২০৩৩ সালের মধ্যে ৩৪ হাজার কোটি টাকায় হবে পদ্মা ব্যারাজ

সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রীর তথ্য

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

পদ্মা অববাহিকার বিশাল কৃষি অঞ্চলকে মরুময়তা থেকে বাঁচাতে ও শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সাল থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে রাজবাড়ী-২ আসনের এমপি মো: হারুন অর রশিদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী সংসদকে জানান, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত এবং যেখানে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ বসবাস করে। প্রকল্পটি নদী নির্ভরশীল জনগণের জীবন রক্ষাকারী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা দীর্ঘদিনের। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পটি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে ২০০২ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। ২০০৪ সালে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা ২০১৩ সালে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা চূড়ান্ত করা হয়। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের ডিপিপি ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পদ্মা নদীর উভয় তীর সংরক্ষণ (প্রথম অংশ)’ নামে ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৪৮ কোটি টাকা। ২০২৯ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন হবে।

বগুড়া-১ আসনের এমপি কাজী রফিকুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী সংসদকে জানান, বগুড়া জেলায় যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন আছে। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় সারিয়াকান্দি উপজেলায় নদী তীর রক্ষার কাজ ধরা হয়েছে ৩.৮৫০ কিমি. এবং সোনাতলা উপজেলায় ২.৮০০ কিমি.।

সিলেট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো: আবুল হাসানের ৭১ বিধিতে উপস্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী এ্যানি বলেন, ইদানীং আমাদের তিনটা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। একটা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আরেকটা বিগত সময়ে রাজনৈতিক যুদ্ধ। একই সাথে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ। এরমধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা। এই যে যুদ্ধটা, কত যে কঠিন, নদীর পাড়ে যারা বসবাস করেন তারাই সবচেয়ে বেশি বোঝেন।

এ সময় অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমিও কমবেশি ভুক্তভোগী। আমার সুমেশ্বরী এবং কংশ (নদী) দুইটার।

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য মো: আবুল হাসান যে নোটিশে জানিয়েছেন, সিলেট জেলার জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার নদীভাঙন রোধকল্পে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

তাকে সমর্থন করে যারা ইতোমধ্যে বক্তব্য রেখেছেন আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সিলেট, এই বৃহত্তর সিলেটের যে অঞ্চল, এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে দুইটা নদী। একটা হলো সুরমা, আরেকটা কুশিয়ারা। ভারতের ওরাক নদী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ওই নদীগুলো সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষ করে ভারতের মণিপুর রাজ্য, এই রাজ্যের পাহাড়ি এলাকায় উৎপন্ন হয়ে বরাক নদী মিজোরাম ও আসামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার অমরশিদ নামক স্থানে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এটি একটি খরস্রোতা নদী। উজানে ভারতের পাহাড়ি এলাকায় স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত পরিমাণ বৃষ্টির কারণে ২০২২, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সেখানে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে এবং টিকে থাকতে হচ্ছে।

ইতোমধ্যে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার নদীভাঙন রোধে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, সুরমা কুশিয়ারা নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রথম পর্যায়ে একটি প্রকল্প ডিসেম্বর-২০২৫ সালে একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির অনুমোদিত প্রাক্কলিত যে ব্যয় ৭৩ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদকাল জানুয়ারি-২০২৬ থেকে ২০২৮। বর্তমানে প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ‘সুরমা কুশিয়ারা নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রথম পর্যায়’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নদীর তীর অনেকাংশে সুরক্ষিত হবে।

এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘরবাড়ি কৃষিজমি এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড নদী ভাঙনের কবল থেকে অনেকাংশ রক্ষা পাবে।