ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই স্মৃতিমাখা দিনগুলোর কথা, যখন আমি আর আমার বোন ফুলি বাবার হাত ধরে মেলায় যেতাম। সেই ভোর থেকেই কেমন যেন অপেক্ষায় রইতাম আমরা দুই বোন। কখন বাবা বাসায় ফিরবে! কখন আমরা বাবার সাথে মেলায় যাবো! বারবার বাড়ির সহপাঠীদের কাছে যেতাম। কারা মেলায় গেল! মেলা থেকে কী কী আনল সব দেখতাম।
সবসময়ই পয়লা বৈশাখের দিন আব্বা সকালের দিকে খুব ব্যস্ত থাকত। তাই আমাদের মেলায় যেতে হতো বিকেলের দিকে। বাবা কখন বাসায় আসবে আমরা অপেক্ষায় রইতাম। আর মায়ের পিছু পিছু বারবার ছুটতাম। সেই একই প্রশ্ন! বাবা কখন বাসায় আসবে? কখন মেলায় নিয়ে যাবে? বাবা আসলেই শুরু করতাম আমাদের বায়না। অবশেষে বিশাল একটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাবার ২ হাতে আমরা দুই বোন ধরে মেলায় যেতাম। বাবা প্রথমেই আমাদেরকে একটি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে খাওয়াতেন এবং অবশেষে নিয়ে যেতেন মেলায়। বাবা সবসময় ভিড় অপছন্দ করেন। তার মধ্যে আমরা দুই বোন বাবার দুই হাত ধরা। সবসময় মেলায় গিয়ে বাবা একটা কাজ করতেন এবং তা হলো বাবা কখনো ভিড় ঠেলে মেলার ভেতরে নিয়ে যেতেন না। এক পাশ থেকেই সব কিছু কেনাকাটা করে দিতেন। প্রথমেই কিনে দিতেন মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, চুলা, পুতুল, চালনা, শিল-পাটা, ঘোড়া, অনেক ধরনের ঢোল, কয়েক প্রকার গাড়ি, বাঁশি, পাখি, টুপি, কুলা, চালনা, গরু, মাটির ব্যাংকসহ আরো অনেক কিছু এবং যতগুলো পদ থাকত সব দুই জোড়া দুই জোড়া করে নেয়া হতো। কিন্তু মাটির পাতিল কেনা হতো অনেক। যত রকমের পাতিল ছিল সব জোড়া মিলিয়ে মিলিয়ে কিনে দিতেন বাবা। এখনো আমার চোখে ভাসছে মাটির হাঁড়ি পাতিলের সেই চারুকলা। কাঁচা লাল রঙের সাথে সাদা ও সোনালী রঙ মেশানো। কাঁচা মাটি ও রঙের গন্ধটাও আমার খুব ভালো লাগত। আরো নিতাম বেশ কয়েক প্রকার খেলনা গাড়ি এবং কয়েক প্রকার বাঁশিও নিতাম। আমাদের ব্যাগ ভর্তি হওয়ার পর যেতাম মুড়ি মুড়কির দোকানে। সেখানে থাকত সাদা রঙের কদমা, মিঠাই ও লাল সাদা মুড়ি। সব প্রকার খাবার বাবা নিতেন। অবশেষে বাবার হাত ধরে আমরা দুই বোন সন্ধ্যায় বাসায় রওয়ানা হতাম। মেলার একটি ঘটনা আজও আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে। একদিন মেলা শেষে যখন বাড়ি ফিরছিলাম, বাড়ির অনেকটা কাছাকাছি এসে বাবাকে বলছিলাম, বাবা আমাকে ব্যাগ থেকে মাটির বড় সেই হরিণটা বের করে দাও না। আমি এইখান থেকে বাকিটা পথ এটা হাতে করে নিয়ে যাব। দুঃখের বিষয়! কিছুটা পথ যাওয়ার পরেই আমার মাটির সেই হরিণটি ভেঙে গিয়েছিল! এত্তো কান্না করেছিলাম এবং অনেক কষ্ট লেগেছিল। আজও সেই হরিণের কথা মনে হলে খুব মন খারাপ হয়। সন্ধ্যার সময় বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাতাম। গিয়ে দেখতাম মা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। ব্যাগ থেকে সব কিছু বের করে সবাইকে দেখাতাম। মাঝেমধ্যে খেলনা ভাগাভাগি নিয়ে আমরা দু বোন ঝগড়া লেগে যেতাম। তখন বাবা আমাদেরকে সব খেলনা সমান ভাগে ভাগ করে দিতেন। মাটির চুলার মধ্যে নকশা করা সেই পাতিল চড়াতাম। এবং খাবার হিসেবে থাকতো মেলা থেকে আনা সেই কদমা এবং মুড়ি। আমরা দু বোন রুমের দুই কোনায় বসতাম এবং মনে মনে ভাবতাম ওইটা তার বাড়ি এবং এই কোণটা আমার বাড়ি। স্মৃতিময় দিনগুলো আজও আমার মনে গেঁথে আছে। খুব মনে চাই আবার ছোটবেলার স্মৃতিতে হারিয়ে যেতে। এখন কি আর ইচ্ছে করলেই ফিরে পাব সেই স্মৃতিময় সময়! মনে হলে শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না! মন চায় আবার আগের মতো হয়ে যাই! আবার ছোটবেলার মেলায় বাবার সাথে চলে যাই! তবু না হয় আবার একদিন বাবার গলায় জড়িয়ে ধরে বলব, বাবা, চলো না বাবা মেলায় যাই! আমি তোমার সাথে মেলায় যেতে চাই।



