মেট্রোরেলের ৩ প্রকল্পে বাজেটে প্রয়োজন ১৪ হাজার কোটি টাকা

সবচেয়ে বেশি নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশে

ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনকারী মেগা প্রকল্প মেট্রোরেলের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। চলতি তিনটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১৩ হাজার ৬৫৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ চালু থাকলেও এর কমলাপুর অংশ এবং আরো দুটি নতুন লাইনের কাজ পুরোদমে চলছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের চাহিদাপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনকারী মেগা প্রকল্প মেট্রোরেলের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। চলতি তিনটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১৩ হাজার ৬৫৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ চালু থাকলেও এর কমলাপুর অংশ এবং আরো দুটি নতুন লাইনের কাজ পুরোদমে চলছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের চাহিদাপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এক নজরে ৩ প্রকল্পের আর্থিক চিত্র

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর তথ্য অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-৬ (উত্তরা-কমলাপুর), লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর ও পূর্বাচল) এবং লাইন-৫ নর্দান (হেমায়েতপুর-ভাটারা)- এই তিনটি প্রকল্পের সম্মিলিত প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ৯৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

  • জাইকার ঋণ: ৮৮ হাজার ৭৬৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
  • বাংলাদেশ সরকার (জিওবি): ৩৯ হাজার ১৭০ কোটি ২০ লাখ টাকা।

আগামী এডিপিতে বরাদ্দের চাহিদা

পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ১৩ হাজার ৬৫৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্প সাহায্য (জাইকা) থেকে ১০ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা এবং সরকারি তহবিল থেকে দুই হাজার ৯৯৮ কোটি ১৪ লাখ টাকার জোগান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

১. এমআরটি লাইন-৬ (উত্তরা-কমলাপুর): এই প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করছে। বর্তমানে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অতিরিক্ত ১.১৬ কিলোমিটার সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এই অংশের জন্য আগামী বাজেটে এক হাজার ৮৯৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে বর্তমানে ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি ৭২ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

২. এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর ও পূর্বাচল): দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প হিসেবে পরিচিত এই লাইনের জন্য আগামী এডিপিতে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জাইকার অর্থায়ন ৬ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) এই প্রকল্পের জন্য ৮০১ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

৩. এমআরটি লাইন-৫: নর্দান রুট (হেমায়েতপুর-ভাটারা): হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্পের জন্য আগামী বাজেটে তিন হাজার ৯২১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। জাইকা এখানে তিন হাজার ৪০০ কোটি টাকা দেবে। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্তির লক্ষ্য থাকা এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। চলতি আরএডিপিতে এর বরাদ্দ রয়েছে ৮৬২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

জুন পর্যন্ত ব্যয়ের অগ্রগতি

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, তিনটি প্রকল্পের বিপরীতে গত জুন পর্যন্ত মোট ৩৩ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকাই জাইকার ঋণের অর্থ।

  • লাইন-৬: এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৫ হাজার ৬০৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
  • লাইন-১: ব্যয়ের অগ্রগতি ৩ হাজার ১৭৬ কোটি ৯১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
  • লাইন-৫ নর্দান: খরচের পরিমাণ ৫ হাজার ১১ কোটি ৮৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয় প্রতিবেশী দেশ এবং বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় ঢাকার খরচ প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। নিচে একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

কেন বাংলাদেশের ব্যয় বেশি?

বিশ্লেষক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশের উচ্চ ব্যয়ের পেছনে বেশ কিছু কারিগরি ও অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. উন্নত স্পেসিফিকেশন ও প্রযুক্তি : ঢাকার মেট্রোরেলে জাপানি প্রযুক্তির ‘অ্যাডভান্সড সিগন্যালিং’ এবং ‘এমবেডেড ট্র্যাক সিস্টেম’ (যেমন ছ-ঞৎধপশ) ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি স্টেশনে ডিস্ট্রিবিউটেড সার্ভার এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেফটি সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যা দিল্লি বা লাহোর মেট্রোর তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও ব্যয়বহুল।

২. আমদানি নির্ভরতা : রেললাইন, ট্রান্সফরমার, সিগন্যালিং সিস্টেম এবং কোচ- সবই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে মেট্রোরেল গ্রেডের যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা না থাকায় এবং উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে খরচ বেড়ে যায়।

৩. জমি অধিগ্রহণ ও জটিল অবকাঠামো : ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে অত্যন্ত সরু রাস্তার ওপর দিয়ে কাজ করতে গিয়ে উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ ও ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বহন করতে হয়।

৪. বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও ঋণ শর্ত : জাইকার মতো বিদেশী দাতা সংস্থার শর্তানুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের ঠিকাদার বা পরামর্শক নিয়োগ করতে হয়, যার ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ সীমিত থাকে এবং ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

৫. নির্মাণকাল বৃদ্ধি : প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় শুরুর প্রাক্কলনের চেয়ে চূড়ান্ত ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের গড় বাস্তব অগ্রগতি ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৯৯.৬১ শতাংশ। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ অংশের পূর্ত কাজ ৭৩.২৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।

অন্য দিকে, লাইন-৫ নর্দান রুটের সম্ভাব্যতা যাচাই, বেসিক ডিজাইন এবং ডিটেইল ডিজাইনের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ডিপো নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজও শেষ পর্যায়ে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সময় মতো বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা একটি পূর্ণাঙ্গ মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে, যা নগরীর যানজট নিরসনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।