মাটির গন্ধে বৈশাখ

আমাদের হারানো শৈশব : আল পারভেজ

Printed Edition

ভোরের আকাশটা আজ যেন একটু বেশিই নীল, ঠিক যেমনটি থাকে শরতের স্বচ্ছ সলিলে। কিন্তু বাতাসের মেজাজ বলছে অন্য কথা। সেই পরিচিত শুষ্কতা আর তপ্ত রোদের আভাস থাকলেও ২০২৬ সালের এই বৈশাখী ভোরে এক নতুন প্রশান্তি মিশে আছে। জানালার ওপাশে যান্ত্রিক শহরের ইট-কাঠের অরণ্য ভেদ করে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত মায়াবী সুর। না, কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের অ্যালার্ম নয়; দূরের কোনো গলি থেকে ভেসে আসা সেই চিরচেনা বাঁশের বাঁশির করুণ অথচ উদাত্ত এক তান। মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা, যখন বৈশাখ মানেই ছিল ক্যালেন্ডারের লাল তারিখের চেয়েও বড় কিছু। আজ নতুন বাংলাদেশের এই সতেজ ভোরে সেই স্মৃতিগুলো যেন ঝরঝরে নদীর মতো বয়ে চলেছে ধূলিপথ থেকে শহরের পিচঢালা রাজপথ পর্যন্ত।

আমাদের শৈশবে বৈশাখ আসত মেলার ঝুলি নিয়ে। মফস্বল কিংবা গ্রামের সেই ধুলো ওড়ানো পথ ধরে বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়ার আনন্দ আজ বড় বেশি স্মৃতিকাতর করে তোলে। মেলার প্রবেশমুখেই নাকে লাগত এক অদ্ভুত মিশ্র ঘ্রাণ-ভেজা মাটি, চিনিতে পাকানো বাতাসা, আর কড়কড়ে নতুন কাপড়ের মাড়। সেই ঘ্রাণ আজও নাকে লেগে আছে। মেলা মানেই ছিল রঙের কারসাজি। মাটির সরায় আঁকা লাল-নীল ঘোড়া, কিংবা কাঠঠোকরা পাখির মতো সেই খেলনাগুলো, যা সামান্য সুতোর টানে ‘ঠক ঠক’ শব্দে প্রাণ পেয়ে উঠত। ২০২৬-এর এই বদলে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে যখন দেখি শহরের নামী বিপণিবিতানগুলো প্লাস্টিকের খেলনা ছেড়ে আবার সেই মাটির ট্যাপা পুতুল আর সরাচিত্রের দিকে ঝুঁকছে, তখন মনে হয়- আমরা আসলে কোথাও হারাইনি; বরং ঘুরেফিরে নিজের শেকড়কেই নতুন করে আলিঙ্গন করছি।

এই যে মাটির গয়না কিংবা নকশি পাখা, এগুলোর প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছে আমাদের লৌকিক ঐতিহ্যের এক মহিমান্বিত ইতিহাস। মেলায় গিয়ে যখন দেখি হাশেম মিঞা পরম মমতায় মাটির হাঁড়িতে তুলির শেষ আঁচড়টি দিচ্ছেন, তখন অজান্তেই শ্রদ্ধা জাগে। আমাদের এই ঐতিহ্যের চাকা সচল রেখেছেন এই প্রান্তিক মানুষগুলোই। অদ্ভুত এক ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন দেখা যায় এখানে। মেলায় যে কারিগরটি কাঠের ঘোড়া বানাচ্ছে বা যে দর্জিটি নিপুণ হাতে লাল-সাদা পাঞ্জাবি সেলাই করছে, তাদের বড় অংশই আমাদের মুসলিম সমাজ থেকে আসা কঠোর পরিশ্রমী শিল্পী। ধর্ম যার যার হতে পারে, কিন্তু উৎসবের এই সৃজনশীলতা আর মাটির মমতা তো সবার। তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় যে সরাচিত্রটি তৈরি হয়, তা কেবল ঘর সাজানোর উপকরণ না; তা আমাদের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত দলিল।

গ্রাম আর শহরের বৈশাখের মধ্যে একসময় একটা দীর্ঘ দেয়াল ছিল। গ্রামের বৈশাখ ছিল ধুলোমাখা, আটপৌরে; আর শহরের বৈশাখ ছিল কিছুটা কৃত্রিম আর ফ্যাশননির্ভর। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ ২০২৬ সালে এসে দেখছি, সেই দেয়ালটা ভেঙে পড়েছে। শহরের পিচঢালা পথে এখন আর কেবল পান্তা-ইলিশের বিলাসিতা নেই, মানুষ এখন মাটির বাসনে খাওয়ার মধ্যে এক ধরনের ‘অর্গানিক’ আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে। এখনকার শহুরে তরুণীরা কৃত্রিম রেশমি সুতোর বদলে দেশি তাঁতের শাড়িতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। রাস্তার ধারের মেলায় যখন দেখি এক করপোরেট কর্মকর্তা দামি গাড়ি থেকে নেমে তার সন্তানের জন্য বাঁশের বাঁশি কিনছেন, তখন মনে হয়- মাটির টান কোনো বৈভব দিয়ে মোছা যায় না। গ্রাম তার সারল্য নিয়ে শহরে ঢুকে পড়েছে, আর শহর তার আধুনিকতা দিয়ে গ্রামকে চিনছে নতুন করে।

২০২৬ সালের ‘নতুন বাংলাদেশ’ আসলে এক নতুন আকাক্সক্ষার নাম। এই বৈশাখ সেই আকাক্সক্ষাকেই যেন ধারণ করেছে। গত কয়েক বছরের চড়াই-উতরাই পার করে মানুষ এখন এক বৈষম্যহীন মিলনের অপেক্ষায় থাকে। এবারের বৈশাখী মেলা কেবল কেনাবেচার হাট নয়, এটি হয়ে উঠেছে মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ের হালখাতা খোলার জায়গা। মেলার ভিড়ে যখন দেখি টুপি-পাঞ্জাবি পরা একজন বয়স্ক মানুষ আর টি-শার্ট জিনস পরা এক তরুণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চড়কগাছে চড়ছে, তখন মনে হয়- এটাই তো আমার দেশ। কোনো বিশেষ পোশাক বা বিশেষ মতাদর্শ এখানে বড় নয়, বড় হয়ে উঠেছে বাঙালির এক হওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ। এই যে উৎসবের মুক্তি, যেখানে ভয়ের চেয়ে অভয় আর বিভেদের চেয়ে মিলন বড় হয়ে দেখা দেয়, সেটাই নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত নির্যাস।

ব্যক্তিগত একটি স্মৃতির কথা মনে পড়ছে। বছর দশেক আগে একবার গ্রামে বৈশাখ কাটাতে গিয়েছিলাম। মেলায় এক বৃদ্ধ দাদু হাতে একটা মাটির ব্যাংক নিয়ে বসে ছিলেন। লাল রঙের ওপর হলুদ ছোপ দেয়া ব্যাংকটি হাতে নিয়ে যখন দাম জিজ্ঞেস করলাম, তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘টাকা দিয়ে কী হবে বাবা? তুমি তো শহরের মানুষ, এই ব্যাংকটা নিয়ে যাও, এতে করে তোমার ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো জমিয়ে রেখো।’ আজ এই পরিণত বয়সে এসে বুঝি, সেই ব্যাংকটা আসলে স্মৃতি জমানোর আধার ছিল না, ছিল আমাদের শেকড়ের প্রতি মমতা জমানোর এক প্রতীক। আজ আমাদের ঘরগুলোতে হয়তো প্রযুক্তির ছড়াছড়ি, কিন্তু ড্রয়িংরুমের সেই কোণে রাখা মাটির সরাটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের অস্তিত্বের কথা।

বৈশাখ মানেই তো ঝরঝরে নদীর মতো বয়ে চলা। কালবৈশাখীর যে তাণ্ডব চারপাশকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে শুদ্ধীকরণের মন্ত্র। জীর্ণ যা কিছু, যা কিছু পুরনো আর গ্লানিময়- তা ধুয়ে মুছে যাওয়ার নামই তো নববর্ষ। আমাদের জীবনেও তো কত ধুলো জমে! সম্পর্কের টানাপড়েন,

রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা ব্যক্তিগত বিষণœতা। বৈশাখ আসে সেই ধুলোগুলো ঝেড়ে ফেলে মনের হালখাতাটি নতুন করে শুরু করার ডাক দিয়ে। ২০২৬-এর এই সময়ে আমাদের শপথ হোক আরো গভীরে যাওয়ার। কেবল একদিনের সাজগোজ বা স্যোশাল মিডিয়ায় ছবির ভিড়ে যেন হারিয়ে না যায় আমাদের এই পরম লৌকিকতা। মেলার সেই খই-মুড়ির ঘ্রাণ, বাতাসার সেই টকটকে মিষ্টি স্বাদ, আর নাগরদোলার সেই অদ্ভুত রোমাঞ্চ- সব কিছু মিলিয়েই আমাদের বাঙালি জীবন। শহরের যান্ত্রিক নাগরিকরা আজ যখন নতুন করে এই মাটির গন্ধের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, তখন বুঝতে হবে আমরা এক গভীর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মানুষ আজ কৃত্রিমতার চেয়ে সত্যকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছে। তাই তো বৈশাখের এই মেলা এখন আর কেবল পণ্য বিক্রির জায়গা নেই, এটি হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির এক পবিত্র পুনর্জাগরণ কেন্দ্র।

শেষে এসে শুধু এটুকুই বলা যায়, পয়লা বৈশাখ কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনের নাম নয়, এটি আসলে আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে বৈশাখ বিদায় নেবে ঠিকই, কিন্তু রেখে যাবে সেই বাঁশির সুর যা আমাদের কানে কানে বলবে ‘তুমি তোমার শেকড়কে ভুলো না।’ নতুন বছরের এই শান্ত ভোরে আমাদের সবার প্রার্থনা হোক- ঘর সাজানোর সেই রং-বেরঙের মাটির সরার মতোই সুন্দর ও খাঁটি হোক আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। ধুলোবালির স্তর সরিয়ে আমরা যেন একে অপরের হাত ধরে বলতে পারি- এসো হে বৈশাখ, মুছে দাও সব জড়তা, আমাদের হৃদয়ে জ্বেলে দাও এক নতুন ভোরের আলো। শুভ নববর্ষ!