ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞা : গাজায় কৃত্রিম অঙ্গের সঙ্কটে হাজারো যুদ্ধাহত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দীর্ঘ সঙ্ঘাতের প্রভাব এখন ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটে রূপ নিয়েছে গাজায়। হাজারো যুদ্ধাহত মানুষের মতো কৃত্রিম অঙ্গের অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন অঙ্গহানিতে আক্রান্তরা বিশেষ করে শিশুরা। রয়টার্সের এক খবরে উঠে এসেছে, গাজায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ যুদ্ধের কারণে হাত বা পা হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশই শিশু। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের অনেকেই কৃত্রিম অঙ্গ পাচ্ছেন না।

১৪ বছর বয়সী ফাদেল আল-নাজি, যে একসময় ফুটবল খেলতে ভালোবাসত, এখন ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছে। একটি ড্রোন হামলায় তার দুই পা হারানোর পর থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তার পরিবারের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কৃত্রিম পা না পাওয়ায় সে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর মতে, প্লাস্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহে বাধা থাকায় কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইসরাইল এসব উপকরণে বিধিনিষেধ আরোপের পেছনে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি জানায়, গত কয়েক মাস ধরে প্লাস্টার অব প্যারিসসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে গাজায় প্রধান কৃত্রিম অঙ্গ প্রস্তুত কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত উৎপাদন করতে পারছে। কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাধ্য হয়ে পুরনো কৃত্রিম অঙ্গ পুনর্ব্যবহার করছে। আবার কোথাও প্লাস্টিক পাইপ বা কাঠ দিয়ে অস্থায়ী অঙ্গ তৈরির চেষ্টা চলছে, যা সংক্রমণ বা নতুন জটিলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম অঙ্গ না পাওয়ায় আহতদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং তাদের মানসিক ট্রমা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে মাত্র আটজন বিশেষজ্ঞ কৃত্রিম অঙ্গ প্রস্তুতকারক রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতির সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সহায়তা পৌঁছানো এখনো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সীমান্তপথ পুরোপুরি চালু না হওয়ায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা ও সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সঙ্কট শুধু শারীরিক নয়- এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে গণমাধ্যম থেকে দূরে থাকার পরামর্শ ফ্রান্সের

লেবানন শান্তি আলোচনা থেকে ফ্রান্সকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত। এর কড়া জবাব দিয়েছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো। বুধবার তিনি ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে গণমাধ্যম থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার পরামর্শ দেন।

জার্মানির বার্লিনে সুদান-বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে জ্যঁ-নোয়েল বারো যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘দৃশ্যত খুবই কূটনৈতিক, অত্যন্ত পরিশীলিত এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম।’

তিনি আরো জানান, লেবানন তার পুনরুদ্ধারের জন্য যেসব অংশীদার দেশের ওপর নির্ভর করতে পারে, লেইটার সেই দেশগুলোর সংখ্যা কমাতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। এর একদিন আগে লেইটার জানিয়েছিলেন, লেবাননের সাথে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা থেকে ফ্রান্সকে বাদ দিতে পছন্দ করবে ইসরাইল। ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘আমরা ফরাসিদের কার্যত সবকিছু থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে চাই। তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে লেবাননে তাদের কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই।’ এর জবাবে বারো পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘মাইক্রোফোন এবং টিভি ক্যামেরা থেকে ইসরাইলি কূটনীতিকের দূরে থাকা উচিত।’ মঙ্গলবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানান। একই সাথে ওই অঞ্চলে চলমান ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ পরিত্যাগ করার কথাও বলেন তিনি।

গত সপ্তাহে লেবাননে ইসরাইলের ব্যাপক হামলা এবং জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলার ঘটনায় মঙ্গলবার বেশ কয়েকটি দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দেয়। ওই বিবৃতিতে কঠোর ভাষায় এই হামলার নিন্দা জানানো দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সও ছিল। গত ২ মার্চ থেকে লেবাননজুড়ে ইসরাইলের প্রাণঘাতী হামলায় অন্তত দুই হাজার ১২৪ জন নিহত এবং প্রায় সাত হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকা ইসরাইল কয়েক দশক ধরে দখল করে রেখেছে। আর কিছু এলাকা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পরের বছরের নভেম্বরের মধ্যবর্তী সঙ্ঘাতের পর থেকে তাদের দখলে রয়েছে।

পশ্চিমতীরে ইসরাইলি তাণ্ডব, গাজায় লাশের মিছিল

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বাইত দুক্কু গ্রামে এক অভিযানের সময় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। জেরুসালেম গভর্নরেট জানিয়েছে যে, অভিযানের সময় বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনিকে আটক করে মাঠে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং সংঘর্ষে দুই ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

গাজায় ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিমতীরে সেনাবাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত এক হাজার ১৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১১ হাজার ৮৮৫ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৯ হাজার ৫৬০ জন ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগারে বন্দী রয়েছেন, যাদের মধ্যে তিন হাজার ৫৩২ জনকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। ইসরাইল নিশ্চিত করেছে যে, তাদের কারাগারে এ পর্যন্ত অন্তত ৮৯ জন ফিলিস্তিনি বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। অন্য দিকে গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ হামলায় নিহতের সংখ্যা আকাশচুম্বী হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৭২ হাজার ৩৪৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭২ হাজার ২৫০ জন আহত হয়েছেন। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও অন্তত ৭৬৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং দুই হাজার ১৪৭ জন আহত হয়েছেন।

গাজায় ত্রাণ সরবরাহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস। ভ্যান্স দাবি করেছিলেন যে, গাজায় গত পাঁচ বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ ত্রাণ প্রবেশ করছে। এর প্রতিবাদে হামাস জানিয়েছে যে, এই বক্তব্য বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে এবং এটি মূলত গাজার মানবিক সঙ্কটকে আড়াল করার চেষ্টা। তারা জানিয়েছে যে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং ত্রাণ সরবরাহে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এ দিকে একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে যে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইল পশ্চিমতীরে এক হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি শিশুকে গ্রেফতার করেছে। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর দ্য ডিফেন্স অব প্রিজনার্স তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ১৯৬৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ৫০০ শিশুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে ৩৫০ জন শিশু ইসরাইলি কারাগারে বন্দী অবস্থায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, শিশুদের প্রায়ই রাতের বেলা হাত ও চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দী অবস্থায় শিশুদের মারধর, গালিগালাজ এবং আইনজীবী বা পরিবারের সদস্য ছাড়াই দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ ছাড়া কারাগারে শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অপর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখার ফলে তাদের অবস্থা দিন দিন আরো সঙ্কটাপন্ন হচ্ছে। এই পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন ফিলিস্তিনি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে চরম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।