স্বাধীনতা পদক হস্তান্তর

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত নয় : প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তদের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : পিআইডি
স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তদের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকার জনসাধারণের আর্থিক দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশ এখনো সেই পথে যায়নি। জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও আমরা এখনো সে সিদ্ধান্ত নেইনি। জনগণের কষ্ট লাঘব করতেই সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এই খাতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও আমরা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছি।’

তিনি আরো বলেন, সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা ও প্রতিশ্রুতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, সরকার জনগণের কল্যাণে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে এবং যেহেতু তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত, তাই জনগণের কাছে জবাবদিহিতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রত্যাশিত স্বনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশোধ প্রতিহিংসা কিংবা অযথা বিতর্ক পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। আমাদের মত পথ ভিন্ন হতে পারে, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক বিরোধ থাকতে পারে। তবে আমাদের মধ্যকার বিতর্ক বিরোধ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, দেশের স্বার্থে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র কিন্তু এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

চলতি বছর জাতীয়পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ (মরণোত্তর) ১৫ জন বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পেয়েছেন। একই সাথে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানও পেয়েছে এই পুরস্কার। গতকাল বিকেলে এ বছর পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মরণোত্তর পুরস্কারটি গ্রহণ করেন তার নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। খালেদা জিয়াকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়েছে ‘স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও নারী শিক্ষাসহ দেশ গঠনে’ সার্বিক অবদানের জন্য।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান এবং খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনী প্রধান ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।

খালেদা জিয়াসহ মরণোত্তর এই সম্মাননা পেয়েছেন সাতজন। তারা হলেন, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিল, সাহিত্যে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সমাজ সেবায় ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহেরীন চৌধুরী, সংস্কৃতিতে বশির আহমেদ এবং জনপ্রশাসনে কাজী ফজলুর রহমান।

মেজর জলিলের পক্ষে তার কন্যা ব্যারিস্টার সারা জলিল, ড. আশরাফ সিদ্দিকীর পক্ষে তার মেয়ে ড. তাসনিম আরিফা সিদ্দিকৗ, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পক্ষে তার ছেলে বারীশ হাসান চৌধুরী, মাহেরীন চৌধুরীর পক্ষে তার স্বামী মনসুর হেলাল, বশির আহমেদের পক্ষে তার কন্যা হুমায়ারা বশির এবং কাজী ফজলুর রহমানের পক্ষে তার কন্যা তাবাসুম শাহনাজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অধ্যাপক ড. জহুরুল করিম, সংস্কৃতিতে এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত), ক্রীড়ায় জোবেরা রহমান (লিনু), সমাজসেবায় সাইদুল হক, গবেষণা ও প্রশিক্ষণে মোহাম্মদ আবদুল বাকী, অধ্যাপক ড. এম এ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আবদুল মুকিত মজুমদার (মুকিত মজুমদার বাবু) প্রধানমন্ত্রীর কাছে থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার নেন। অধ্যাপক জহুরুল করিমের পক্ষে তার পুত্র হারুনুর রশীদ এবং এ কে এম হানিফ, জোবেরা রহমান, সাইদুল হক, মোহাম্মদ আবদুল বাকী, এম এ রহিম, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, আবদুল মুকিত মজমুদার প্রত্যেকে নিজে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার নেন।

এ বছর যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারে মনোনীত করা হয়েছে তা হলো- মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চিকিৎসা বিদ্যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পল্লী উন্নয়নে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জনসেবায় এসওএস শিশু পল্লী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল আদনান কবির, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান, এসওএস শিশু পল্লীর ন্যাশনাল ডাইরেক্টর ড. এনামুল হক এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সিনিয়র প্যারামেডিক বিউটি রানী সাহা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নেন।

স্বাধীনতা পুরস্কার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর এ পুরস্কার দিয়ে আসছে। স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আঠারো ক্যারেটের ৫০ গ্রামের একটি স্বর্ণপদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, তিন লাখ টাকা ও একটা সম্মাননাপত্র দেয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। সেই বাংলাদেশটি এখন ৫৫ বছর পার করে ফেলেছে। এত বছরে আমাদের যেমন অনেক প্রাপ্তি রয়েছে অপ্রাপ্তিও কম নয়। সুতরাং আমাদের প্রত্যাশিত স্বনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিশোধ প্রতিহিংসা কিংবা আর অযথা বিতর্ক নয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলতেন, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা’ সেই কথা স্মরণ রেখেই বলতে চাই, আমাদের মত পথ ভিন্ন হতে পারে, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক বিরোধ থাকতে পারে তবে আমাদের মধ্যকার বিতর্ক বিরোধ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয় দেশের স্বার্থে সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র কিন্তু এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের ভোটে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দুর্নীতি দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসনকাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনজীবনে শান্তি নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্টেরিম সরকারের সময়েও শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরেনি দুঃখজনকভাবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক এবং কর্মমুখী করতেই হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার কাজটিও আমরা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছি। দেশে অর্ধেকের বেশি নারী। নারীদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের কোনো উদ্যোগই সহজে সফল হবে না। এভাবে প্রতি সেক্টরকে চিহ্নিত করে সরকার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবই মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের রায়ে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার আগেই আমরা বিস্তারিতভাবে দেশের জনগণের সামনে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছিলাম। রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষর করেছিলাম। জনগণ আমাদের প্রতিটি অঙ্গীকারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। এবার আমাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পালা। আমরা ইতোমধ্যেই জনগণের সামনে দেয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। আমরা দলীয় ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা প্রতি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব ইনশা আল্লাহ

অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পদক প্রাপ্ত জোবেরা রহমান, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া ও পল্লৗ কর্মসংস্থাক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন।