ক্রীড়া প্রতিবেদক
মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়াম আজ সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক ভিন্ন আবহের লড়াইয়ের। আজ বেলা ১১টায় শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচ; যা সময়ের দিক থেকেও ব্যতিক্রম। এত সকালে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য প্রায় নতুন, আর এই অচেনা সময়ই বাড়তি উত্তেজনা যোগ করেছে ম্যাচটিতে। জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণেই বেলা ২টার ম্যাচ বেলা ১১টায় আনা হয়েছে।
ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের লড়াই বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখন পর্যন্ত দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ৪০-এর বেশি ম্যাচে, যেখানে পরিসংখ্যানে এগিয়ে নিউজিল্যান্ড। কিউইদের জয় সংখ্যা ৩০-এর কাছাকাছি, বিপরীতে বাংলাদেশের জয় প্রায় ১০টির মতো। তবে ঘরের মাঠে চিত্রটা অনেকটাই ভিন্ন। মিরপুরে টাইগাররা বরাবরই কঠিন প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে স্পিননির্ভর কন্ডিশনে নিউজিল্যান্ডকে বেশ ভুগতে হয়েছে অতীতে।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও বাড়তি রোমাঞ্চ ছড়াচ্ছে এই সিরিজে। ঘরের মাঠে শেষ কয়েকটি সিরিজে বাংলাদেশ নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। মাসখানেক আগেই তো ২-১-এ হারাল পাকিস্তানকে। অন্য দিকে নিউজিল্যান্ডও তাদের নিয়মিত শৃঙ্খলাপূর্ণ ক্রিকেট দিয়ে যেকোনো কন্ডিশনে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সক্ষম। দুই দলের সাম্প্রতিক পাঁচ ম্যাচের লড়াইয়েও কিউইরা এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ ঘরের মাঠে একাধিক স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে।
এই সিরিজের শুরুটা তাই দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সময়, পরিচিত ভেনু আর পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব মিলিয়ে প্রথম ম্যাচটি হয়ে উঠতে পারে এক উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই। জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে দুই দল, আর মিরপুরের গ্যালারিতে বসে দর্শকরা অপেক্ষায় থাকবেন আরেকটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের।
শুরু থেকেই জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামার কথা জানিয়েছেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। তার দৃষ্টিতে এই সিরিজ শুধু একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং ২০২৭ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই বিবেচিত। ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে বোর্ডের সাম্প্রতিক অস্থিরতা দলের পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলছে না। শুরুটা জয় দিয়েই শুরু করতে চান মিরাজ। প্রথম ম্যাচ জয় পেলে পরের ম্যাচগুলো সহজ হয়ে যায়।
২০২৩ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলেছিল কিউইরা। সেই সিরিজে ২-০ ব্যবধানে জয় পায় ল্যাথামের দল। ওটিই এখনো প্রেরণা উৎস। সাফ সাফ এই অধিনায়ক জানিয়ে দিলেন তারা সিরিজ জিততেই এসেছেন। দলে হয়তো অভিজ্ঞ প্লেয়ার কম, তবে তারুণ্যের ঝলক দেখানোর সুযোগ তাদের সামনে। ওরা ভালো কিছু নিয়েই দেশে ফিরতে চায়। দলীয় হিসেবে তারা দেশের জন্য পারফর্ম করবে।
এই সিরিজে বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্ব বহন করছে ফলাফল এবং র্যাঙ্কিংয়ের হিসাব। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানকে হারিয়ে আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে উঠে এসেছে দলটি। বর্তমান পয়েন্ট ৭৯। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, যারা রয়েছে ২ নম্বরে, তাদের বিপক্ষে ভালো ফল করতে পারলে পয়েন্ট বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতলে বাংলাদেশের পয়েন্ট দাঁড়াবে ৮৩, আর হোয়াইটওয়াশ করতে পারলে তা ৮৫-এ পৌঁছাবে। যদিও এতে সাথে সাথে র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি না হলেও, ৮ নম্বরে থাকা ইংল্যান্ডের কাছাকাছি চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্য দিকে সিরিজে হারলেও কিছুটা সান্ত¡না আছে। ২-১ ব্যবধানে হারলে একটি পয়েন্ট যোগ হবে, তবে ৩-০ ব্যবধানে হেরে গেলে একটি পয়েন্ট কমে যাবে। তবুও র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে, কারণ ওয়েস্ট ইন্ডিজ রয়েছে ঠিক পেছনে ৭৭ পয়েন্ট নিয়ে।
নিউজিল্যান্ডের জন্য এই সিরিজ তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ। র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষের দিকের দল হওয়ায় তাদের লাভের সুযোগ কম, বরং হারলে বড় ধরনের পয়েন্ট খোয়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে তাদের পয়েন্ট ১১৪। বড় ব্যবধানে হারলে অস্ট্রেলিয়ার সাথে পয়েন্ট সমান হয়ে যেতে পারে, যদিও সামান্য ব্যবধানে তারা দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখতে পারে।
বিশ্বকাপের দৌড়ে এই সিরিজের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা। আগামী বছরের ৩১ মার্চ র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে কোন দলগুলো সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে সরাসরি সুযোগ পেলেও, বাকি আটটি জায়গার জন্য চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দর্শকদের অভিজ্ঞতাকেও এবার গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এক ভিডিওবার্তায় জানিয়েছেন, এত দিন খেলোয়াড় ও স্টাফদের সুবিধা নিয়ে কাজ হলেও দর্শকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে সরাসরি মতামত নেয়ার উদ্যোগ ছিল না।
এবার ম্যাচে উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে লটারিতে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে তাদের সাথে সরাসরি কথা বলবেন তামিম। গেট দিয়ে প্রবেশ থেকে শুরু করে আসনে বসা, খাবার-পানীয় কিংবা সামগ্রিক পরিবেশ-সব কিছু নিয়েই তাদের অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করা হবে। একই সাথে বিসিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও গ্যালারিতে গিয়ে দর্শকদের মতামত সংগ্রহ করবেন এবং তা বোর্ডে উপস্থাপন করবেন।
সমর্থকদের মাঠে আসার আহ্বান জানিয়ে তামিম বলেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনার মাধ্যমেই ভবিষ্যতে আরো উন্নত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে। তার লক্ষ্য, মাঠে খেলা দেখতে আসা যেন শুধু একটি ম্যাচ দেখা না হয়ে, বরং একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।



