নিম্ন আদালতে ৪০ লাখের বেশি মামলার ‘জট’

সংসদে আইনমন্ত্রী

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, তাদের সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির মাধ্যমে কার্যত শাস্তি দেয়া হতো বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টিতে। এই বিশাল মামলার জট দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে কয়েকজন সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

ময়মনসিংহ-৬ আসনের বিরোধী দলের সদস্য (জামায়াতে ইসলামী) মো: কামরুল হাসানের টেবিলে উপস্থাপিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টিতে। এই বিশাল মামলার জট দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। গৃহীত পদক্ষেপগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হলে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংসদকে মো: আসাদুজ্জামান জানান, মামলা নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে ইতোমধ্যে ‘দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এতে এসএমএস ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমনজারি, এফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল এবং সরাসরি জেরা করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিক্রি জারির জন্য পৃথক মামলা দায়ের না করে মূল মামলায় দরখাস্ত দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে ফৌজদারি মামলার অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পলাতক আসামির ক্ষেত্রে প্রক্লামেশন ও এটাচমেন্ট প্রক্রিয়া পরিহারের সুযোগ এবং সমন জারিতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী জানান, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর আওতায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং আসামির জবানবন্দী গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া আরো গতিশীল হচ্ছে।

মামলার জট নিরসনে ইতোমধ্যে ৮৭১টি আদালত এবং ২৩২টি বিচারকের পদ সৃজন করা হয়েছে। আরো ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃজন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সাথে ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলমান। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ৭০৮ জন কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং আরো ৫৫৩ জন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সলিসিটরের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।

এ ছাড়া অধস্তন ও উচ্চ আদালতের কজলিস্ট শতভাগ অনলাইনে আনা হয়েছে, ফলে বিচারপ্রার্থীরা ঘরে বসেই মামলার তারিখ জানতে পারছেন। এতে বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও হয়রানি কমেছে।

আইনমন্ত্রী জানান, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে অনলাইনে নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে জালিয়াতি কমবে এবং এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও হ্রাস পাবে।

স্বাধীনভাবে বিচার করায় আওয়ামী আমলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি : চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, তাদের সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির মাধ্যমে কার্যত শাস্তি দেয়া হতো।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক বাধা না থাকলেও সে সময় বিচারকদের বদলি ও পদায়নে দলীয় আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অনুগত বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হতো এবং যারা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করতেন, তাদের দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হতো। তিনি জানান, বর্তমান সরকার এই ধারা থেকে সরে এসে সততা, দক্ষতা ও বিচারিক আচরণকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে কার্যকর পদক্ষেপ : সংসদ সদস্য মো: মনোয়ার হোসেনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের মামলা প্রত্যাহারে সরকার সম্পূর্ণ সচেতন এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করতে উদ্যোগী। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিল, যার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হত্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। তিনি জানান, চলতি বছরের ৫ মার্চ জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলাপর্যায়ে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ৮ মার্চ আইনমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি প্রাপ্ত সুপারিশ যাচাই-বাছাই করে মামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে রাজনৈতিকভাবে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ডিজিটাল কোর্ট ও বিচারপ্রক্রিয়া আধুনিকীকরণে নানা উদ্যোগ : নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান সংসদকে জানান, ডিজিটাল কোর্ট ব্যবস্থা চালু এবং বিচারপ্রক্রিয়া আধুনিকীকরণে সরকার একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, অনলাইন কজলিস্ট, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের ডিজিটালাইজেশন এবং ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ৯টি জেলায় ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে অনলাইনে বেইলবন্ড দাখিল করা সম্ভব হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিচারপ্রক্রিয়া আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।