২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল, ঢাকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে একে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তব প্রেক্ষাপট এই বৈঠককে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। কারণ এমন একসময়ে এই সাক্ষাৎ, যখন নতুন সরকার প্রকাশ্যে ভারতের সাথে ‘নতুন সম্পর্ক’ বা ‘পুনর্গঠিত সম্পৃক্ততা’র কথা বলছিল। এর পরপরই উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশী প্রতিনিধিদলের নয়াদিল্লি সফরের ঘোষণা আসে- যা এই বৈঠককে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার সূচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
এই দ্রুত সম্পৃক্ততা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ- নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনগুলোকে আগেভাগে বোঝা এবং নিরাপত্তা, জ্বালানি ও সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে ধারাবাহিকতা রাখা। অর্থাৎ- ভারত প্রথম থেকেই সম্পর্কের গতি ও দিক নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে চেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সম্পৃক্ততা অস্বাভাবিক নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং আঞ্চলিক নির্ভরতার কারণে ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখা অপরিহার্য; কিন্তু এই সম্পৃক্ততা কি নতুন শর্তে হচ্ছে, নাকি পুরনো কাঠামোই নতুন ভাষায় ফিরে আসছে?
কারণ যখন একটি নতুন সম্পর্কের কথা বলা হয়, তখন মানুষ শুধু ভাষা নয়, পরিবর্তন দেখতে চায়। কিন্তু যদি শুরুতেই আগের মতো দ্রুত ও একমুখী সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেখা যায়, তাহলে সেটি নতুন সূচনার বদলে পুরনো ধারাবাহিকতা বলেই মনে হতে পারে।
তৎপরতা, প্রতিচ্ছবি এবং আস্থা
ভারতের হাইকমিশনারের এই দ্রুত বৈঠক কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এটি ছিল কৌশলগত পদক্ষেপ। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুত অবস্থান নিশ্চিত করা, অনিশ্চয়তা কমানো এবং সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা- এই তিন লক্ষ্যই এখানে কাজ করেছে।
ঢাকার বৈঠকের পরপরই বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে, উভয় পক্ষই দ্রুত যোগাযোগ ধরে রাখতে চেয়েছে; কিন্তু এই গতির মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- এই তৎপরতা কি সমানভাবে দুই পক্ষের জন্য কাজ করছে, নাকি এক পক্ষের কৌশল অন্য পক্ষকে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে?
ভারতের জন্য দ্রুত সম্পৃক্ততা একটি পরীক্ষিত কূটনৈতিক পদ্ধতি। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগেভাগে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা মানে হলো নীতিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি কমিয়ে আনা। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সংযোগ- এসব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের তৎপরতা মূলত স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশল।
যখন একটি দেশ তার সম্পর্ককে ‘পুনর্নির্ধারণ’ করতে চায়, তখন প্রথম দিকের সঙ্কেতগুলো গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেই সঙ্কেতগুলোতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না থাকে; বরং আগের মতোই দ্রুত সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা দেখা যায়- তাহলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক, এখানে কি সত্যিই নতুন কিছু ঘটছে?
বিশেষ করে যখন দীর্ঘ দিনের কিছু অমীমাংসিত ইস্যু সামনে থাকে, যেমন- পানিবণ্টন, সীমান্তে উত্তেজনা এবং বাণিজ্যবৈষম্য, তখন দ্রুত সম্পৃক্ততা আস্থার পরিবর্তে সংশয়ের জন্ম দিতে পারে। কারণ জনগণ কেবল সংলাপ নয়, সংলাপের ফল দেখতে চায়। এখানেই আস্থার প্রশ্নটি সামনে আসে।
আস্থা কোনো ঘোষণার মাধ্যমে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। যেখানে মানুষ দেখতে পায়, তাদের উদ্বেগগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে এবং বাস্তব পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু যখন সম্পৃক্ততা দ্রুত এগিয়ে যায়, অথচ সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দৃশ্যমান হয় না, তখন তা আস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে সন্দেহকে আরো শক্তিশালী করে।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা জরুরি। সংলাপ থাকা মানেই আস্থা থাকা নয়। সম্পর্ক থাকা মানেই ভারসাম্য থাকা নয়। যদি সম্পৃক্ততা শুধু ধারাবাহিকতা বজায় রাখায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি অংশীদারিত্ব নয়, আগের কাঠামোরই পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই মুহূর্তে প্রশ্নটি শুধু কূটনৈতিক নয়, আস্থার।
যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর দৃশ্যমানভাবে পাওয়া যায়, ততক্ষণ একটি বাস্তবতা থেকেই যায় : বাংলাদেশ ভারতের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে; কিন্তু এখনো কিছু পাচ্ছে না।
ফলাফল কোথায়?
নয়াদিল্লি সফরটি ছিল পুরো কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যেখানে সঙ্কেতকে বাস্তবে রূপ দেয়ার প্রত্যাশা ছিল। আশা করা হয়েছিল, ঢাকার বৈঠকের পর তৈরি হওয়া গতি দিল্লিতে গিয়ে ফল দেবে।
২০২৬ সালের ৭-৮ এপ্রিল, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল- পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে নয়াদিল্লিতে পৌঁছে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠক করে। আলোচনায় অংশ নেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং জ্বালানিমন্ত্রী। ওই বৈঠক স্পষ্ট করে, এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।
প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আশা করা হয়েছিল, দীর্ঘ দিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে অন্তত আংশিক অগ্রগতি দেখা যাবে। পানিবণ্টন নিয়ে কোনো ইতিবাচক সঙ্কেত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কিছু কাঠামোগত উন্নতির ইঙ্গিত, কিংবা বাণিজ্যবৈষম্য কমানোর বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা। একই সাথে, জ্বালানি সহযোগিতায় এমন কোনো পুনর্বিন্যাসের আভাস পাওয়া যেতে পারত, যা ভবিষ্যতের নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ কমিয়ে দিতো। কিন্তু সফরের পর ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বৈঠক হয়েছে একাধিক। আলোচনা হয়েছে অনেক। বিবৃতি এসেছে ইতিবাচক ভাষায়। কিন্তু দৃশ্যমান ফলাফল নেই। পানিবণ্টনে অগ্রগতির ঘোষণা নেই। সীমান্ত ইস্যুতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। বাণিজ্যবৈষম্য নিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানের রূপরেখা নেই। জ্বালানি খাতেও নতুন ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির আভাস নেই। কারণ এই সফর ছিল নতুন সম্পর্কের প্রথম বাস্তব পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় যদি দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- এই গতি আসলে কাকে উপকার করছে?
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সফরটি সফল। তারা দ্রুত নতুন নেতৃত্বের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে, বিদ্যমান কাঠামোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে এবং সম্ভাব্য নীতিগত অনিশ্চয়তাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। অর্থাৎ- তাদের জন্য এটি ছিল স্থিতিশীলতা রক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ।
কী পেয়েছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ এই সফর থেকে কী পেয়েছে? সেটি এখনো স্পষ্ট হয়নি। এ কারণে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এই অসন্তোষ কেবল রাজনৈতিক নয়, বাস্তব অনুভূতি, যা বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। কারণ মানুষ কেবল কূটনৈতিক ভাষা শুনতে চায় না, ফলাফল দেখতে চায়। যখন বলা হয় ‘গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে’ তখন মানুষ জানতে চায়, তার ফল কী? যখন বলা হয় ‘পারস্পরিক স্বার্থ’ তখন মানুষ জানতে চায়, আমাদের স্বার্থ কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে হতাশা তৈরি হয়। আর সেই হতাশা থেকেই জন্ম নেয় অসন্তুষ্টি। এখানে এই সফরের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি সম্পর্ক ভেঙে দেয়নি; কিন্তু নতুনভাবে গড়েও তোলেনি। সংলাপ থামিয়ে রাখেনি, কোনো ফলাফলও দেয়নি। গতি সৃষ্টি করেছে; কিন্তু দিকনির্দেশ পরিষ্কার করেনি।
কথা নয়, ফল চাই
কেবল সফর করা, বৈঠক করা আর বিবৃতি দিলেই হয় না। এগুলোর মাধ্যমে ফল আসতে হয়। থাকতে হয় উভয় পক্ষের সম্মানজনক অবস্থান। থাকতে হয় ভারসাম্য। সেই সাথে প্রাপ্তিও থাকতে হয়। এগুলো যদি না থাকে, তাহলে সম্পর্কে শক্তি থাকে না। সেটি একপক্ষীয় হয়। আমরা ভারতের সাথে সম্পৃক্ততার বিরোধী নই। ভারত আমাদের প্রতিবেশী- এই বাস্তবতা বদলানো যাবে না; কিন্তু বন্ধুত্ব মানে ন্যায্যতা, আর অংশীদারিত্ব মানে পারস্পরিকতা, সেটি মনে রাখতে হবে। এগুলো যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সেটি সম্পর্ক নয়, নির্ভরতা। নতুন প্রজন্ম আবেগ দেখে না, যুক্তি দেখে। ছবিতে তারা তুষ্ট হয় না, ফল দেখতে চায়। বক্তব্যেও মুগ্ধ হয় না, পরিবর্তন চায়।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য



