শেল্টার হোম খোলার বিষয়টি আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে
ইরানের সাথে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই চরম অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। ইরানের একের পর এক টার্গেটকৃত মিসাইল ও ড্রোন হামলায় আমেরিকান ঘাঁটিসহ কিছু বেসামরিক স্থাপনাও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ধস নেমে এসেছে। দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা। এসব দেশগুলোতে প্রায় কোটি প্রবাসী ও তাদের পরিবার অবস্থান করছে। এদের মধ্যে ইরানি যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় কোম্পানি রয়েছে সেই সব কোম্পানিসহ অন্যান্য দেশের কিছু কোম্পানি ইতোমধ্যে লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে।
এর ফলে বেকার হয়ে পড়েছে বাংলাদেশী শ্রমিকসহ বিদেশী হাজার হাজার কর্মী। তাদের অনেকের এখন দিন কাটছে মানবেতরভাবে। এর পরও যারা অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে টিকতে পারছে না তাদের অনেকে ধার-দেনা করে বিমানের টিকিট কেটে নীরবে দেশে ফিরে আসছেন। তবে মধ্যেপ্রাচ্যে সরকারের নিজস্ব পলিসির কারণে দেশে ফেরা প্রবাসী কর্মীরা যুদ্ধের কারণে যে দেশে ফিরে আসছেন- এমনটা স্বীকার না করে তারা শুধু বলছেন, ছুটিতে এসেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার তারা তাদের কোম্পানিতে বা কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবেন।
শুধু যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, শারজাহ এলাকার বাংলাদেশীরা সমস্যার মধ্যে রয়েছে তা কিন্তু নয়, একই অবস্থা বিরাজ করছে কুয়েত, কাতার, লেবানন এবং সৌদি আরবে। তবে যুদ্ধের কারণে এখন পর্যন্ত কতজন কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন সেই ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাছে গতকাল পর্যন্ত কোনো তথ্য নেই। এমনটি জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। যদিও মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস ও শ্রম কল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হটলাইনের মাধ্যমে আপডেট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভিসাসহ কী কী সমস্যা রয়েছে সেগুলো জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত বুধবার রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাত্রী টার্মিনাল-২ এ সরেজমিন খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায়, দুবাই থেকে দেশে ফেরা একাধিক বাংলাদেশী শ্রমিক নিজের মালপত্র ট্রলিতে করে টার্মিনাল থেকে বের হচ্ছেন। পরিচয় পেয়ে তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যুদ্ধের কারণে দেশে ফিরে আসিনি। দেড় মাসের ছুটিতে এসেছি। তারা বলেন, যুদ্ধ আবুধাবি আর দুবাইয়ের কোথায় হচ্ছে তা আমরা জানি না। তবে দু-এক দিন পর পর বোমা হামলা হলে তখন সেটি আমাদের মোবাইলে খবর চলে আসে। সাইরেন বেজে উঠে। আমরা যে এলাকায় আছি সেখানে কোনো যুদ্ধই নেই।
রাত সাড়ে ৯টার ফ্লাইটে ঢাকায় অবতরণ করা মুন্সীগঞ্জের একজন প্রবাসী। তিনি লাগেজ ট্রলিতে তুলে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যুদ্ধের কারণে ওমানের অবস্থা কেমন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে কোনো যুদ্ধ চলছে না। যুদ্ধ হচ্ছে আমাদের এখানে! তিনি বলেন, দেখেন না, এখানে কী ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে। লোকজনের ভিড়। মালপত্র নিয়ে যে গাড়িতে উঠবো সেই সুযোগও পাচ্ছি না। কোনো শৃঙ্খলা নেই এখানে। তবে ক্যানোপি এলাকায় প্রতিদিন বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের গাড়ি ভাড়া করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন এমন একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় না দিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি প্রতি দিন এসব দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের সাথে কথা বলি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, তারা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক অবস্থা মন্দা হওয়ার কারণে দেশে ফিরে এসেছেন। কেউ বলছেন, দুবাই, আবুধাবিতে ইরানের যতগুলো কোম্পানি আছে ওই সব কোম্পানির মালিকরা ভয়ে দোকান, মার্কেট, কোম্পানি বন্ধ করে চলে গেছেন। শ্রমিকদের বলে গেছেন, যদি আবার কোম্পানি, দোকান খোলা হয় তখন তাদেরকে আবার ডাকা হবে। এদের কেউ কেউ সেখানে বেকার না থেকে দেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
দুবাইয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন এমন একজন নারী কর্মী গত বুধবার রাতে দেশে ফিরে আসেন। ওই নারী তার স্বজনদেরকে বলেছেন, তিনি যেখানে কাজ করতেন সেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তার মালিক বন্ধ করে দিয়েছেন। তাকে বলেছেন তুমি দেশে ফিরে যাও। যদি প্রয়োজন হয় তা হলে ডাকবো এবং বিমানের টিকিট পাঠাবো। ওই নারী উপায় না পেয়ে নিজেই ৮০ হাজার টাকায় বিমানের টিকিট কেটে দেশে চলে এসেছেন। তিনি পুরান ঢাকার বাসিন্দা। তিনি এও বলেছেন, শুধু তিনি নন, যুদ্ধের কারণে তার মতো অনেকেই আলো ঝলমলে দুবাই শহরে এখন বেকার জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। তিনিও তার স্বজনদের কাছে বলছেন, দুবাই থেকে তিনি ছুটিতে এসেছেন।
দুবাই, আবুধাবি, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যেপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে গেলে দুইজন দায়িত্বশীল জয়েন্ট সেক্রেটারি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের জানা মতে, এখন পর্যন্ত ‘ওইভাবে’ মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে কর্মীরা ফেরত আসেনি। তবে তাদের যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয় সে জন্য আমাদের এখান থেকে কন্ট্রোল রুম খুলে দূতাবাসগুলো থেকে আপডেট তথ্য নিয়ে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, আসলে আমাদের কাছে যে তথ্য আছে সেটি হচ্ছে আমরা সেখানে শ্রমিকদের জন্য শেল্টার হোম খোলার চিন্তাভাবনা করলেও তারা এটিকে ভালো চোখে দেখছে না। তাই শেল্টার হোম খোলার বিষয়টি এখনো আলোচনার মধ্যে সীমাবন্ধ আছে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে অপর একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশী মারা গেছেন তাদের লাশ আনার ব্যবস্থা করেছি। দাফন-কাফনের জন্য নগদ ৩৫ হাজার টাকা ও অতিরিক্ত প্রত্যেক কর্মীর জন্য ৫০ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। যারা আহত আছে তাদের সার্বিক খোঁজ খবর নেয়ার জন্য দূতাবাস থেকে কর্মকর্তারা যোগাযোগ করছেন। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য আমাদের যেখানে যেখানে যা যা করণীয় তা আমাদের মন্ত্রী এবং সচিবদের নির্দেশে করা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই প্রবাসীদের খোঁজ খরব নিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মধ্যেপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এক নারী কর্মীসহ ৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৮ জন। নিহতদের মধ্যে লেবাননে নিহত নারী কর্মীর লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
এ দিকে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রেইজ প্রকল্পের উদ্যোগে বিদেশ থেকে আসা কর্মীদের সার্বিক সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। প্রবাস ফেরত শ্রমজীবীদের জন্য নেয়া প্রকল্পে বলা হয়েছে, চাকরি শেষে বিদেশ থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশীদের কোনো পরিসংখ্যান নেই। ফেরত আসাদের যথাযথ তালিকা প্রস্তুত করে তাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন ও পুনঃএকত্রীকরণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অপর দিকে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড ইরান ও ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধে পড়ে নিহতদের বিষয়ে বলা হয়েছে, মিসাইল হামলায় যাদের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সেই লাশ সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রেরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যার কারণে একজন প্রবাসীর লাশ সৌদি আরবেই পরিবারের ইচ্ছাতে দাফন করা হয়েছে। ওই হতভাগ্য শ্রমিকদের নাম বাচ্চু মিয়া। পিতার নাম রইস মিয়া। ঠিকানা কিশোরগঞ্জ কটিয়াদি পশ্চিম ফিকামারা। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নিহত বাচ্চুর বাড়ি পরিদর্শন করে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং নগদ আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন।



