার্থের কারণে আপসকামিতার পথ বেছে নেয়, তখন এই তরুণেরাই তাদের রবের প্রতি নিখাদ ঈমান এনেছিল এবং প্রথাগত দাসত্বকে (ঞৎধফরঃরড়হধষ ংবৎারঃঁফব) অস্বীকার করেছিল। তৎকালীন স্বৈরশাসক দাকিয়ানুস বা ডেসিয়াস যখন নিজ জনগণকে মূর্তিপূজা ও শিরকে বাধ্য করছিল, তখন সেটি কেবল একটি ধর্মীয় বিষয় ছিল না; এটি ছিল মূলত নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক আনুগত্য আদায়ের একটি হাতিয়ার। স্বৈরশাসকরা সবসময় নিজেদের ঈশ্বরতুল্য বা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করে। এই তরুণরা যখন সমাজের এই আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারলেন, তখন তারা প্রকাশ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘আমাদের রব তো তিনি, যিনি আসমান ও জমিনের রব। আমরা কখনোই তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকব না।’ ইসলামী দর্শনে একত্ববাদের এই ঘোষণা মূলত যেকোনো মানবসৃষ্ট স্বৈরতন্ত্র, অবিচার এবং কাঠামোগত আধিপত্যকে অস্বীকার করার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার। রাষ্ট্রের চরম নিপীড়নের মুখে তরুণরা যখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গুহায় আশ্রয় নেন, তখন মহান আল্লাহ তাদের কান কয়েক বছরের জন্য বন্ধ করে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে দেন। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রোপাগান্ডা বা মিথ্যা প্রচারণার মূল লক্ষ্য থাকে মানুষের শ্রবণ ও চিন্তাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। কান বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে স্রষ্টা মূলত তাদেরকে তৎকালীন স্বৈরশাসকের বিষাক্ত প্রচারণা ও সমাজের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত (ওহংঁষধঃবফ) করেছিলেন। এর সঙ্গে তাদের একটি কুকুরও ছিল, যে গুহার প্রবেশপথে পাহারারত অবস্থায় ছিল। কুরআনের এই বর্ণনা কেবল একটি অলৌকিক কাহিনী বা মিথ নয়; বরং এটি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
(জবংরংঃধহপব) এবং হিজরতের (গরমৎধঃরড়হ) এক নিখুঁত রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক রূপক। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র সমস্ত নাগরিক অধিকার হরণ করে এবং সত্য চর্চার পথ রুদ্ধ করে দেয়, তখন সাময়িকভাবে পিছু হটা বা আত্মগোপন করা বৃহত্তর বিজয়ের একটি কৌশলগত ধাপ (ঝঃৎধঃবমরপ ৎবঃৎবধঃ)। সপ্ত-নিদ্রিতের ঘটনাটি আমাদের স্বৈরতন্ত্রের প্রকৃতি এবং সাধারণ জনগণের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে এক গভীর শিক্ষাদান করে। একজন স্বৈরশাসক কীভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকে এবং কেন সাধারণ জনগণ তার নিপীড়ন বছরের পর বছর সহ্য করে, তা নিয়ে ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক এতিয়েন দ্য লা বোয়েতি তার স্বেচ্ছাধীন দাসত্বের সন্দর্ভে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন- কেন হাজার হাজার মানুষ একজন মাত্র স্বৈরশাসকের দ্বারা নিপীড়িত হয় এবং তা নীরবে মেনে নেয়? লা বোয়েতির মতে, স্বৈরশাসকের নিজের কোনো অতিমানবিক শক্তি নেই; সে মূলত জনগণের সম্মতি, অভ্যাস এবং ভয়ের ওপর ভর করেই টিকে থাকে। জনগণ যখন সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় এবং সাময়িক নিরাপত্তার লোভে অন্যায়ের সাথে আপস করে, তখন তারা নিজেরাই নিজেদের দাসত্বের শৃঙ্খল তৈরি করে। ইফেসাস নগরীর সাধারণ জনগণের অবস্থাও ছিল ঠিক এমন রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অন্ধত্বের শিকার। ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি যাকে বলেছেন, ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (ঈঁষঃঁৎধষ ঐবমবসড়হু), ডেসিয়াস সমাজকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ঠিক সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছিলেন। তিনি কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেননি, বরং রাষ্ট্রের একটি সুদৃঢ় আদর্শিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে সম্রাটের আদেশ পালন করাকেই সর্বোচ্চ নৈতিকতা এবং দেশপ্রেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। সাধারণ জনগণ এই ‘মিথ্যা চেতনা’ (ঋধষংব পড়হংপরড়ঁংহবংং) দ্বারা এমনভাবে মগজধোলাইয়ের শিকার হয়েছিল যে, তারা সত্যকে চিনতে পারেনি। আর এখানেই ইফেসাসের সাধারণ জনগণের সাথে সপ্ত-নিদ্রিত তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তরুণরা সেই আধিপত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন। যখন সমাজের বৃহত্তর অংশ এই সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা নানা সময়ে স্বৈরশাসকদের হাতে নিপীড়িত হতে বাধ্য হয়। দার্শনিক হান্নাহ আরেন্ট তার সর্বাত্মকবাদ (ঞড়ঃধষরঃধৎরধহরংস) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, স্বৈরাচারী শাসকরা সমাজকে এতটাই পরমাণুকৃত (অঃড়সরুবফ) করে দেয় যে, মানুষ আর একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না এবং সামষ্টিক প্রতিরোধের সমস্ত ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই নীরবতা এবং সত্য অনুধাবনের ব্যর্থতার কারণেই সাধারণ মানুষ যুগে যুগে শোষিত হয়। যতদিন না তারা তাদের অজ্ঞতার ঘুম থেকে জেগে উঠছে, ততদিন সমাজে স্বৈরশাসকের শোষণ চলতেই থাকে।
তবে সপ্ত-নিদ্রিতের কাহিনির সবচেয়ে বড় দার্শনিক বার্তা হলো- স্বৈরশাসন যতই দীর্ঘস্থায়ী বা শক্তিশালী মনে হোক না কেন, তার পতন অনিবার্য। জার্মান দার্শনিক হেগেল ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক (উরধষবপঃরপধষ) যে রূপরেখা দিয়েছেন, সেখানে দেখানো হয়েছে যে, ইতিহাস সর্বদা স্বাধীনতার দিকে ধাবিত হয়। স্বৈরতন্ত্র হলো সেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একটি সাময়িক বাধা মাত্র। গুহার মুখ পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশটি ছিল মূলত সত্যের কণ্ঠকে চিরতরে কবর দেয়ার এক নিষ্ফল রাজনৈতিক চেষ্টা। ইসলামী দর্শন অনুযায়ী, জুলুম বা নিপীড়ন কখনোই চিরস্থায়ী হতে পারে না। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর মতে, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই প্রতিরোধ আছে। সপ্ত-নিদ্রিত তরুণদের গুহায় আত্মগোপন ছিল সেই প্রতিরোধেরই এক চূড়ান্ত রূপ। আল্লাহ যখন সেই তরুণদের ৩০০ বছরেরও বেশি সময় পর ঘুম থেকে জাগ্রত করলেন, তখন এটি সমগ্র মানবজাতির কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিলো যে, সময় এবং ইতিহাসের ওপর কোনো স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণ নেই।
বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতায় ডানের কবিতার প্রেমময় জাগরণকে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় ব্যাখ্যা করা যায়। আজকের বিশ্বেও নানা রূপ ও আবরণে স্বৈরশাসন বিরাজমান। আধুনিক স্বৈরশাসকরা হয়তো রোমান সম্রাট ডেসিয়াসের মতো সরাসরি কোনো প্রস্তরনির্মিত মূর্তিপূজা করতে বলে না, কিন্তু তারা রাষ্ট্রযন্ত্র, গণমাধ্যম এবং প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে জনগণের চিন্তার স্বাধীনতা হরণ করা হয়। নব্য-উদারনৈতিক (ঘবড়ষরনবৎধষ) এই যুগে ক্ষমতা কাঠামোর বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও, জুলুম ও নিয়ন্ত্রণের মূল চরিত্র একই রয়ে গেছে। ডান তার কবিতায় লিখেছেন, ‘কারণ প্রেম, অন্য সব দৃশ্যের প্রতি মোহ নিয়ন্ত্রণ করে।’ আধ্যাত্মিক বা রাজনৈতিক জাগরণের ক্ষেত্রে এই সত্যের প্রতি টান অত্যন্ত জরুরি, যা স্বৈরশাসকের তৈরি করা অন্যান্য সমস্ত মিথ্যা দৃশ্য বা প্রোপাগান্ডার মোহ থেকে মানুষকে মুক্ত করে। ফরাসি দার্শনিক গাই ডেবর্ড যাকে ‘দৃশ্যমানতার সমাজ’ (ঝড়পরবঃু ড়ভ ঃযব ঝঢ়বপঃধপষব) বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিক সেভাবেই মানুষকে মিথ্যা জাঁকজমক ও বিনোদনের মোহে আবদ্ধ রাখে। মিডিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সমাজে মানুষ একপ্রকার ‘সম্মোহনী ঘুমে’ (ঐুঢ়হড়ঃরপ ংষববঢ়) আচ্ছন্ন থাকে। তারা বুঝতে পারে না কিভাবে ধীরে ধীরে তাদের মৌলিক অধিকার হরণ করে তাদের সম্মতি উৎপাদন (গধহঁভধপঃঁৎরহম পড়হংবহঃ) করা হচ্ছে। ডান কবিতায় আরো বলেছেন, ‘আর একটি ছোট্ট কামরাকেই করে তোলে অনন্ত বিশ্ব।’ সপ্ত-নিদ্রিত তরুণদের জন্য সেই অন্ধকার গুহাটিই হয়ে উঠেছিল ঈমান ও স্বাধীনতার এক অনন্ত বিশ্ব। আধুনিক যুগেও স্বৈরাচারীর কারাগারে বন্দী কোনো সত্যনিষ্ঠ বিপ্লবীর ছোট প্রকোষ্ঠটি এই রূপকের দাবিদার হতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের শেকল আত্মার মুক্তিকে আটকাতে পারে না।
জন ডানের ‘দ্য গুড মরো’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটি কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার অতীত জীবনের অজ্ঞতার রূপক নয়; এটি সামগ্রিকভাবে মানবজাতির রাজনৈতিক ও আত্মিক অজ্ঞতারও এক শক্তিশালী রূপক। ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বৈরতন্ত্রের আস্ফালন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। যারা সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং স্রষ্টার ওপর ভরসা করে জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, চূড়ান্ত বিজয় তাদেরই হয়। সাধারণ মানুষের নীরবতা ও অজ্ঞতা সাময়িকভাবে স্বৈরশাসককে শক্তিশালী করলেও, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এবং ঐশী হস্তক্ষেপে স্বৈরাচারের পতন ঘটতে বাধ্য। ঘুমন্ত তরুণদের সেই ঐতিহাসিক জাগরণ মূলত বিশ্ববিবেকের সেই শাশ্বত জাগরণকেই নির্দেশ করে, যা সমাজের সব অন্ধকার, ভয় ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের এক নতুন ভোরের সূর্যোদয় নিশ্চিত করে।



