অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
প্রায় প্রতিদিনই এক নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার। সকালে সূচকের উন্নতি দিয়ে দিন শুরু করা বাজারগুলো পরে বিক্রয়চাপে পড়ে ধরে রাখতে পারছে না সূচকের উন্নতি। এতে বাজারের স্বাভাবিক আচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের এ ধরনের আচরণকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন, এখন একপ্রকার যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশগুলো। কিন্তু এরই মধ্যে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেল ও রেমিট্যান্সের ওপর দীর্ঘমেয়াদি যে প্রভাব তা পড়তে শুরু করেছে। এগুলোর ইতিবাচক সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক আচরণ আশা করা যায় না।
গতকাল সকালে লেনদেনের শুরুতেই দুই পুঁজিবাজার সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। বেলা ১১টার দিকে ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ৪৬ পয়েন্টের বেশি। আর চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৫০ পয়েন্ট। কিন্তু দিনশেষে ঢাকা শেয়ারবাজারে সূচক টিকে রইল মাত্র ১ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট। আর চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে টিকে থাকল প্রধান সূচকটির মাত্র ৪ দশমিক ৯১ পয়েন্ট। এ ছাড়া দুই বাজারেই বিশেষায়িত সূচকগুলো দিনের শুরুতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটলেও দিনশেষে তার সামান্যই টিকে থাকে।
গতকাল দিনের শুরুতে যেখানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া কোম্পানির ৭২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল, সেখানে দিনশেষে লেনদেনের চিত্র ছিল পুরো উল্টো। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল মাত্র ৩১ শতাংশ কোম্পানি। দরপতনের তালিকায় উঠে আসে ৬৮ শতাংশ।
সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে না পারা গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও প্রভাব ফেলে। ডিএসই গতকাল ৮০৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩০ কোটি টাকা কম। বুধবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৮৩৬ কোটি টাকা। তবে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে এ দিন লেনদেনের উন্নতি ঘটেছে। ৩১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে সিএসই, যা আগের দিন অপেক্ষা আট কোটি টাকা বেশি। বুধবার সিএসইর লেনদেন ছিল ২৩ কোটি টাকা। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনের গতি বাড়বে।
এ দিকে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তিনি বলেন, বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ সুরক্ষা প্রদানে কমিশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
১৫ এপ্রিল বুধবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সাথে পুঁজিবাজারের সব মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সভায় তিনি এ দাবি করেন। বিএসইসির পরিচালক মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, বিএসইসির কমিশনার মু: মোহসিন চৌধুরী, বিএসইসির কমিশনার মো: আলী আকবর, বিএসইসির কমিশনার ফারজানা লালারখ, বিএসইসির কমিশনার মো: সাইফুদ্দিন, সিএফএ এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধির ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিতে কমিশন কাজ করছে। ইস্যু ম্যানেজারদের প্রতি দুই বছর পর অন্তত একটি নতুন কোম্পানি বা আইপিও আবেদন আনতে হবে মর্মে ইস্যু ম্যানেজারদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শর্তে রয়েছে; কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপ্ত যেসব ইস্যু ম্যানেজার বা মার্চেন্ট ব্যাংকার শর্তানুযায়ী ইস্যু আনতে পারেননি তাদেরকে শর্ত পরিপালনের জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করেন তিনি। কমিশন পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানিগুলোর বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করতে যাচ্ছে জানিয়ে এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে, পুঁজিবাজারে নতুন ইস্যুয়ার কোম্পানি তালিকাভুক্তি, ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি, পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানিগুলোয় সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তকরণ, তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান, ইস্যু ম্যানেজারদের কাছে প্রক্রিয়াধীন ইস্যুগুলো, নেগেটিভ ইক্যুইটি ও আনরিয়েলাইজড লসের প্রভিশন সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণ, বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিতকরণ প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভায় ইস্যু ম্যানেজাররা তাদের পাইপলাইনে থাকা প্রক্রিয়াধীন ইস্যুগুলো সম্পর্কে হাল নাগাদ তথ্য তুলে ধরেন এবং শিগগিরই পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি বা আইপিও আনয়নের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ওই সভায় মার্চেন্ট ব্যাংকার্সদের মধ্যে ট্রিপল এ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এ বি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, অ্যাবাসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, অগ্রণী ইক্যুইটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এআইবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, আলফা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, সিম ক্যাপিটাল লিমিটেড, বিডি ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল হোল্ডিংস লিমিটেড, বেটা ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেড, বিএমএসএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেড, সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেড, কমিউনিটি ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ঢাকা ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ইবিএল ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, ইসি সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এক্সিম ইসলামী ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, গ্রিন ডেল্টা ক্যাপিটাল লিমিটেড, জিএসপি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, আইএফআইসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, আইআইডিএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেড, আইএল ক্যাপিটাল লিমিটেড, ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেড, ইসলামী ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, জনতা ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, মেঘনা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, মিডাস ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড, এনবিএল ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডসহ অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।



