ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ ও ধর্মীয় মতবিরোধ

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার সময় রেজা শাহের মতো স্বৈরশাসককে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হস্তক্ষেপ করেছিল। তাতে সংক্ষুব্ধ হয়ে তখনকার তরুণ বিপ্লবীরা মার্কিন দূতাবাসে কূটনীতিকদের দীর্ঘদিন জিম্মি করে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামরিক হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জিম্মিদের মুক্ত করে নিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তখন থেকে ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেনি; বরং সেই থেকে দেশটির ওপর বিভিন্ন প্রকারের বাধা বিশেষ করে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, তহবিল আটক ও পরমাণু শক্তি অর্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে, যা কয়েক দশক ধরে এখনো চলছে

ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব
ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

(প্রথম কিস্তি)

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে তা কি একটি ধর্মযুদ্ধ (ক্রুসেড)? এককথায় পরিষ্কার জবাব পাওয়া কঠিন। কারণ, নানাজন নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা ও ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা এবং বুদ্ধিজীবী ইরানে আক্রমণকে ‘ক্রুসেড’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়নি। আবার একে ক্রুসেড বলার সুযোগ নেই এ জন্য যে, ইউরোপের কয়েকটি খ্রিষ্টান রাষ্ট্র যেমন- স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড এ যুদ্ধের প্রতিবাদ করেছে। এমনিক ভ্যাটিকানের পোপও এর সমালোচনা করেছেন। অন্য দিকে ইরান আক্রান্ত হয়ে ইসরাইল ও উপসাগরীয় মুসলিম দেশগুলোর প্রতি মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এ নিয়ে মুসলিম বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের কতিপয় ওয়ায়েজিন (যারা প্রায়ই লাগামহীন কথাবার্তা বলেন) তারা ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের মধ্যে শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারির প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। একজন পীর আবেগের বসে বলে ফেলছেন, ইরান নবীর দেশে আক্রমণ করেছে। এসব ব্যক্তি গাজার মুসলিমদের ওপর ইসরাইলি নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তেমন মুখর নয়; মুসলমানদের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তারা বেখবর। তারা ইমাম মাহদি ও দাজ্জালের আবির্ভাব নিয়ে বিতর্ক করেন। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতি তথা ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে একটু অতীতে ও গভীরে যেতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব হচ্ছে সবচেয়ে প্রভাবশালী। এমনকি পবিত্র মক্কা ও মদিনার কারণে দেশটি এখন মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে পরিচিত। এতে মুসলমানদের আবেগের জায়গাও রয়েছে। কিন্তু মুসলমানদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কী সৌদি আরবের কোনো সক্রিয় উদ্যোগ দেখা যায়? বরং, দেশটির সাথে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বেশি লক্ষণীয়।

স্মরণযোগ্য যে, ১২৯৯-১৯২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯০০ বছর উসমানীয় তথা তুর্কি সুলতানরা মুসলিম বিশ্ব শাসন করেছেন। এ সময় পারস্য উপদ্বীপের অধিকাংশ এলাকা যাযাবর বেদুইনদের দখলে থাকায় সেখানে উসমানীয় শাসনের স্থায়ী কোনো প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। একমাত্র মক্কা ব্যতীত আরব উপদ্বীপের অন্যান্য এলাকা উসমানীয় শাসকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণও ছিল না। মক্কা ও মদিনা তথা হিজাজ অঞ্চলের শাসকরা আগের নজদ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, দুবাই, আবুধাবি- এসব এলাকা স্থানীয় গোত্রপ্রধানরা শাসন করতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে নজদ এলাকায় একজন ধর্মীয় নেতার আর্বিভাব ঘটে। তিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব (১৭০২-৯২) যিনি মদিনার ইসলামী পরিবেশে শিক্ষিত হয়েছিলেন। তিনি নজদে ফিরে এসে কেবল কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাজ সংস্কারে উদ্যোগ নেন। তিনি উসমানীয় আমলে ছড়িয়ে পড়া সুফিবাদ ও বিদয়াতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তার এ তৎপরতা নজদ এলকার দিরাই গোত্রের নেতা মুহাম্মদ ইবনে সউদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি তাকে পূর্ণ সমর্থন দেন। এমনকি ইবনে আবদুল ওয়াহাবের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তায় আবদ্ধ হন। তারা একটি সমঝোতায় উপনীত হন, ইবনে সউদ পরিবার এলাকায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেবে এবং তারা ধর্মীয় সংস্কার কাজে ইবনে আবদুল ওয়াহাবকে সহযোগিতা করবে। উভয়ের পারস্পরিক সহযোগিতায় নজদ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। একপর্যায়ে সামরিক শক্তির জোরে তারা রিয়াদে রাজধানী স্থাপন করে। ১৮০৩ সালে তারা মক্কা ও মদিনা দখলে নেয়। ১৮১৪ সাল পর্যন্ত দখলে রাখে। উসমানীয় শাসকরা তখন শক্তি প্রদর্শন করতে বিলম্ব করে। উসমানীয় সুলতান মিসরের গভর্নর মোহাম্মদ আলী পাশাকে দায়িত্ব দেন মক্কা ও মদিনা উদ্ধারে। তিনি তার পুত্র ইবরাহিমের নেতৃত্বে একটি বাহিনী মক্কা, মদিনা ও রিয়াদ পুনরুদ্ধারে পাঠান। তিনি সউদ বাহিনীকে পরাজিত করেন। রিয়াদে একটি ছোট বাহিনী রেখে মিসরে ফিরে যান। উসমানীয়রা ভেবেছিল, সউদ বাহিনীর যুগ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল ছিল। দীর্ঘদিন চড়াই-উতরাইয়ের পর সৌদি প্রিন্স আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ১৯০১ সালে এক বাহিনী রিয়াদ দখল করে নেয়। পুরো নজদ এলাকায় তার নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ওয়াহাবি চেতনায় সমাজ সংস্কারও চলতে থাকে। ১৯১৩ সালে তারা পূর্বদিকের হাসা প্রদেশও দখলে নেয়। এ সময়ে পারস্য উপদ্বীপের গোত্রশাসিত দেশগুলোতে ব্রিটেনের প্রভাব ছিল। তারা বিশ্ব বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য উপসাগরীয় নৌপথ নিরাপদ রাখার স্বার্থে গোত্রশাসিত উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে।

ব্রিটেন আবদুল আজিজের উত্থান পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তার সাথে গোপন সংযোগ স্থাপন করে। উসমানীয় শাসনের বিরুদ্ধে সউদ পরিবারের উত্থানকে ব্রিটেন সহযোগিতা করার কৌশল নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে খণ্ড-বিখণ্ড করার ষড়যন্ত্র করে। এর অংশ হিসেবে ১৯১৬ সালে আবদুল আজিজকে বার্ষিক অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। সে বছর সৌদি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে সউদ পরিবারের সাথে ব্রিটেনের গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। ব্রিটেনের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুবাদে সউদ পরিবারের আত্মবিশ্বাস ও সাহস বেড়ে যায়। তারা মক্কা-মদিনা তথা হিজাজের প্রতি নজর দেয়। এ সময়ে হিজাজের উসমানীয় গভর্নর ছিলেন শরিফ হোসেন ইবনে আলী; (১৮৫৫-১৯৩১) যিনি হাশেম বংশীয় ছিলেন। রাসূল সা:-এর বংশধর হিসেবে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তাকে ১৯০৮ সালে হিজাজের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি তার কর্তব্য পালনে আন্তরিক না হয়ে হিজাজে তার বংশীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দেন। এ জন্য তিনি একটি বৃহৎ শক্তির সহযোগিতা খুঁজছিলেন। এ জন্য ব্রিটেনকে বেছে নেন। ব্রিটেন তাকে উসমানীয় সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহ দেয়। মিসরে নিযুক্ত ব্রিটিশ দূত তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন।

১৯১৯ সালে সউদ বাহিনী হিজাজ আক্রমণ করে। ব্রিটেন সউদ পরিবার ও শরিফ হোসেন উভয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে যাতে তুরস্কের উসমানীয় সালতানাতকে শেষ করা যায়। ১৯২২ সালে তারা সউদ পরিবার ও শরিফ হোসেনের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি করে দেয়। ব্রিটেন তখন সৌদি আরবে তেল অনুসন্ধানে সৌদি শাসকদের অনুমতি চায়। এ জন্য সাত হাজার ডলারের অনুদান ঘোষণা করে। ইবনে সউদ এতে খুশি হন। সেই সাথে ব্রিটেনের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা আরো বৃদ্ধি পায়। তার এক পুত্রকে ব্রিটেনে পাঠানো হয়।

ইবনে সউদ হিজাজ তথা মক্কা-মদিনা দখলের স্বপ্ন পরিত্যাগ করেননি। সউদ বাহিনী ১৯২৪ সালে হিজাজ দখল করে নেয়। ব্রিটেন এতে কোনো পক্ষ না নেয়ায় সউদ বাহিনী সহজে তাতে বিজয়ী হয়। শরিফ হোসেন অসহায় অবস্থায় পদত্যাগ করে তার ছেলে আলীকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। তবে তিনিও দেশত্যাগে বাধ্য হন। পরে ব্রিটিশরা হাশেম বংশের প্রতিনিধিদের খুশি করতে জর্দান রাষ্ট্র সৃষ্টি করে সেখানকার ক্ষমতায় বসায়। এ দিকে ১৯২৬ সালে আবদুল আজিজ ইবনে সউদ হিজাজের বাদশা ও নজদের সুলতান হিসেবে সিংহাসনে বসেন। ১৯২৭ সালে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন তাকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৩২ সালে আবদুল আজিজ হিজাজ ও নজদকে একত্র করে সৌদি আরব নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। এক ব্যক্তি বা পরিবারের নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তার নামকরণ বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা।

এবারে সৌদি পররাষ্ট্রনীতির পর্যালোচনা করা যাক। নতুন দেশটির পররাষ্ট্রনীতির প্রথম লক্ষ্য হলো সৌদি পরিবারের রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা। দ্বিতীয়ত, আরব বিশ্বে সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের যে উন্মেষ ঘটেছিল তা থেকে নিজ দেশ রক্ষা করা। তৃতীয়ত, ইরান ও ইরাকের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। চতুর্থত, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভূমিকা রাখা। এ দিকে ব্রিটেনের পর সৌদি রাজতন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে অন্যান্য এলাকাসহ মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ান কমিউনিজমকে প্রতিহত করা ছিল আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য। এ ছাড়া আমেরিকার প্রয়োজন ছিল তার বাণিজ্য ও বিশাল সামরিক বাহিনীকে সচল রাখতে পেট্রোলের অবাধ ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ জন্য সৌদি আরব থেকে তেল সংগ্রহ করা ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।

সৌদি সরকার আমেরিকার আরামকো তেল কোম্পানির সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি রাজতন্ত্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৪৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিসরে এক ক্রুজ জাহাজে সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজকে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তারা পারস্পরিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত হন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থরক্ষায় উভয়পক্ষ একমত হয়। ১৯৬৪ সালে সৌদি প্রিন্স ফয়সল ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তিনি তেলসম্পদের ব্যবহার করে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করার প্রতি মনোনিবেশ করেন।

১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেল-অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন উপায়ান্তর না দেখে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তিতে উপনীত হয়। এর মাধ্যমে বাদশাহ ফয়সাল তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্য কমিয়ে দেন। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি শর্ত সৌদি বাদশাহর কাছ থেকে আদায় করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দেয়, সৌদি আরব শুধু মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার শাসনের নিরাপত্তা দেবে। বাদশাহ তা খুশি হয়ে মেনে নেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হয়। বিশ্ব বাণিজ্যে মার্কিন ডলার মূল্যবান হয়ে ওঠে যার প্রভাব এখনো চলছে। অন্য দিকে সৌদি আরব হয়ে ওঠে মার্কিন অস্ত্র ক্রয়ের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী অস্ত্র ব্যবসার ৫৪ শতাংশ বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। তার মধ্যে সৌদি আরব হচ্ছে বড় ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সাথে ১৪২ বিলিয়ন ডলার ও ২০২৬ সালে ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি করে।

মজার বিষয় হলো- তেল বিক্রি করে সৌদিরা ডলারে যা আয় করে তার বড় একটি অংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায় অস্ত্র কেনার জন্য। আবার যুক্তরাষ্ট্র সেই অর্থ দেয় ইসরাইলকে মুসলিমদের হত্যা করতে। যুক্তরাষ্ট্র এরূপ দারুণ সুবিধা বজায় রাখার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে অনেকগুলো সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এ ছাড়া যুদ্ধ লাগিয়ে অস্ত্র বিক্রির বাজার চাঙ্গা রাখছে। এটি মূলত পুঁজিবাদী অর্থনীতির ধান্ধাবাজি। এরূপ স্বার্থ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য আমেরিকা ও ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলো ইসলামী বিপ্লব ধ্বংস করতে চায়।

আমরা দেখতে পাই, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার সময় রেজা শাহের মতো স্বৈরশাসককে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হস্তক্ষেপ করেছিল। তাতে সংক্ষুব্ধ হয়ে তখনকার তরুণ বিপ্লবীরা মার্কিন দূতাবাসে কূটনীতিকদের দীর্ঘদিন জিম্মি করে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামরিক হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জিম্মিদের মুক্ত করে নিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তখন থেকে ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেনি; বরং সেই থেকে দেশটির ওপর বিভিন্ন প্রকারের বাধা বিশেষ করে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, তহবিল আটক ও পরমাণু শক্তি অর্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে, যা কয়েক দশক ধরে এখনো চলছে। এ ছাড়াও ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে প্ররোচিত করে ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। বহু বছর ধরে সে যুদ্ধ চলে। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ইরাককে সহযোগিতা করে। কৌশলটি ছিল এক ভাইকে আরেক ভাই দিয়ে শায়েস্তা করা। এরপর ইরাক কুয়েত দখল করে নেয়। তখন আবার যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশগুলো দিয়ে ইরাককে শায়েস্তা করা হয়।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
[email protected]