এমডি-চেয়ারম্যান নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা পুরনো লুটেরাদের ফেরার গুঞ্জনে উদ্বেগ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থবিরতা

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে এক ধরনের গভীর স্থবিরতা নেমে এসেছে। পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা এখন অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে আটকে আছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর বহু প্রার্থী আবেদন করার পর প্রায় এক মাস পার হতে চললেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। একই সাথে চেয়ারম্যান পদ শূন্য থাকলেও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং আমানত ফেরত কার্যক্রম- সবই যেন ঝুলে আছে।

এ দিকে সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬-এর ১৮ক ধারা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, এই ধারার সুযোগে পূর্বে অভিযুক্ত মালিকগোষ্ঠী- বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ আবারো ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসতে পারে। এই আশঙ্কা আমানতকারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এমডি পদে নিয়োগের জন্য আবেদনপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৫ মার্চ। দেশের ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ অনেক কর্মকর্তা ও সাবেক এমডিরা এ পদে আবেদন করেছেন। কিন্তু প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও কোনো শর্টলিস্ট, সাক্ষাৎকার বা নিয়োগ বোর্ডের বৈঠকের খবর পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ব্যাংকের জন্য শক্তিশালী নেতৃত্ব এখন সবচেয়ে জরুরি। অথচ এমডি ও চেয়ারম্যান- দুই গুরুত্বপূর্ণ পদই কার্যত অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে। একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নতুন ব্যাংককে সচল করতে হলে প্রথমেই নেতৃত্বের সঙ্কট কাটাতে হবে। এমডি ও চেয়ারম্যান ছাড়া বড় কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এগোয় না।’ এই দীর্ঘসূত্রতা আমানতকারীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এ দিকে, চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পর নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ না হওয়ায় বোর্ড কার্যত সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছে। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদ মূল্যায়ন, দায়-দেনা সমন্বয় এবং আমানত ফেরত কার্যক্রম গতি পায় না। ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি দিনই গ্রাহকরা শাখাগুলোতে এসে তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত চাইলেও কর্মকর্তারা স্পষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারছেন না। ফলে শাখাগুলোতে গ্রাহকদের চাপ বাড়ছে, আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে গুজব ছড়াচ্ছে ‘ব্যাংকটি আবারো পুরনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে কি না’। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮ক ধারা। নতুন এই বিধান অনুযায়ী, পূর্বের মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা নির্দিষ্ট শর্তে পুনরায় শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরুদ্ধারের আবেদন করতে পারবেন। এতে এই ধারা পূর্বে অভিযুক্ত মালিকদের জন্য ‘ফিরে আসার জানালা’ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি ব্যাংক খাতে সংস্কারের পরিবর্তে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে অতীতে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার ও ব্যাংক দখলের অভিযোগ ছিল। এখন যদি একই গোষ্ঠী আবার ফিরে আসে, তা হলে আমানতকারীদের আস্থা আরো ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যাংকের একাধিক শাখায় গিয়ে দেখা গেছে, সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার ১২ লাখ টাকা আটকে আছে। কয়েক মাস ধরে ব্যাংকে ঘুরছি। এখন শুনছি আবার আগের মালিকরা ফিরতে পারে। তা হলে আমাদের টাকা কি আর ফেরত পাব?’ অবসরপ্রাপ্ত একজন গ্রাহক বলেন, ‘জীবনের সঞ্চয় এই ব্যাংকে রেখেছিলাম ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা রেখে। এখন প্রতি দিন নতুন নতুন খবর শুনে ঘুমাতে পারি না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে কাগজে ব্যাংক থাকলেও বাস্তবে সেটি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এই স্থবিরতা কাটবে কি? এক দিকে নেতৃত্ব শূন্যতা, অন্য দিকে আইনি অনিশ্চয়তা দুইয়ের মধ্যে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে।

যদি দ্রুত এমডি ও চেয়ারম্যান নিয়োগ না হয়, তা হলে আমানত ফেরত কার্যক্রম আরো বিলম্বিত হবে, গ্রাহকদের আস্থা কমবে, নতুন আমানত প্রবাহ বন্ধ হবে, তারল্য সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই স্পষ্ট নীতিগত ঘোষণা প্রয়োজন- ব্যাংকটি কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের রোডম্যাপ কী, এবং ১৮ক ধারার প্রয়োগে কী ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এটি কি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আস্থার ব্যাংক হবে, নাকি আবারো বিতর্কিত মালিকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাবে- সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, লাখো আমানতকারীর সঞ্চয় এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাদের কাছে আইন, বোর্ড বা নিয়োগের জটিলতার চেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই ‘আমাদের টাকা কি নিরাপদ?’ এই প্রশ্নের জবাব যত দেরি হবে, ততই বাড়বে আতঙ্ক, অবিশ্বাস এবং ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা।