স্বর্গ থেকে মানব-মানবীর স্বপ্রণোদিত ভুলভ্রান্তির কারণে বিদায় নেয়ার বিষয়টি প্রধান প্রধান ধর্মে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণিত হয়েছে। এর প্রধান ভাষ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :
ইসলাম ধর্ম : পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম মানব আদম আ: ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া আ:-কে জান্নাতে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তাঁদের একটি নির্দিষ্ট গাছের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন; কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তাঁরা সেই গাছ থেকে কিছু খান। ফলে আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘিত হয় এবং তাঁদের পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিছু সময় তাঁরা পরীক্ষার জন্য এখানে থাকবেন। মূলত পৃথিবীটা হচ্ছে মানুষের জন্যে একটি পরীক্ষার স্থান।
খ্রিষ্টধর্ম : বাইবেলের আদি পুস্তক (জেনেসিস) অনুযায়ী, আদম ও ইভ ইডেন উদ্যানে (গার্ডেন অব এডেন) নিষ্পাপ অবস্থায় বাস করতেন। শয়তান সর্পের রূপ ধরে ইভকে ‘ভালো-মন্দের জ্ঞানদায়ক’ গাছের ফল খেতে প্ররোচিত করে। এ অবাধ্যতার ফলে তাঁরা পবিত্রতা হারান এবং ঈশ্বর তাঁদের উদ্যান থেকে বহিষ্কার করেন। খ্রিষ্টীয় তত্ত্বে একে ‘পতন’ (দ্য ফল) বলা হয় এবং মনে করা হয় এর মাধ্যমে মানবজাতির মধ্যে পাপ ও মৃত্যুর প্রবেশ ঘটেছে।
হিন্দুধর্ম : সনাতন ধর্মে আব্রাহামীয় ধর্মগুলোর মতো সরাসরি ‘স্বর্গ থেকে বিতাড়ন’-এর কোনো একক কাহিনী মানুষের আদি উৎস হিসেবে গণ্য হয় না। এখানে সৃষ্টিতত্ত্ব মূলত কর্মফল ও জন্মান্তরবাদের সাথে যুক্ত। তবে পুরাণে পাওয়া যায়, মানুষ তার সুকীর্তির ফলে স্বর্গীয় সুখ ভোগ করে। আর পুণ্য শেষ হলে পুনরায় মর্ত্যে বা পৃথিবীতে ফিরে আসে। অর্থাৎÑ স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসা এখানে কোনো আদি পাপ নয়; বরং কর্মফলের একটি স্বাভাবিক চক্র।
বৌদ্ধধর্ম : বৌদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্বের ‘আগাঞ্জা সুত্ত’ অনুযায়ী, বর্তমান কল্পের শুরুতে মানুষ ছিল উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় সত্তা, যারা আকাশপথে বিচরণ করত; কিন্তু পৃথিবীর সুস্বাদু উপাদানের প্রতি আসক্তি ও লোভ জন্মানোর ফলে তাদের দেহের জ্যোতি হারিয়ে যায় এবং দেহ স্থূল হতে শুরু করে। এ তৃষ্ণা বা আকাক্সক্ষার কারণে তারা স্বর্গীয় অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে জাগতিক মানুষে পরিণত হয় ।
স্বর্গচ্যুৎ মানব-মানবী এখনো স্বপ্রণোদিত ভুলভ্রান্তিতে ভরা পরিবেশ পরিস্থিতিতে বিরাজমান। যেমন যুক্তরাষ্ট্র্র-ইসরাইল গংদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে আজ শুধু ইরান নয়, হরমুজ প্রণালীর ভাটির দেশগুলো তীব্র জ্বালানি সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দোসর ইসরাইলকে সুরক্ষা দিতে এবং তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নিজের ক্ষমতার বলয় বাড়াতে গিয়ে ইরানকে অন্যতম অন্তরায় সাব্যস্ত করেছে। ওই অনুযায়ী ইরানের ছয় হাজার বছরের সভ্যতা গুঁড়িয়ে দিতে এই স্বঘোষিত যুদ্ধে উদ্ধত আস্ফালন দেখাচ্ছে। ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে জোর করে ধরে এনে মার্কিন জেলে ভরা, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, সমরনায়ক, শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে হত্যার যে কার্যক্রম চালাচ্ছে; তা তো যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্রণোদিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম। বিশ্বে মানবাধিকার, আইনের শাসন তথা গণতন্ত্রের ধারক-বাহক প্রবক্তা বলে নিজেদের জাহিরকারীরা আজ নিজেই মানবাধিকার, স্বেচ্ছাচারিতা ও গণতন্ত্র ধ্বংসের উন্মত্ততায়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরানের যুদ্ধ মূলত এবং মুখ্যত তেলের জন্য যুদ্ধ, সাথে কার কাছে মানবসভ্যতা ধ্বংসের সমরাস্ত্র ও টেকনিক জানা আছে তার মহড়া মাত্র। ডোবায় থাকা ব্যাঙদের দিকে ছেলেরা খেলার ছলে ঢিল ছুড়ছিল তখন একা ব্যাঙ সাহস করে ছেলেদের বলেছিল ‘তোমাদের জন্য যা খেলা আমাদের জন্য তা মৃত্যুর কারণ।’ স্বপ্রণোদিত সমরে প্রাণ যাওয়ার জোগাড় বিশ্ব-অর্থনীতির। এ সুবাদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ বাংলাদেশে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সঙ্গত কারণে দেশটির স্বপ্রণোদিত সমস্যার স্বরূপ বিশ্লেষণের তাগিদও উঠে আসছে। স্্েরফ গোষ্ঠীগত স্বার্থে বাংলাদেশ নিজেদের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কাজ স্থগিত রেখে, ব্রুনাই থেকে তেল-গ্যাস পাওয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ে দু-দুটো সম্মত যুক্ত বিবৃতি (২০১৯ এবং ২০২২ সালে দুই সরকারপ্রধানের পারস্পরিক সফরকালে ঘোষিত) থাকার পরও কাতার থেকে এলএনজি কেনার ব্যবসায় কেন মেতেছিল তৎকালীন সরকার। কেন প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ক্রয়চুক্তি করা হয়েছিল। কেন ক্রয়-বিক্রয়ের সব বিধিবদ্ধ নীতিমালা অনুসরণ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনের কাজ দিয়ে নিয়ে নিজেদের কতিপয়ের টাকা বাগানোর সুযোগ করে দিয়েছে। এর উত্তর খোঁজা এই মুহূর্তে জরুরি। কেননা, এসব স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ এখন আত্মঘাতী বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে আজ জ্বালানি তেলের নাভিশ্বাস পরিস্থিতি। সেই সাথে চোখে সরষের ফুল দর্শন। যেমন করোনার সময় টিকা কেনার বাহানায় কয়েক হাজার কোটি টাকা, যেমন অযাচিতভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে লক্ষকোটি টাকা ব্যয়ের সুযোগ তৈরিÑ সবছিল স্বপ্রণোদিত সমস্যার সূত্রপাত।
আগের পতিত এবং সদ্য বিদায়ী শাসনামলে হাম, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ প্রতিষেধকের নিয়মিত কর্মকাণ্ড উপেক্ষাও ছিল স্বপ্রণোদিত সমস্যার উদগাতা। গত শুক্রবার সরকারের বাণিজ্য সচিব ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। প্রতিদিন হামে অসংখ্য শিশুর মৃত্যু ঘটছে। হাজার হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে কাতরাচ্ছে। হামের ডামাডোলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা চাপা পড়ে যাচ্ছে। এসবই স্বপ্রণোদিত ভুলভ্রান্তির কার্যকারণ। যেমনÑ ম্যানিলায় মার্কোসের আদলে, পেরুতে ফুজিমোরি, রোমানিয়ায় চচেস্কু, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ ধরনের স্বপ্রণোদিত স্বৈরশাসকের নাম নেয়ায় স্বপ্রণোদিত (সেলফ সেন্সরড) বাধা বোধ করেন অনেকে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রু-মিত্র ব্লকে বিভক্ত বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল অসহনীয় যন্ত্রণা। তবে সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো, শীর্ষ নেতা সামরিক বেসামরিক নেতৃত্বকে নিশানা করে মেরে ফেলার মতো স্বপ্রণোদিত সহিংস তৎপরতা তখনো দেখা যায়নি। ফেরাউন নমরুদের প্রেতাত্মারাও শিউরে উঠবে এসব জেনে। ঠাণ্ডা মাথায় বিশ্বের আত্মধ্বংস ও সংহারের সমর প্রত্যক্ষ করেনি কখনো কেউ।
ঐকমত্যের ওজস্বিতা মতানৈক্যের মাশুল গুনতে গিয়ে নিঃশ্বেস হয়ে যেতে পারে এ বোধবিশ্বাসটাও স্বপ্রণোদিত ভুলভ্রান্তির হাতছানি দেখা যাচ্ছে। সমষ্টির কল্যাণবোধ ব্যক্তির স্বার্থবোধের কাছে হেরে যাচ্ছে। পরাস্ত হতে হচ্ছে। যেমন আদি মানব-মানবীর এক পুত্র আত্মসংহারের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।
বিভেদের যে দেয়াল, সে দেয়াল ভালো ও মন্দ উভয়ের জন্য সঙ্কট সৃষ্টি করে। ভালোকে ভালো থাকতে না দেয়া। আর মন্দকে আরো মন্দ হতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে এ সঙ্কটের সুনাম সুবিদিত। উভয় সঙ্কটে পড়ে শুভ চিন্তারা শুভ উদ্যোগের পাড়া থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সরে পড়ে। আর বিভিন্ন ধরনের অশুভ আচার-আচরণ পাড়া মাত করে। ষোলো শতকের ব্রিটিশ বণিক ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা স্যার টমাস গ্রেশাম ( ১৫১৯-৭৯) অনেক বুঝে শুনে এ অবস্থাকে ‘ব্যাড মানি ড্রাইভ অ্যাওয়ে গুড মানি ফ্রম দ্য মার্কেট’ বলে বর্ণনা করেছেন। ভালো আর মন্দকে একসাথে এক পাড়ায় বসবাস করতে দিয়ে ভালোর আলোয় মন্দকে কলুষমুক্ত হতে সাহায্য করা যেখানে উচিত, সেখানে ভালোকে পত্রপাঠ মাঠ থেকে সাজঘরে পাঠিয়ে দিয়ে ওয়াকওভারের পরিবেশ সৃষ্টি করা সভ্যতার সঙ্কট সৃষ্টিতে অতি উপাদেয় উপাদান।
সমাজ ও অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রগতির অভীপ্সা আকাক্সক্ষায় সব পক্ষ ও অনুষঙ্গকে নিরবচ্ছিন্ন নিঃশর্ত ঐকমত্যে পৌঁছানোর তাগিদে সবাইকে বিচ্যুতির পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তির অবয়বে আসার অবকাশ আছে। সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়ন ভাবনায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রেরণা ও মতবাদ হিসেবে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি তথা সার্বিক সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দর্শন বিশেষ বিবেচনা ও ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। সোস্যাল বিজনেসের ধারণা দ্রুত দৃষ্টিসীমার মধ্যে এসে যাচ্ছে। এমনকি এই কিছু দিন পর্যন্ত পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় অংশীদারত্ব হিসেবে শ্রমের মূল্যায়ন সরাসরি স্বীকৃত ছিল না। কিন্তু এটি ক্রমেই অনিবার্য উপলব্ধিতে পরিণত হতে চলেছে, কোনো উৎপাদন ও উন্নয়ন উদ্যোগে ভূমি, শ্রম ও পুঁজি ছাড়াও মালিক-শ্রমিক সব পক্ষের পারস্পরিক সম্মান সমীহের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টাই সব সাফল্যের চাবিকাঠি।
বিচ্যুতির অবকাশকে নাকচ করে দিয়ে যেকোনো অর্থনীতিতে সবার সুচিন্তিত মতামত প্রকাশের সুযোগ, কর্তব্যপালনে দৃঢ়চিত্ত মনোভাব পোষণ, উদ্দেশ্য অর্জন তথা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোয় ঐকান্তিক প্রয়াসে সমর্পিতচিত্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস জরুরি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কথা বলাবাহুল্য, জাতীয় উন্নয়ন প্রয়াস প্রচেষ্টাতেও সমন্বিত উদ্যোগের আবশ্যকতাও একইভাবে অনস্বীকার্য। জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে থাকা চাই প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবদান। অপচয় অপব্যয় রোধ, লাগসই প্রযুক্তি ও কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বনের দ্বারা সীমিত সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সবার মধ্যে অভ্যাস, আগ্রহ ও একাগ্রতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার।
নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা ও উপলব্ধির জাগৃতিতে অনিবার্য হয়ে ওঠে যে নিষ্ঠা ও আকাক্সক্ষা, তা অর্জনে সাধনার প্রয়োজন। প্রয়োজন ত্যাগ স্বীকারের। নেতিবাচক মনোভাবের দ্বারা এবং দায়দায়িত্ব পালন ছাড়া গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সুফল ভোগের দাবিদার হওয়া বাতুলতা মাত্র। ‘ফেল কড়ি মাখ তেল’ কথাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য এ জন্য যে, উৎপাদনে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করে ফসলের অধিক অধিকার-প্রত্যাশী হওয়াটা কোনোভাবে স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কর্ম ও ধর্ম নয়। কোনো কিছু অর্জনে বর্জন বা ত্যাগ স্বীকার যেমন জরুরি; তেমনি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে বাস্তবতা এই জানান দেয়, ‘বিনা দুঃখে সুখ লাভ হয় কি মহিতে?’ ন্যায়নীতি-নির্ভর, নিরপেক্ষ ও নির্ভার কাণ্ডজ্ঞানের বিকাশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অর্থবহ ও কার্যকর উপস্থিতির আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।
উপযুক্ত কর্মক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করে যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে পরিণত করা না যায়, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। সরকারি চাকরিকে সোনার হরিণ বানানোয় সে চাকরি পাওয়া এবং রাখতে অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাই স্বাভাবিক। দায়দায়িত্বহীন চাকরি পাওয়া কিংবা সরকারি সহায়তাপ্রাপ্তির সুযোগের অপেক্ষায় থাকায় নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহতেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ, মূল্যবান সময় এবং মহার্ঘ্য পাবলিক ফান্ড অপচয়ের এর চেয়ে বড় নজির আর হতে পারে না। দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছ্রতা সাধন ও আত্মত্যাগ আবশ্যক, সেখানে সহজে ও বিনা ক্লেশে কিভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সে দিকে ঝোঁক বেশি হওয়া সুস্থতার লক্ষণ নয়। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং তা অপ্রদর্শিত রেখে রাষ্ট্রের প্রাপ্য কর ফাঁকি দেয়ার মতো অনৈতিক কর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের পরিবেশে বৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও ন্যায্য কর পরিশোধের প্রেরণাকে বিচ্যুতির বলয়ে ঠেলে দেয়ার নামান্তর।
কর্মচারী ইউনিয়ন কিংবা সমাজসেবা-প্রত্যাশী যেকোনো সমিতির নির্বাচনে প্রার্থীর পরিচয়ে যে অঢেল অর্থব্যয়ের প্রতিযোগিতা চলে; তা যেন এমন এক বিনিয়োগব্যবস্থা নির্দেশ করে- যে বিনিয়োগে অবৈধভাবে অধিক উসুলের সুযোগ আছে। জনসেবা সেখানে বণ্টন বৈষম্যের, সামাজিক অবিচারের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায়। শোষক আর পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিতচিত্ত হওয়ার বদলে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব নিজেরাই উৎপাদনবিমুখ আর শ্রমিক স্বার্থ উদ্ধারের পরিবর্তে আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শোষণের প্রতিভূ বনে যায়। বিচ্যুতির সেই দুঃখজনক পরিবেশে দেখা যায় যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে; তাদের তারাই প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ। প্রচণ্ড স্ববিরোধী এ পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে উৎপাদন, উন্নয়ন তথা শ্রমিক উন্নয়ন সব বালখিল্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। নীতিনির্ধারক নিজে যখন সমন্বিতকরণ ও সেবার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে স্ববিরোধিতায় শোষণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় আর আত্মস্বার্থ উদ্ধারে আত্মঘাতী প্রবণতায় আকীর্ণ হয়ে পড়ে; তখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভাবনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত অবস্থায় যে আপতিত হয় তার ভূরি ভূরি প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক



