নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের চৌগাছায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে তুলে নিয়ে পায়ে গুলি করার মাধ্যমে পঙ্গু করে দেয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়েছে। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল বৃহস্পতিবার এ শুনানি গ্রহণ করেন। আদালত এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ২০ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন। বেঞ্চের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ।
এদিন অভিযোগ গঠনের শুনানিতে আসামিদের অব্যাহতি চেয়েছেন তাদের আইনজীবীরা। আসামি কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হকের আইনজীবী ছিলেন লিটন আহমেদ। শুনানিতে তার যুক্তি ছিল, এ ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে না। তিনি তার মক্কেলদের অব্যাহতি চেয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনাটি ‘ওয়াইড স্প্রেড’ বা ‘সিস্টেমেটিক অ্যাটাক’ নয় জানিয়ে এসআই আকিকুল ইসলামের অব্যাহতি চান তার আইনজীবী। এ সময় ‘ওয়াইড স্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক অ্যাটাকের’ আইনি ব্যাখ্যা দেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।
তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত ‘অধিকারের’ প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এ সময়কালে যাকে নিশানা করা হতো, তাকেই তুলে নিয়ে যেত তারা। অর্থাৎ চৌগাছার ঘটনাটিও ‘সিস্টেমেটিক অ্যাটাক’ ও ‘ওয়াইড স্প্রেডের’ একটি অংশ। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ঘটনাটি সিস্টেমেটিক কি না সেটা বুঝার জন্য ৫ আগস্টের (২০২৪ সালের) ঘটনার দিকে তাকালেই বুঝা যায়। এরপর থেকে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য ২০ এপ্রিল দিন ঠিক করে ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশন বলেছে, ২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে গুলি করা হয়। পরে গুলি করা ক্ষতস্থানে বালু ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়। বালু ঢোকানোর কারণে তাদের পায়ে পচন ধরে। একপর্যায়ে তাদের পা কেটে ফেলতে হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে এ মামলায় গ্রেফতার তিন আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন চৌগাছা থানার তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক। পলাতক ব্যক্তিরা হলেন যশোরের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতারে পরোয়ানা ও তিনজনকে হাজিরের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। গত ১২ এপ্রিল এ বিষয়ে শুনানি করে প্রসিকিউশন। ওই দিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করেন কৌঁসুলি মিজানুল ইসলাম।
সেদিন তিনি বলেছিলেন, ২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে গুলি করা হয়। পরে গুলি করা ক্ষতস্থানে বালু ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়। বালু ঢোকানোর কারণে দু’জনের পায়ে পচন ধরে। একপর্যায়ে পা কেটে ফেলতে হয় তাদের। পরে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করেন তিনি।
জিয়াউলের বিরুদ্ধে ফের সাক্ষ্য ২২ এপ্রিল : এ দিকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে সঙ্ঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষীর জেরা শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২২ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ।
এ দিন তিন নম্বর সাক্ষী মুন্নী আক্তারকে জেরা করেন জিয়াউলের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। জেরায় সাক্ষীকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে ফেলেন তিনি। ট্রাইব্যুনালে এসে অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও দাবি করেন আইনজীবী। মুন্নী আক্তারের স্বামীর নাম নজরুল ইসলাম। তাকে গুমের পর জিয়াউল আহসান হত্যা করেছেন বলে সাক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন তিনি। গত ৮ এপ্রিল জবানবন্দীর পর প্রথম দিনের জেরা হয়। তবে শেষ না হওয়ায় আজকের দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। এরই ধারাবাহিকতায় আজ এই সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী টিটো।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম, শাইখ মাহদীসহ অন্যরা। গতকাল সকালে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে এ মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ।
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি জিয়াউলের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এ মামলায় সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথমটি হলো-২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ আরো তিনজনকে হত্যা। দ্বিতীয় অভিযোগে অপরাধের সময়কাল হলো ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এ সময়টায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা। তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।



