শিরীন শারমিনের পর মুক্তির তালিকায় আ’লীগের কারা

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেফতার হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে জামিনে মুক্ত হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- জুলাই গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার তালিকায় শীর্ষ অপরাধী হিসেবে বিবেচনার পরও এত দ্রুত শিরীন শারমিন চৌধুরী কিভাবে জামিনে মুক্তি পেলেন! এর নেপথ্যে কে বা কারা রয়েছে? দেশীয় শক্তি নাকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চাপের মুখে সরকার তাকে জামিন দিয়েছে? যদিও এ জামিনের বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এখনো মুখ খোলেননি। এমন সব প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা চলছে, তা হলো- এর পর মুক্তির তালিকায় আওয়ামী লীগের আর কোন কোন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ রয়েছেন? আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে সরকার কি নমনীয় নাকি কঠোর অবস্থানে রয়েছে- এসব আলোচনাও অনেকটা ডালপালা মেলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের টপ টু বটম আত্মগোপনে চলে যান। পরিস্থিতি বুঝে কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমান আবার কেউ কেউ দেশের মধ্যে অবস্থান করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরই শিক্ষার্থী হত্যা, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিসহ নানা লুটপাট ও কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে পৃথকভাবে গ্রেফতার হন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পতিত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক আইন মন্ত্রী আনিসুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ডা: দীপু মনি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার ও জুনাইদ আহমেদ পলকসহ আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্ব। তাদের বেশির ভাগই কারাগারে রয়েছেন। তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন অন্তত শতাধিক সাবেক এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক ২৮ মন্ত্রী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ১০, সাবেক উপমন্ত্রী ৩, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ৩, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু ও সরকারদলীয় সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। গ্রেফতার হওয়া সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে অন্তত বেশ কয়েকজন পরে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

তথ্য বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গেল ৭ এপ্রিল ধানমন্ডির বাসা থেকে সাবেক স্পিকার ড. শিরীন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার দেখানো হলেও এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনা বেশ রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ৬ অক্টোবর রাজধানীর গুলশান থেকে সাবের হোসেন চৌধুরীকে গেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। গ্রেফতারের পর দিন আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড চলাকালেই তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হলেও জামিনে মুক্ত হওয়ার ঘটনা একেবারে কম ছিল। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর পরই বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক এমপি অধ্যক্ষ শাহ আলম, বরিশাল-৫ আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান মামুনের জামিন লাভের ঘটনায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কক্সবাজারের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকেও একাধিক মামলায় জামিন দেয়ার ঘটনায় জাতীয়ভাবে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ২০ মাসের মাথায় গিয়ে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে হঠাৎ করে গ্রেফতারই বা কেন করা হলো আবার এক সপ্তাহের মধ্যে জামিনই বা কেন দেয়া হলো- এটা একটা রহস্যময় ঘটনা বটে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই পতিত আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে এক প্রকার জামিন লাভের হিড়িকও পড়েছে। এই সূত্র ধরে এখন হয়তো শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই জামিন লাভ করতেও পারেন বলে এমন ধারণা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ইকতেদার আহমেদ মনে করেন, কাউকে জামিন দেয়া না দেয়া এটা আদালতের এখতিয়ার। জামিনযোগ্য অপরাধ হলে আদালত অপরাধীকে জামিন দিয়ে থাকে আবার জামিন অযোগ্য অপরাধ হলে আদালত অপরাধীকে জামিন নাও দিতে পারে। তার মতে, শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যারা জামিন পেয়েছেন তারা হয়তো জামিনযোগ্য ছিলেন তাই দ্রুত জামিন পেয়েছেন। আবার এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে জামিন বাতিলের আবেদন করলে সেখানে হয়তো আদালত সেটিও বিবেচনায় নিতে পারতেন। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সে রকম কিছু ঘটেনি। এক প্রশ্নের জবাবে ইকতেদার আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক চাপে এসব জামিন হয়েছে কি না সেটা বলা মুশকিল। আর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আরো যারা কারাগারে রয়েছেন উনারা যদি জামিনযোগ্য হন তা হলে আদালত চাইলে অবশ্যই জামিন দিতে পারে। আবার সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরাও চাইলে জামিন বাতিলের আবেদন করতে পারেন- এটা তাদের অধিকার।