নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে যে, অনুপ্রবেশ এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ ঠেকাতে বাংলাদেশের সাথে সীমান্তের নদীতীরবর্তী অংশে বিষধর সাপ ও কুমির ছাড়ার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে ভারত সরকার। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনে ভারতীয় ও বাংলাদেশী কূটনীতিকদের কাজ করে যাওয়ার মধ্যেই এ পরিকল্পনা প্রকাশ পেলো। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার এ অপ্রচলিত, এমনকি বিতর্কিত কৌশল আত্মঘাতী মোড় নিতে পারে।
ঢাকায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুইপক্ষ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য কাজ করছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও শিগগিরই ভারত সফরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। উভয় পক্ষের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা সম্পর্ক মেরামতের জন্য ছোট ছোট পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
২৬ মার্চ ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) সদর দফতর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর মাঠ পর্যায়ের ইউনিটের কর্মকর্তাদের কাছে একটি অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। এতে ‘কার্যকরী দৃষ্টিকোণ থেকে’ ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীরবর্তী ফাঁকগুলোতে যেখানে সীমান্তে বেড়া দেয়া কঠিন সেখানে সরীসৃপ (যেমন সাপ বা কুমির) মোতায়েনের সম্ভাব্যতা’ মূল্যায়ন করতে বলা হয়। ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা জানিয়েছে, সরীসৃপের ব্যবহার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশের চেষ্টাকারী বাংলাদেশী নাগরিকদের দেখামাত্র গুলি করার বিএসএফের নীতিটি কয়েক দশক ধরে একটি উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। ২০১১ সালে কাঁটাতারে আটকে বিএসএফের গুলিতে নিহত ১৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী ফেলানী খাতুনের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাবের এক প্রবল ঢেউ তুলেছিল।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জলাভূমিতে যদি ভারত বিষাক্ত সাপ ও কুমির ছেড়ে দেয়, তবে সীমান্তে একই রকম, এমনকি আরও ভয়াবহ ঘটনার আশঙ্কা করা যেতে পারে। এতে শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাই নয়, সীমান্তের উভয় পাশের গ্রামবাসীরাও নিহত হবেন, বিশেষ করে যেহেতু এগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। বস্তুত, নিরাপত্তা বাহিনীও নিরাপদ থাকবে না। সীমান্ত বেড়া অভিবাসন থামাতে পারে না। এমনকি সামরিক বেড়াগুলোও বড়জোর কেবল স্রোতের গতি কমাতে পারে। তাহলে ভারতের সরকারগুলো, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ও বিদেশবিদ্বেষী সরকারগুলো, কেন অত্যন্ত সামরিকায়িত সীমান্ত বেড়া নির্মাণে আগ্রহী? ‘ভায়োলেন্ট বর্ডারস : রিফিউজিস অ্যান্ড দ্য রাইট টু মুভ’ বইয়ের লেখক রিস জোন্স ২০১৭ সালে বলেছিলেন যে সীমান্ত বেড়াগুলো হলো ‘জাতীয়তাবাদী প্রতীক’ এবং এগুলো ‘অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে বাদ দেয়ার ধারণাকেই’ তুলে ধরে।
ভারতের শাসক হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা মুসলিমদের বাদ দিতে পছন্দ করেন এবং প্রায়শই তাদের বক্তৃতায় বাংলাদেশী মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু বানান। তারা বাংলাদেশীদের ‘ঘুষপৈতিয়া’ (অনুপ্রবেশকারী) হিসেবে আখ্যা দেন, যাদের খুঁজে বের করে বিতাড়িত করা উচিত। অমিত শাহ বাংলাদেশী অভিবাসীদের ‘উইপোকা’-এর সাথেও তুলনা করেছেন।
বিজেপি নেতারা প্রায়শই ‘বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মিয়া মুসলিমরা’ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে গ্রাস করে ফেলছে, এ জুজু দেখিয়ে ভীতি ছড়ান। এটি এমন একটি কৌশল যা আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জনগণকে মেরুকরণের জন্য বারবার ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশী মুসলিমদের জুজু শুধু বিজেপি নেতাদের নির্বাচনী বাগাড়ম্বরেই নয়, বরং কেন্দ্র ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপি সরকারের নীতিতেও স্থান পেয়েছে, যেখানে ভারতীয় মুসলিমসহ নাগরিকত্বের অপ্রতুল কাগজপত্র থাকা ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ‘ঠেলে ফেরত পাঠানো’ হচ্ছে। যদিও কেন্দ্রে কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় সরকারই অবৈধ অভিবাসী ও অপরাধীদের প্রবেশ ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, বিজেপি এ কাজটি অনেক বেশি আগ্রাসীভাবে করেছে, কারণ হিন্দু আধিপত্যবাদীদের শত্রুর ভাবমূর্তি তৈরিতে বাংলাদেশী মুসলিমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশী মুসলিমদের প্রবেশ ঠেকাতে কুমির ও সাপ মোতায়েনে শাহের প্রস্তাবটিকে দেখতে হবে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সীমান্ত রয়েছে, যা সমভূমি, পাহাড়, জঙ্গল ও নদীর মধ্য দিয়ে বিস্তৃত। ভারত এ সীমান্তের বেশিরভাগ অংশেই বেড়া দিয়েছে। তবে এ সীমান্তের ৮৫০ কিলোমিটার অংশে এখনো বেড়া দেয়া বাকি, যার মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার নদী ও জলাভূমির মধ্য দিয়ে যাওয়ায় বেড়া দেয়ার জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।
দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশীদের ভারতে অভিবাসন একটি বিতর্কিত বিষয়। এ অভিবাসনের ফলে সৃষ্ট জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে একটি শক্তিশালী ‘বিদেশী-বিরোধী’ আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম দেয়। এর পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তিতে। এ চুক্তিতে বলা হয়েছিল যে, ‘উপযুক্ত স্থানে দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার মতো ভৌত প্রতিবন্ধকতা নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্তকে ভবিষ্যতের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর স্থল ও নদীপথে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল যথাযথভাবে জোরদার করতে হবে।’
পরের বছরই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেয়ার কাজ শুরু হয়। তবে, এর নির্মাণকাজ ধীরগতিতে এগিয়েছে, শুধু যে দুর্গম ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে এটি গেছে তার জন্যই নয়, বরং সীমান্ত নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও ছিল বেশ কঠিন। কিছু কিছু জায়গায় গ্রামগুলো আন্তর্জাতিক সীমান্তের একেবারে শূন্য রেখা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং সেখানকার বাসিন্দাদের তাদের জমি ছেড়ে দিতে রাজি করানো কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সীমান্তে বেড়া দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেও তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের যুক্তি হলো, ১৯৭৫ সালের ‘সীমান্ত কর্তৃপক্ষের জন্য যৌথ ভারত-বাংলাদেশ নির্দেশিকা’ আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছিল। ভারত দাবি করে যে, তাদের এক সারির বেড়া কোনো ‘প্রতিরক্ষা কাঠামো’ নয়।
ভারতের বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মধ্যে উত্তেজনা সময়ে সময়ে বেড়েছে, যা গোলাগুলিতেও রূপ নিয়েছে। প্রায়শই বেসামরিক নাগরিকরা এ গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তী ১৮ মাসে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই দুর্বল হয়নি, ভারত-বিরোধী মনোভাবও অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পায়।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তার পাকিস্তানি প্রতিপক্ষ হিনা রাব্বানী খার-এর উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আপনি আপনার বাড়ির উঠোনে সাপ রেখে আশা করতে পারেন না যে তারা কেবল আপনার প্রতিবেশীদেরই কামড়াবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘অবশেষে সেই সাপগুলো তাদের ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়বে, যাদের উঠোনে তারা আছে।’
ক্লিনটনের এ মন্তব্যটি এসেছিল পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সে নীতির প্রেক্ষাপটে, যেখানে তারা তাদের প্রতিবেশীদের সাথে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সন্ত্রাসীদের লালন-পালন করে। অমিত শাহের উচিত ক্লিনটনের এ মন্তব্যটি মনে রাখা। তার পরিকল্পনা সফল হলে, সীমান্তে তিনি যে কুমিরগুলো মোতায়েন করবেন, সেগুলো বাংলাদেশী ও ভারতীয়দের মধ্যে পার্থক্য করবে বলে মনে হয় না। তার এ পরিকল্পনা ভারতের ভূখণ্ড বা তার নাগরিকদের সুরক্ষিত করতে পারবে না। এটি বিপর্যয়কর ছাড়া আর কিছুই নয়।



