বিশেষ সংবাদদাতা
দেশে ৭০ শতাংশ পুরুষের আর ৫৮.৯ শতাংশ নারীর মোবাইল ফোনের মালিকানা রয়েছে। একইভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার পুরুষের ক্ষেত্রে হলো ৫৬.৬ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৫০.২ শতাংশ। এসব তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘আইসিটির প্রয়োগ ও ব্যবহার জরিপ ২০২৪-২৫’-এর প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পরিবারভিত্তিক টেলিভিশনের ব্যবহার কমছে, বিপরীতে বাড়ছে রেডিওর ব্যবহার; যা প্রচলিত ধারণার বিপরীত। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের হারও বেড়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো: ফরহাদ ছিদ্দিক। প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মিজ আলেয়া আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী ও মো: মীর হোসেন। মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক সৈয়দা মারুফা শাকি।
রেডিওর ব্যবহার বাড়ছে : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে ১২.৮ শতাংশ পরিবারে রেডিও ব্যবহৃত হতো, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৫.৩ শতাংশ। অন্য দিকে টেলিভিশনের ব্যবহার ৬২ শতাংশ থেকে কমে ৫৯.৬ শতাংশে নেমেছে।
বিবিএস কর্মকর্তারা জানান, এখন প্রচলিত রেডিও ছাড়াও মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ডিভাইসে রেডিও শোনার সুযোগ থাকায় এর ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে আবহাওয়ার তথ্য জানার জন্য রেডিও এখনো গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
প্রায় সব পরিবারেই মোবাইল ফোন : দেশে পরিবারভিত্তিক মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়ে ৯৮.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৯৭.৪ শতাংশ। তবে ল্যান্ডফোনের ব্যবহার তেমন বাড়েনি।
একই সাথে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া পরিবারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে- ৩৮.১ শতাংশ থেকে ৫৫.১ শতাংশে।
অঞ্চলভেদে বৈষম্য : জরিপে দেখা গেছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে জেলা, বয়স ও লিঙ্গভেদে বৈষম্য রয়েছে। বিভাগভিত্তিক মোবাইল ফোন ব্যবহারে চট্টগ্রাম এগিয়ে থাকলেও ঢাকায় তুলনামূলক কম। তবে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সুবিধায় ঢাকার পরিবারগুলো এগিয়ে, আর পঞ্চগড় সবচেয়ে পিছিয়ে।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়- মোবাইল ফোন ব্যবহারে এগিয়ে কিশোরগঞ্জ, পিছিয়ে নড়াইল; ইন্টারনেট সুবিধায় এগিয়ে ঢাকা, পিছিয়ে পঞ্চগড়; স্মার্টফোন ব্যবহারে এগিয়ে কুমিল্লা; কম্পিউটার ব্যবহারে এগিয়ে ঢাকা, পিছিয়ে রয়েছে ঠাকুরগাঁও।
এ ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ মূলত কপি-পেস্টভিত্তিক কাজেই সীমাবদ্ধ থাকছেন, যা ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।
বৈশ্বিক সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ
আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর ৬৪.৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ৭৮ এবং নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের গড় ৬৬। বাংলাদেশের তুলনায় মিয়ানমার (৬৯.৭), শ্রীলঙ্কা (৭১.৪), ভুটান (৮৫.৭), ভিয়েতনাম (৮৬) ও মালদ্বীপ (৮১.৭) এগিয়ে রয়েছে।
কম্পিউটার ব্যবহারে বড় ঘাটতি : জাতীয় পর্যায়ে কম্পিউটার ব্যবহার মাত্র ১১.৩ শতাংশ এবং পরিবারে কম্পিউটার সুবিধা রয়েছে মাত্র ৯ শতাংশের। শহর ও গ্রামের মধ্যে এ ব্যবধান স্পষ্ট- গ্রামে ৫ শতাংশ, শহরে ২৫.৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম্পিউটারের স্বল্প ব্যবহার ডকুমেন্ট প্রসেসিং, স্প্রেডশিট, কনটেন্ট তৈরি ও চাকরির দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে শুধু মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল বিস্তার যথেষ্ট নয়।
অনলাইন সেবার চাহিদা বেশি, ব্যবহার কম : গত তিন মাসে মাত্র ১১.৬ শতাংশ মানুষ অনলাইনে পণ্য বা সেবা কিনেছেন। আর গত এক বছরে মাত্র ১৬.৯ শতাংশ নাগরিক অনলাইনে সরকারি সেবার সাথে যোগাযোগ করেছেন।
তবে অনলাইনে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখতে চান ৬৪.২ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক তথ্যের চাহিদা রয়েছে ৪৯.৮ শতাংশের।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি জনসেবামূলক ডিজিটাল সেবার প্রতি উচ্চ চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। তবে সেবার নকশা, ব্যবহারযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নত করা গেলে ডিজিটাল ব্যবহারের হার আরো দ্রুত বাড়তে পারে।



