জ্বালানি তেলের জন্য রায়হানের ২৭ ঘণ্টার অপেক্ষা

ঢাকার বাইরে থেকেও তেল নিতে আসছে গাড়ি

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

বুধবার সকাল ৮টা। জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে খবর পেয়ে চালক রায়হান উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর থেকে ছুটে আসেন মৎস্যভবনের সামনের রমনা ফিলিংস্টেশনে। কিন্তু সেখানে ছিল জ্বালানিপ্রত্যাশী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। তড়িঘড়ি করে তিনিও দাঁড়িয়ে যান লাইনে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। অবৈধ পার্কের অপরাধে ট্রাফিক সার্জেন্ট তার গাড়িকে মামলা করে দেন। ফলে ওই লাইনে তিনি আর থাকতে পারেননি। বাধ্য হয়ে সকাল ১০টার দিকে চলে যান নিকুঞ্জ ফিলিংস্টেশনের উদ্দেশে। সেখানে লাইন শুরু হয়েছে বনানী নৌবাহিনীর সদর দফতরের সামনে থেকে। প্রয়োজনের কারণে সেখানেই দাঁড়িয়ে যান রায়হান। এরপর দুপুর আসে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। রায়হানের গাড়িও গুটি গুটি করে সামনে এগোতে থাকে। তখন রাত ১১টা। রমিজ উদ্দিন কলেজের সামনে পৌঁছালে খবর আসে পাম্পের তেল শেষ।

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে রায়হানের। কিন্তু বাসায় ফিরে যাওয়ার মতো তেল তার গাড়িতে তখন আর অবশিষ্ট নেই। আবার লাইন ছেড়ে দিলে সেই শুরু থেকে সিরিয়াল ধরতে হবে। তাই সারা রাত রাস্তায় অপেক্ষা করতে থাকেন তেলের জন্য। রাত গিয়ে পরদিন বৃহস্পতিবার ভোর আসে। সকাল ৮টা থেকে ১০টা বাজে। রায়হানের গাড়িও একটু একটু করে এগোতে থাকে পাম্পের দিকে। অবশেষে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় সেই কাক্সিক্ষত তেল পেয়ে যান তিনি।

শুধু রায়হান একা নন, এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার গাড়ি চালক। তাদের অভিযোগ রাজধানী ঢাকায় অসংখ্য তেলের পাম্প থাকলেও হাতেগোনা কয়েকটি পাম্পে তেল সরাবরাহ করা হচ্ছে। বাকিগুলো নামমাত্র দিনের কোনো এক সময় দু-এক ঘণ্টার জন্য খুলে আবার বন্ধ করে দিচ্ছে। জানা যায়, রাজধানী ঢাকার আশপাশের অনেক চালকই গাড়ি নিয়ে তেল নিতে ঢাকায় আসছেন। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেলের উপস্থিতি দেখা যায় পাম্পের সামনের লাইনে।

রাতে থাকার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রায়হান বলেন, প্রচণ্ড গরমে দরজা জানালা বন্ধ করে গাড়ির মধ্যে থাকা যায় না। গাড়ি থেকে বের হলে মশার কামড়ে টেকা যায় না। আবার গাড়ি ছেড়ে গেলে চুরি হওয়ার ভয় থাকে। এর আগে ধানমন্ডি থেকে গাড়ি চুরির ঘটনাও ঘটেছে। খুবই কষ্ট নিয়ে রাত পার করতে হয়েছে তাদের। তিনি বলেন, ওই লাইনে শুধু তিনি নন, আরো অনেক গাড়ি অপেক্ষা করছিল তেলের জন্য।

লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে কোথাও কোথাও বাগি¦তণ্ডা এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। নীলক্ষেতে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ঘিরে এমনই একটি ঘটনা ঘটে। কয়েকজন অভিযোগ করেন, তিনি লাইনের নিয়ম ভেঙে সামনে ঢুকে পড়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি দাবি করেন, ভোর ৬টায় তিনি সিরিয়াল দিয়েছিলেন এবং ক্লান্ত হয়ে সাময়িকভাবে সরে গিয়ে পরে ফিরে আসেন। এ নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসেন। দুপুরে একই চিত্র দেখা গেছে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিংস্টেশনের সামনে।

তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা অনেকেই সরকারের বক্তব্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এখনো বলা হচ্ছে দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। অথচ পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার বেশির ভাগ পাম্পই বন্ধ থাকছে। ঢাকার বাইরের চিত্র আরো ভয়াবহ। তাহলে তেল যাচ্ছে কোথায়? গ্রাহকরা বলছেন, সরকারের উচিত দেশে তেলের মজুদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে জনগণকে সচেতন করার কর্মসূচি হাতে নেয়া। তা না হলে এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে।

পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরম অসহায়ত্বের মধ্যে আছি আমরা। ডিপো থেকে আমাদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আগে যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার তেল পেতাম, এখন তার অর্ধেকও মিলছে না। ক্রেতারা এসে ভিড় করছেন, কিন্তু তেল না থাকায় আমরা পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছি। এতে করে সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, অথচ সঙ্কটের মূল কারণ আমাদের হাতে নেই। তারা বলেন, ডিপো পর্যায়ে তেলের লোডিংয়ে দীর্ঘ সময় লাগছে। আমাদের গাড়িগুলো দিনের পর দিন ডিপোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকছে। সময়মতো তেল না আসায় পাম্পে নোটিশ ঝোলাতে হচ্ছে ‘তেল নেই’। এর ফলে আমাদের নিয়মিত গ্রাহকরা ফিরে যাচ্ছেন এবং পাম্পের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। সরকারের উচিত আমদানিকৃত তেলের খালাস ও বণ্টনপ্রক্রিয়া আরো দ্রুত এবং স্বচ্ছ করা।