যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ফের শান্তি আলোচনায় সচেষ্ট পাকিস্তান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু করতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে গেছে এবং বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান দুই দেশের মধ্যকার মতভেদ দূর করতে কাজ করছেন। পাকিস্তান মনে করে ইসরাইল এই অঞ্চলে শান্তি চায় না। তবে এই শাটল ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে পাকিস্তান আশাবাদী যে তারা দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু করতে পারবে অথবা অন্তত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৪৭ দিন বা পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়াতে পক্ষগুলোকে রাজি করাতে পারবে।

তুরস্কের পক্ষ থেকেও এই আলোচনাকে গঠনমূলক করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ন্যাটোর সদস্য এবং ইরানের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে তুরস্ক এই শান্তি আলোচনায় সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে যে তারা চলমান যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। আগামী সপ্তাহান্তে তুরস্কের আন্তালিয়ায় পাকিস্তান সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে যেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উপস্থিত থাকতে পারেন। এদিকে পাকিস্তানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে কর্মকর্তাদের সাথে ওয়াশিংটনের আলোচনার বিষয়ে কথা বলেছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র এই আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে পরবর্তী বৈঠক পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা লোহিত সাগর এবং ওমান সাগরে বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করে দেবে। অন্যদিকে মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আনা একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়েছে যা মূলত কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ইরানের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।

লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা কমছে না। ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালিয়ে চারজন প্যারামেডিককে হত্যা করেছে এবং আরো ছয়জনকে আহত করেছে। ইসরাইলি বিমান হামলায় টায়ার ও সিডন অঞ্চলের সংযোগকারী প্রধান কাসমিয়া ব্রিজটি ধ্বংস হয়ে গেছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন জানিয়েছেন যে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধবিরতি সরাসরি আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে তবে ইসরাইলি বাহিনীকে অবশ্যই লেবানন সীমান্ত থেকে সরে যেতে হবে। আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধও চলছে। হিজবুল্লাহ ইসরাইলি বাহিনীর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বড় ধরনের মতভেদ এখনো কাটেনি। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক বিধিনিষেধের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর মধ্যেই ইরানে গত ৪৮ দিন ধরে ইন্টারনেট সেবা প্রায় বন্ধ রয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে সফর করবেন বলে জানা গেছে যেখান থেকে শান্তি আলোচনার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বন্দিবিনিময় ও যুদ্ধের ফলে লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের ভাগ্য এখন পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।

পারমাণবিক ইস্যুতে বড় অগ্রগতির পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বড় চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।

হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটানো এই যুদ্ধ বন্ধে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পর পাকিস্তানি কর্মকর্তারা একটি বড় ধরনের সফলতার আশা করছেন।

বুধবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছান। ইরানের সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে যে তিনি ওয়াশিংটনের একটি বিশেষ বার্তা ইরানি নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দিতে সেখানে গেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আলোচনার সুযোগ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। সেনাপ্রধান আসিম মুনির দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে কাজ করছেন। আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভেদ জানিয়েছেন যে পারমাণবিক ফ্রন্টে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে মূল আলোচনার বিষয় হলো ইরান কত দিন পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখবে এবং তাদের কাছে থাকা ৪৪০ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে। ওয়াশিংটন চাইছে ২০ বছরের জন্য এই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে আর ইরান চাইছে পাঁচ বছরের সময়সীমা। তবে মধ্যস্থতাকারীরা মাঝামঝি কোনো সমাধানের চেষ্টা করছেন। এই ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম হয় কোনো তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে অথবা এর মান কমিয়ে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।

ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর পাকিস্তান বর্তমানে শাটল ডিপ্লোম্যাসি বা দ্বিমুখী কূটনীতি চালাচ্ছে। তিনটি প্রধান বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা চলছে : পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই যুদ্ধ শুরু করার পর ইরানে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরাইলি হামলায় আরো দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননে ইসরাইলি হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বর্তমানে সৌদি আরব সফর করছেন এবং সেখান থেকে তিনি কাতার ও তুরস্কে যাবেন। পাকিস্তানের এই দ্বিমুখী কৌশলের লক্ষ্য হলো শান্তি চুক্তির বিরোধিতাকারীদের শান্ত করা। বিশ্লেষকদের মতে ইসরাইল এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি চায় না এবং তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার খুব কাছাকাছি এবং বিশ্ব আগামী দুই দিনে বড় কিছু দেখতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউজ থেকেও জানানো হয়েছে যে পরবর্তী আলোচনা আবারো ইসলামাবাদে হতে পারে।

এদিকে তেহরান নিশ্চিত করেছে যে পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে তাদের বার্তা আদান-প্রদান চলছে। তবে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কমেনি কারণ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ অবরোধ বজায় রয়েছে। ইরান এই অবরোধকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে এবং হুমকি দিয়েছে যে অবরোধ তুলে না নিলে তারা লোহিত সাগরসহ পুরো অঞ্চলে বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করে দেবে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও বন্দিবিনিময় এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আশায় বিশ্ব এখন ইসলামাবাদের পরবর্তী বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে।