রাষ্ট্রপ্রধানদের মিথ্যাচার প্রসঙ্গ

ট্রাম্পের মিথ্যা কেবল তার নিজের রাজনৈতিক পতন নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতির জন্যও বড় বিপদ। ইতিহাস হয়তো তাকে সেভাবে বিচার করবে, যেমন নিক্সনকে করেছেÑ একজন নেতা, যিনি সত্যকে অবহেলা করে ক্ষমতার মোহে নিজেকে ধ্বংস করেছেন। এখানে নাগরিকদেরও করণীয় আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে নাগরিকদের সত্য দাবির প্রতি অবিচল থাকতে হবে এবং কখনো মিথ্যাচার মেনে নেয়া যাবে না

রাষ্ট্রপ্রধানরা মিথ্যা বলেন কি-না, কেন বা কখন মিথ্যা বলেন, এসব মিথ্যাচার জনস্বার্থে কি-না, এমন এব প্রশ্ন এখন উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্লেষক তুরস্কের হাক্কা ওকাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল ব্লেক এ প্রসঙ্গে ভয়ঙ্কর সব তথ্য প্রকাশ করেছেন। যেকোনো উৎসাহী পাঠককে বিষয়টি আকৃষ্ট করতে বাধ্য। এ বিষয়ে নানা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যেখানে ইতিহাস, দর্শন ও সমসাময়িক রাজনীতির জটিলতা একে অপরকে গ্রাস করছে। যেমনÑ সব প্রেসিডেন্টই মিথ্যা বলেন; কিন্তু তাদের মিথ্যার উদ্দেশ্য ভিন্ন। কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে, যেমন যুদ্ধকালীন শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে, আবার কেউ কেবল নিজের ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত মর্যাদা বৃদ্ধি বা রক্ষার জন্য মিথ্যা বলেন। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে প্রায় ৩০ হাজার ৫৭৩টি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন। ট্রাম্পের মিথ্যাচার সাধারণত তার নিজের ভাবমর্যাদা রক্ষা বা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য বলা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে নয়। কিছু বিশ্লেষক ভিন্ন কথাও বলেছেন।

ইতিহাসে এমন উদাহরণও আছে যেখানে মিথ্যা বলা হয়েছে বৃহত্তর জনস্বার্থে। ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট প্রকাশ্যে ইউরোপে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করলেও গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং ব্রিটেনকে সাহায্য করেছিলেন। আব্রাহাম লিংকন কনফেডারেসির সাথে শান্তি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন, যাতে দাসপ্রথা বিলোপের সংশোধনী পাস হয়। এসব মিথ্যা ইতিহাসে ‘নোবেল লাই’ বা মহৎ মিথ্যা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু রিচার্ড নিক্সন বা বিল ক্লিনটনের মিথ্যা ছিল কেবল ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা মর্যাদা রক্ষার জন্য, যা ইতিহাসে ক্ষমার অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মিথ্যার ধ্বংসাত্মক প্রভাব অনেক সমালোচিত হয়েছে। ট্রাম্প ইরান নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এক অযৌক্তিক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন। ইরান ‘হাজারো নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে’ বলে দাবি করা, কিংবা ইরান শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে প্রচার করাÑ এ সবই ছিল ইতিহাস বিকৃত করার প্রচেষ্টা। বাস্তবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি ছিল না; বরং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনে সীমিত সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের মিথ্যা প্রচারণা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক যুদ্ধে ঠেলে দেয়, যেখানে ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্ররা পর্যন্ত বিরোধিতা করছে।

এই যুদ্ধের আরেকটি দিক হলোÑ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝান, ইরানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যৌথ হামলা করে রেজিম বা শাসন পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল নেতানিয়াহুর নিজের দুর্নীতির মামলার বিচার এড়ানো। ফলে ট্রাম্প এক অযৌক্তিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যা শেষ পর্যন্ত তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকেই দুর্বল করে তোলে। রেজিম পরিবর্তনের আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো। এ জন্য ট্রাম্প প্রশাসন হাজার হাজার বন্দুক ইরানি বিক্ষোভকারীর কাছে পাঠান যার বেশির ভাগ ইরান সরকার হাতিয়ে নেয়।

রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। মোহাম্মদ রেজা পাহলভির জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরোধী একজন বিশিষ্ট ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে কাজ করেন এবং ইরানে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেন। তিনি তার স্ত্রী ইয়াসমিন এবং তিন কন্যাসহ ওয়াশিংটন ডিসিতে বাস করেন। সাম্প্রতিক এক ছবিতে দেখা যায়, রেজা পাহলভি ইহুদি পোশাক ও টুপি পরিধান করে আল আকসায় ইহুদিদের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কান্না করছেন। এই ছবি এতটাই ভাইরাল হয় যে, সমালোচকরা বলছেনÑ পাহলভি বংশ মুসলমান নয়, অধিকাংশ ইহুদি যা গোপন রাখা হয়েছে।

ইমানুয়েল কান্ট মনে করেন, মিথ্যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে অস্বীকার করে এবং তাকে কেবল একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এখানেই ট্রাম্পের অবস্থান আলাদা। তিনি মিথ্যা বলার জন্য কোনো নৈতিক যুক্তি খোঁজেন না; বরং মিথ্যাকে স্বাভাবিক ও সর্বজনীন বলে মনে করেন।

ট্রাম্পের মিথ্যা কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া, আধুনিক যুদ্ধবিমান হারানো, মিত্রদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়াÑ সবই তার মিথ্যার খেসারত। ডেভিড রথকফের ভাষায়Ñ ট্রাম্পের আবেগীয় পরিপক্বতা তিন বছরের শিশুর মতো এবং দূরদর্শিতা একেবারেই নেই। ফলে তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করেছেন। আমেরিকান সমাজে প্রেসিডেন্টদের মিথ্যা বলা নতুন নয়। লিন্ডন জনসনের গালফ অব টঙ্কিন ঘটনা, রোনাল্ড রিগানের ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারি, জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধের অজুহাতÑ সবই দেখায় যে, মিথ্যা ধীরে ধীরে ব্যতিক্রম থেকে নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ফ্যাক্টচেকিং এখন মিথ্যা ধরা অনেক সহজ। ওয়াশিংটন পোস্ট ট্রাম্পের বারবার পুনরাবৃত্ত মিথ্যার জন্য ‘বটমলেস পিনোকিও’ নামে বিশেষ বিভাগ তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্টদের কি মিথ্যা বলা উচিত? যদি মিথ্যা জনস্বার্থে হয় তবে ইতিহাসে তা ক্ষমাযোগ্য হতে পারে, কিন্তু যদি তা কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে হয় তবে তা কখনোই ক্ষমাযোগ্য নয়। ট্রাম্পের মিথ্যাচার খোদ তাকেই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তে পরিণত করেছে। এখান থেকে পরিত্রাণের জন্য তিনি এ লেখা পর্যন্ত ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছেন। যেখানে, তেল শোধানাগার, গুরুত্বপূর্ণ সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এসব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে দেখা গেছে ‘ডুমসডে প্লেন’ বা প্রলয়ঙ্করী বিমান। ফলে, ইরানে পরমাণু হামলার আশঙ্কা করেন অনেকে।

মিথ্যাচার রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে এক অনিবার্য বাস্তবতা হলেও এর উদ্দেশ্যই নির্ধারণ করে ইতিহাসে কিভাবে তা বিচার করবে। রুজভেল্ট বা লিংকনের মিথ্যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু ট্রাম্পের মিথ্যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। যখন নেতারা সত্যকে ঐচ্ছিক হিসেবে দেখেন, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি জনগণের সচেতন সম্মতি, ধ্বংস হয়ে যায়। তাই প্রশ্নটি কেবল নৈতিক নয়; বরং গণতন্ত্রের টিকে থাকার প্রশ্নও জড়িত।

ট্রাম্পের মিথ্যা কেবল তার নিজের রাজনৈতিক পতন নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতির জন্যও বড় বিপদ। ইতিহাস হয়তো তাকে সেভাবে বিচার করবে, যেমন নিক্সনকে করেছেÑ একজন নেতা, যিনি সত্যকে অবহেলা করে ক্ষমতার মোহে নিজেকে ধ্বংস করেছেন। এখানে নাগরিকদেরও করণীয় আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে নাগরিকদের সত্য দাবির প্রতি অবিচল থাকতে হবে এবং কখনো মিথ্যাচার মেনে নেয়া যাবে না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার