- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
‘বেশি কথা বললে শুট করে দেব’ ২০২০ সালের ১ মার্চ সকালে এভাবেই প্রকাশ্য দিবালোকে রিকশা থামিয়ে তুলে নেয়া হয়েছিল প্রকৌশলী মো: মাসরুর আনোয়ার চৌধুরীকে। এরপর শুরু হয় ১০ মাসের এক বিভীষিকাময় অন্ধকার জীবন, যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড কাটত মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। কখনো হাতে শক্ত হ্যান্ডকাফ, কখনো চোখে কালো কাপড়, আর কখনো টিএফআই সেলের সেই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে চলত অমানবিক নির্যাতন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলার বিচার চলছে। রোববার বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে মাসরুরের এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। বিচারক প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাসরুর যখন তার ওপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিটি পরত উন্মোচন করছিলেন, তখন সেখানে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী তখন ‘হোটেল হলিডে ইন’-এ পারচেজ ম্যানেজার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছিলেন। তার অপরাধ ছিল কেবল নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে তৎকালীন আওয়ামী শাসন ও ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করা। জবানবন্দীতে তিনি জানান, ১ মার্চ ২০২০ তারিখ সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টায় গুলশানের বাসা থেকে রিকশাযোগে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে পুলিশ প্লাজার পেছনের ব্রিজের ওপর একটি সাদা মাইক্রোবাস তার পথ আটকায়। গাড়ি থেকে নামা ৫-৬ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তার নাম নিশ্চিত হওয়ার পর একটি ফেসবুক পোস্ট দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করে সেটি তার কি না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমনের বিরোধিতা করে দেয়া সেই পোস্টের কথা স্বীকার করতেই মাসরুরকে জোরপূর্বক গাড়িতে তোলা হয়। তিনি তার দুই ছোট সন্তানের কথা বলে বারবার আকুতি জানালেও অপহরণকারীরা তাকে ‘শুট’ করার হুমকি দিয়ে গাড়ির মেঝেতে চেপে ধরে এবং চোখ ও হাত বেঁধে ফেলে।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা অজানা পথে চলার পর তাকে নামানো হয় ৬ ফিট বাই ৬ ফিটের এক নিভৃত প্রকোষ্ঠে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শুরু হয় পৈশাচিকতা। কেন তিনি সরকারের সমালোচনা করেন এবং কোনো জঙ্গি সংগঠনের সাথে তার সম্পর্ক আছে কি না এমন প্রশ্নে তাকে বেল্ট দিয়ে অনবরত প্রহার করা হয়। সেই নির্যাতনের মুখেই মাসরুরের কাছ থেকে তার দুই বন্ধু কাওসার আলম ফরহাদ এবং আসিফ ইফতেহাজ রিবাতের নাম ও ফোন নম্বর কেড়ে নেয়া হয়। পরদিন সকালে তাকে আবার হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ৩০০ ফিট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গাড়ি থামলে মাসরুর ভেবেছিলেন তাকে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে, তাই তিনি মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকেন। তবে ভাগ্যক্রমে তাকে একটি ভবনের দোতলায় নিয়ে যাওয়া হয়, যা পরে তিনি ‘টিএফআই সেল’ বলে শনাক্ত করেন। সেই সেলের জীবন ছিল অবর্ণনীয়। ১০-১২ ফিট দীর্ঘ ও মাত্র ৩ ফিট চওড়া কুঠরিতে সবসময় ব্লাইন্ডফোল্ড পরে থাকতে হতো। শৌচাগার ব্যবহারের জন্য ছিল কঠোর সময়সীমা প্রস্রাবের জন্য দুই মিনিট আর পায়খানার জন্য মাত্র ৪-৫ মিনিট। নির্দিষ্ট সময় পার হলেই দরজায় লাঠির আঘাত আর শারীরিক লাঞ্ছনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এমনকি খাওয়ার পর নিজের প্লেট ধোয়া পানি পর্যন্ত তাকে খেতে বাধ্য করা হতো।
সেই বন্দিশালায় থাকাকালীন মাসরুর ব্লাইন্ডফোল্ডের নিচ দিয়ে আরো অনেককে দেখতে পান। সেখানে তারেক সাইফুল নামের ১৭ বছরের এক কিশোরের সন্ধান পান তিনি, যে দীর্ঘ সময় ধরে গুম ছিল। মাসরুর জানতে পারেন, সেখানে কেউ এক বছর, কেউ দুই বছর ধরে নিখোঁজ এবং তাদের পরিবারের কাছে কোনো তথ্য নেই। ৫-৬ দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর এক রক্ষী এসে তাকে ফিসফিস করে বলে, ‘তুই বেঁচে গেছিস, নফল নামাজ পড়ে নে।’ এরপর তাকে আবার র্যাব-১১-এর সেলে নেয়া হয় যেখানে তিনি তার সেই দুই বন্ধু ফরহাদ ও রিবাতকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পান। এরপর নাটকীয়ভাবে তাদের চারজনকে এক মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পথিমধ্যে সাজানো ‘জঙ্গি নাটক’ মঞ্চস্থ করা হয়। কর্মকর্তাদের সাথে সাজানো বন্দীদের হাসি-ঠাট্টা দেখেই মাসরুর বুঝতে পারেন তাদের বড় কোনো মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। পরদিন গণমাধ্যমের সামনে ‘জঙ্গি’ হিসেবে হাজির করে ছবি তোলার পর তাদের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় সোপর্দ করা হয়।
দীর্ঘ ১০ মাস কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পেলেও মাসরুরের জীবন থেকে হারিয়ে যায় সেই সোনালি সময় আর সাজানো ক্যারিয়ার। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের আশায় তিনি গুম কমিশনের দ্বারস্থ হন। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সশরীরে সেই অন্ধকার টিএফআই সেল পরিদর্শন করে নিজের বন্দিশালাটি শনাক্ত করেছেন মাসরুর। জবানবন্দীর শেষে তিনি স্পষ্টভাবে র্যাব-১১-এর তৎকালীন অফিসার আলেপ উদ্দিনকে এই অপহরণ ও নির্যাতনের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তার জীবন ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করার সাথে জড়িত সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নেপথ্যের কারিগরদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করে তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে এই পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দী পেশ করেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি হয়। তাদের মধ্যে ১০ আসামি ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন। তারা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান, মো: মাহাবুব আলম এবং কে এম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লে. কর্নেল মো: মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও মো: সারওয়ার বিন কাশেম। গতকাল তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়েছিল।
এই মামলার অপর সাত আসামি পলাতক। তারা হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (পরে আইজিপি হন), এম খুরশীদ হোসেন ও মো: হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।
কাদের-সাদ্দামসহ শীর্ষ ৭ নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন তদন্ত কর্মকর্তা
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসের উদ্দিন মোহাম্মদ। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।
প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিত ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ মামলায় ২৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন নাসের উদ্দিন। তিনি এ ঘটনায় তদন্তকালীন কী কী জব্দ করেছেন, তা ট্রাইব্যুনালে পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরেন। কোন দিন, কোন সময়ে এসব জব্দ করা হয়েছে, তা লিপিবদ্ধ করা হয়। তবে জবানবন্দী শেষ না হওয়ায় আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সোবহান তরফদারসহ অন্যরা। এ মামলার সব আসামিই পলাতক রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই চলছে বিচারকাজ। এরই মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীসহ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। সবমিলিয়ে ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ২৫ জনের জবানবন্দী নেয়া হয়।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আদালত।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ অনুযায়ী আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহ্বান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য বলে উল্লেখ করে প্রসিকিউশন।



